বাংলার একটি ঘটনা, ওঠে কলকাতা হাইকোর্টে। পরে সেটি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয়। সেখান থেকেই নজিরবিহীন রায় দেওয়া হয়।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 23 May 2025 16:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পকসো আইনে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক ব্যক্তিকে সাজা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। বিচারপতি অভয় এস ওকা এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার বেঞ্চ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ মেনে তাঁদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই নজিরবিহীন রায় দেন। আদালত জানায়, এই মামলার ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে ‘সম্পূর্ণ ন্যায়’ প্রতিষ্ঠা করতেই এমন সিদ্ধান্ত।
অভিযুক্তর বয়স যখন ২৪ ছিল তখন ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্তর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত কিশোরী তখন নাবালিকা। পরবর্তীতে ওই তরুণী প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং অভিযুক্তর সঙ্গে বিয়ে হয়। বর্তমানে তাঁরা সুখে সংসার করছেন, একটি সন্তানও রয়েছে।
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নির্দেশ দেয়, এক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে। সেই কমিটিতে ছিলেন এক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং শিশু কল্যাণ দফতরের আধিকারিক। তাঁদের কাজ ছিল ওই তরুণীর বর্তমান মানসিক ও সামাজিক অবস্থান মূল্যায়ন করা।
কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্যাতিতা তরুণী অভিযুক্তর সঙ্গে মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এবং নিজের ছোট পরিবারকে ঘিরে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ।
সুপ্রিম কোর্ট এই প্রেক্ষিতেই জানায়, আইন অনুযায়ী ঘটনাটি অপরাধ, ভুক্তভোগী নিজে একে অপরাধ বলে মানেন না। বরং পুলিশের হস্তক্ষেপ, বিচারব্যবস্থার জটিলতা এবং প্রিয়জনকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর লড়াই, এই পরবর্তী অভিজ্ঞতাই তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। সমাজ তাঁকে বিচার করেছে, আইনব্যবস্থা তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি, এমনকি পরিবারও তাঁকে দেখেনি। এই মামলা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো।
কমিটির তদন্তে জানা যায়, ভুক্তভোগীর আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন আছে এবং তিনি দশম শ্রেণির পরীক্ষার পর যাতে উপযুক্তভাবে কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ পান বা পেশাগত প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, সেদিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।
এই মামলাটি প্রথমে ওঠে ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টে। সেখানকার একটি বিতর্কিত রায়ে অভিযুক্তের ২০ বছরের সাজা খারিজ করে দেয় আদালত এবং কিশোরীদের যৌন আচরণ নিয়ে কিছু ‘মৌলিক’ মন্তব্য করা হয় যা তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। ওই রায়ে বলা হয়, একজন কিশোরীকে 'নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে' এবং সমাজে এমন পরিস্থিতিতে 'তারই ক্ষতি হয়।'
এই মন্তব্যগুলো এতটাই বিতর্কিত হয়ে ওঠে যে, সুপ্রিম কোর্ট নিজে থেকেই এই মামলার পুনর্বিবেচনা শুরু করে। ২০২৪ সালের ২০ অগস্ট সর্বোচ্চ আদালত কলকাতা হাইকোর্টের রায় বাতিল করে অভিযুক্তের দোষ সুনিশ্চিত করে। তবে সঙ্গে সঙ্গে সাজা ঘোষণা না করে বরং ভুক্তভোগীর বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
সবদিক খতিয়ে দেখার পর আদালত সিদ্ধান্ত নেয়, অভিযুক্তের বর্তমান পরিবার, ভুক্তভোগীর মানসিক অবস্থা এবং গোটা ঘটনার ব্যতিক্রমী প্রেক্ষাপট বিচার করে, অভিযুক্তের সাজা ঘোষণা না করেই মামলার নিষ্পত্তি করা হবে।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, 'এই ঘটনাটি আমাদের বিচারব্যবস্থাকে ভাবতে বাধ্য করছে কেবল আইন প্রয়োগ করলেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয় না, প্রাসঙ্গিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।'