বৌদ্ধ সংগঠনের একাংশের মতে, রাজ্য মর্যাদা পেলে লেহ ও কার্গিলের মধ্যে আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।

লাদাখকে পূর্ণ রাজ্য মর্যাদা দাবি
শেষ আপডেট: 10 November 2025 00:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পূর্ণ রাজ্যের দাবিকে কেন্দ্র করে লাদাখে (Ladakh statehood demand) ফের চাঞ্চল্য। কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসেছে লেহ অ্যাপেক্স বডি (Apex Body Leh - ABL) এবং কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (Kargil Democratic Alliance - KDA)। তাদের দাবি, লাদাখকে পূর্ণ রাজ্য মর্যাদা দেওয়া হোক এবং ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তবে, এই আলোচনা ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়েছে লাদাখের বৌদ্ধ সমাজে (Ladakh Buddhist community), কারণ তাঁদের অভিযোগ, আলোচনায় বৌদ্ধদের প্রতিনিধিত্ব খুবই সীমিত, এমনকী পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবিতেও অনেকে দ্বিমত পোষণ করছেন।
গত সেপ্টেম্বর মাসে লেহ–তে বিক্ষোভের জেরে আলোচনার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়। এরপর ২২ অক্টোবর ফের আলোচনা শুরু হয়, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের ছয়জন এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তিনজন প্রতিনিধি অংশ নেন।
দলটির মধ্যে ছিলেন লাদাখের সাংসদ হাজি হানিফা জান, কার্গিল স্বশাসিত পাহাড়ি উন্নয়ন পরিষদের (LAHDC) চেয়ারম্যান জাফর আখুন, এবং কেডিএ-র পক্ষ থেকে সাজ্জাদ কারগিলি, আসগর কারবালাই ও কামার আখুন - এঁরা সবাই মুসলিম প্রতিনিধি। অপরদিকে, এপেক্স বডির পক্ষ থেকে ছিলেন আশরাফ আলি বার্চা।
বৌদ্ধ সমাজের তিন প্রতিনিধি ছিলেন প্রাক্তন সাংসদ থুপস্তান চেওয়াং, এপেক্স বডির নেতা চেরিং দর্জে লাকরুক, এবং লেহ হিল কাউন্সিলের তৎকালীন প্রধান তাশি গ্যালসন। তবে গ্যালসনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ভবিষ্যৎ বৈঠকে তাঁর অনুপস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আট সদস্যের মধ্যে মাত্র দুইজন বৌদ্ধ প্রতিনিধি থাকবেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, কার্গিলের বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে কোনও প্রতিনিধি নেই কেডিএ–র দলে।
এই পরিস্থিতিতে কার্গিল লাদাখ বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সেরিং সামফেল, কেডিএ–র নেতা সাজ্জাদ কারগিলির কাছে চিঠি দিয়ে দাবি করেছেন, কার্গিলের মহিলা বৌদ্ধ সংগঠনের নেত্রী কুনজেস দোলমাকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তাঁর বক্তব্য, “এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটবে, যেমনটা এপেক্স বডি লেহ করেছে।”
এই দাবিকে সমর্থন করেছে জান্সকার বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশন। সেই সঙ্গে লেহ, কারু, নিয়োমা, দুরবুক, শ্যাম ও কারগিল শাখার বৌদ্ধ সংগঠনগুলিও যৌথভাবে একই আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, রাজ্য মর্যাদার দাবিকে ঘিরে বৌদ্ধ সমাজের একাংশ প্রবল আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, রাজ্য গঠনের পর কার্গিলের জনসংখ্যা বেশি থাকায় সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে, ফলে লেহ–কার্গিল ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে আলাদা হয় লাদাখ। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি এই পদক্ষেপকে 'পূর্ণ সংযুক্তিকরণ'-এর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে তুলে ধরে।
সম্প্রতি লাদাখের কয়েকজন বিশিষ্ট বৌদ্ধ নেতা ও লাদাখ বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সদস্যরা কেন্দ্রীয় সরকারকে স্মারকলিপি দিয়ে রাজ্য মর্যাদার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের প্রস্তাব, রাজ্যের পরিবর্তে একটি পরামর্শ পরিষদ (Advisory Council) গঠন করা হোক, অথবা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীনে রাজনৈতিক উপদেষ্টা (Political Advisor) নিয়োগ করা হোক।
বৌদ্ধ সংগঠনের একাংশের মতে, রাজ্য মর্যাদা পেলে লেহ ও কার্গিলের মধ্যে আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হতে পারে। অন্যদিকে, লাদাখ বৌদ্ধ যুব সংগঠনের প্রাক্তন সহ সভাপতি দর্জে শ্যালক মনে করেন, বৌদ্ধ সমাজের উচিত রাজ্যের দাবি পুনর্বিবেচনা করা এবং বরং ষষ্ঠ তফসিলভুক্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন রাজ্য হিসেবে লাদাখের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়েও। তাঁর মতে, লাদাখের বাজেটের ৯০ শতাংশই কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানের উপর নির্ভরশীল। শুধু সরকারি কর্মীদের বেতনেই খরচ হয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা, অথচ লাদাখের নিজস্ব রাজস্ব আয় তার একাংশ মাত্র। এই অবস্থায় রাজ্য মর্যাদা পেলে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির আর্থিক জোগান কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
২২ অক্টোবরের আলোচনায় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকেরা উপস্থিত ছিলেন, সেই সঙ্গে ছিলেন লাদাখ ইউটি-র মুখ্যসচিব পবন কোটওয়াল।
অন্যদিকে, লাদাখ আন্দোলনের অন্যতম মুখ সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এখনও জোধপুরের জেলে বন্দি। সরকারের দাবি, তিনি লাদাখে নেপাল বা বাংলাদেশের মতো 'বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার' চেষ্টা করেছিলেন। যদিও সোনমকে আটক করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট।