অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু (Chandrababu Naidu) ১৯৯২ সালে মাত্র ৭ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন হেরিটেজ ফুডস (Heritage Foods)। আজ সেটি ৬,৭৫৫ কোটির সাম্রাজ্য।

শেষ আপডেট: 24 August 2025 07:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, এ দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের সম্মিলিত সম্পদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৬০০ কোটির টাকাও বেশি অঙ্কে। আর তার মধ্যেই এককভাবে সর্বোচ্চ সম্পদের অধিকারী অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু (Chandrababu Naidu)! তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের পরিমাণ মোট ৯৩১ কোটি টাকা।
রাজনীতির প্রাঙ্গণে উচ্চপদস্থ নেতামন্ত্রীদের রাশি রাশি সম্পদ তেমন কোনও ব্যতিক্রমী ব্যাপার নয়। বরং মাঝেমাঝেই সে সব সম্পদের উৎস গোয়ন্দাদের স্ক্যানারের তলায় এসে পড়ে। ছানবিনে বেরোয় টাকার পাহাড়ের পিছনে লুকিয়ে দুর্নীতির পাহাড়।
তবে চন্দ্রবাবুর আর্থিক কাহিনি ভারতীয় রাজনীতিতে উলটপুরাণ বলা যেতে পারে। কারণ এই সম্পদ কোনও গোপন উৎস থেকে আসেনি, একটি প্রকাশ্য ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের সঙ্গেই যুক্ত সবটা। হেরিটেজ ফুডস লিমিটেড।
তেলেগু দেশম পার্টির নেতার নিজের জেলা অন্ধ্রের চিত্তোর। সেখানে প্রচুর দুধ উৎপাদন হলেও ক্রেতার অভাবে গো-পালকেরা ক্ষতির মুখে পড়তেন। নাইডুর সংস্থা তাদের নিয়ো সমবায় গড়ে তুলেছে। নাইডুর দাবি, এক পয়সা সরকারি সাহায্য ছাড়া তিনি ডেয়ারিটি গড়ে তোলেন। এই ডেয়ারি সংস্থার ব্যবসা মূলত দেখাশোনা করেন নাইডুর স্ত্রী।
১৯৯২ সালে ভারতের দুগ্ধ খাত যখন অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত হয়, তখন মাত্র ৭ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে নাইডু প্রতিষ্ঠা করেন হেরিটেজ ফুডস। ১৯৯৪ সালে কোম্পানির আইপিও হয়, যা ৫৪ গুণ বেশি সাবস্ক্রিপশন পায় এবং কোম্পানি ৬.৫ কোটি টাকা তোলে।
এরপর থেকে হেরিটেজ ফুডস ধাপে ধাপে এগিয়ে আজ ১৭টি রাজ্যে উপস্থিতি তৈরি করেছে এবং প্রায় ৩ লাখ দুধ উৎপাদনকারী চাষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ২০০০ অর্থবছরে কোম্পানির টার্নওভার ছিল ১০০ কোটি টাকা, আর ২০২৫-এ সেটি দাঁড়িয়েছে ৪,০০০ কোটিতে। বাজারমূল্য ১৯৯৫ সালে যেখানে ছিল ২৫ কোটি টাকা, তা ২০২৫-এ এসে দাঁড়িয়েছে ৪,৫০০ কোটিতে। এমনকি ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এক সময়ে এটি সর্বোচ্চ ৬,৭৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। বর্তমানে নারা পরিবার কোম্পানির ৪১.৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক।
এখানেই শেষ নয়। চন্দ্রবাবু নাইডুর রাজনৈতিক কেরিয়ারও সমান উত্থান-পতনে ভরা। চারবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। ২০০৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন, ২০১৪ সালে রাজ্য বিভাজনের সঙ্কট সামলাতে হয়েছিল, আবার ২০২৪ সালে তিনি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক ব্র্যান্ড সবসময় প্রযুক্তিমুখী। হায়দরাবাদকে তিনি একসময় করেছিলেন 'সাইবারাবাদ'। এবং আজকের দিনে অন্ধ্রপ্রদেশকে দিতে তিনি জোর দিচ্ছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো খাতে।
হেরিটেজ ফুডসের বাস্তব সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে তার স্ত্রী নারা ভুবনেশ্বরীর। ১৯৯৪ সালে যখন নাইডু সরকারে যোগ দেন, তখন ভুবনেশ্বরী কোম্পানির দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বে হেরিটেজ ফুডস নিয়মিত বৃদ্ধি পেয়েছে, কৃষক-কেন্দ্রিক কার্যক্রম চালিয়েছে এবং কোনও সরকারি ছাড় বা বিশেষ সুবিধা ছাড়াই বাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে।
তথ্য বলছে, ১৯৯৪ সালে কোম্পানির নেটওয়ার্থ ছিল মাত্র ৯.৯৯ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৯৭২ কোটিতে। স্বচ্ছ ব্যবসায়িক মডেলের জন্য এটি এক বিরল উদাহরণ, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতার প্রকাশিত সম্পদ সরাসরি যুক্ত একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির সঙ্গে।
ADR-এর রিপোর্টে ভারতের অন্যান্য মুখ্যমন্ত্রীদের সম্পদ নিয়েও স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠেছে। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু ১৬৩ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে, ওড়িশার নবীন পট্টনায়েক আছেন ৬৩ কোটির সম্পদ নিয়ে তৃতীয় স্থানে।
অন্যদিকে সর্বনিম্ন সম্পদের মালিক পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—মাত্র ১৫.৩৮ লক্ষ টাকা, কোনও অস্থাবর সম্পত্তি ছাড়াই। জম্মু ও কাশ্মীরের ওমর আবদুল্লাহর সম্পদ ৫৫.২৪ লক্ষ, কেরালার পিনারাই বিজয়নের সম্পদ ১.১৮ কোটি টাকা। আর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সম্পদ ৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে রিপোর্টে পরিষ্কার, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন প্রায় সবাই কোটিপতি, তবে চন্দ্রবাবু নাইডুর আর্থিক যাত্রা ব্যতিক্রম— কারণ তাঁর সম্পদ সরাসরি যুক্ত একটি প্রকাশ্য, স্বচ্ছ ও কৃষক-কেন্দ্রিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সঙ্গে।