মুম্বইয়ের অসংখ্য ফ্ল্যাটবাড়ি, পুরনো বাড়ি, বিদ্যুতের তারে ও ফুটপাতে দিনভর আয়েশে কাটায় কবুতরবাহিনী। সে কারণে যুগ যুগ ধরে আরব সাগরের তীরে প্রায় ৫১টি কবুতরখানা চালু রয়েছে।

হাজার হাজার মানুষ এখনও রোজ কবুতরখানাগুলিতে জড়ো হয়ে পায়রা খাওয়ান। ফাইল ছবি।
শেষ আপডেট: 19 July 2025 13:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কবুতরখানা নিয়ে কবুতরবাজি (পায়রার লড়াই) শুরু হয়েছে মুম্বইয়ে। ভারতের বাণিজ্যনগরীতে ৫১টি কবুতরখানা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও শহরের পাখিপ্রেমীদের ডানা ঝটপটানিতে পুরসভাও হতভম্ব হয়ে যাচ্ছে। পুরকর্মীদের নিষেধ অমান্য করে এখনও রোজ সকালে দাদরের একটি ট্রাফিক আইল্যান্ডে দানাশস্য ছড়িয়ে যান মঞ্জু পারমার নামে প্রায় সত্তরের কাছাকাছি এক বৃদ্ধা। আর তা খেতে জড়ো হয়, শয়ে শয়ে পায়রা। বৃদ্ধা তা দেখেন আর হাসিমুখে পরম সন্তুষ্টি অনুভব করেন। শুধু তিনি একাই নন, এরকম হাজার হাজার মানুষ এখনও রোজ কবুতরখানাগুলিতে জড়ো হয়ে পায়রা খাওয়ান।
তাঁদের প্রত্যেকেরই এককথা, পায়রা খাওয়ানো একটা সহজ ব্যাপার। সকালে পশুপাখিকে কিছু খাবার দিলে পুণ্য অর্জন হয় বলে বিশ্বাস তাঁদের। একজন তো স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, অনেকেই সকালে গরু (গোমাতা), মহিষ, ষাঁড় কিংবা কুকুরকে খেতে দেন। পায়রা আলাদা কী? মানুষের মতোই পশুপাখিরাও ঈশ্বরের জীব। এই পৃথিবীতে তাদেরও বাঁচার সমানাধিকার আছে। তাহলে কবুতরের ক্ষেত্রে আলাদা নজর কেন?
মুম্বইয়ের অসংখ্য ফ্ল্যাটবাড়ি, পুরনো বাড়ি, বিদ্যুতের তারে ও ফুটপাতে দিনভর আয়েশে কাটায় কবুতরবাহিনী। সে কারণে যুগ যুগ ধরে আরব সাগরের তীরে প্রায় ৫১টি কবুতরখানা চালু রয়েছে। বলিউডের বহু সিনেমাতেও এই দৃশ্য রয়েছে। মুম্বইকরদের মধ্যে কবুতরবাজি একটি প্রাচীন শখ। কিন্তু, এই কবুতর বা পায়রাই হল মানব শরীরের পক্ষে অতি বিপজ্জনক পাখি। যদিও তা কেউ মানতে রাজি নন।

যেমন এই বৃদ্ধা। তিনি বলেন, শুধু পায়রার থেকেই ক্ষতি হয়! আমাদেরও বেঁচে থাকার জন্য যেমন রোজ খেতে হয়। তেমন পায়রাদেরও তো খেতে হয়। শারীরিক বিপদ সম্পর্কে তিনি বলেন, কেন মানুষের ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে না? আমার কপালে যা আছে, তা হবে, কেউ ঠেকাতে পারবে না।
কবুতরখানা বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পরেই বৃহন্মুম্বই পুরসভা প্রক্রিয়াও শুরু করে দেয়। কিন্তু, যাঁরা রোজ পায়রাদের খাওয়ান তাঁরাই পুরসভার কাজে বাধা দিতে থাকেন। পুরসভাও সপ্তাহখানেকের বেশি সময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পায়রাদের দানা দিলে জরিমানা ঘোষণা করেছে। কিন্তু, না পাখিপ্রেমী, না পায়রা দল, কাউকেই আটকাতে পারেনি।
ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে বৃহন্মুম্বই পুরসভার এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক বলেন, হকার উচ্ছেদের মতোই কঠিন কাজ এটাও। পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর জেনেও পায়রাকে খাওয়ানো বন্ধ করতে আমরা কিছুই করতে পারছি না। এই অবস্থায় আমরা শুধু জনসচেতনতামূলক প্রচার ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দাদরের একটি দানাশস্য বিক্রির দোকান পুলিশ কয়েকদিন আগে সরিয়ে দিয়েছে। দোকানদার এখন একটি গলির মধ্যে ফের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। কবুতরখানার সঙ্গে শহরে বহু মানুষের রুটিরোজগারও জড়িয়ে রয়েছে। পশু অধিকার রক্ষাকর্মী পল্লবী শচীন পাটিল ও স্নেহা বিসারিয়া বম্বে হাইকোর্টে এ সপ্তাহেই একটি আবেদন করেছেন। তাতে সরকারের নির্দেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ এবং পুরসভাকে কবুতরখানা ভাঙার কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছিল। যদিও হাইকোর্ট কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি।

মুম্বই তখন ছিল বম্বে। প্রায় ৩০০ বছর আগের কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আরব সাগরের তীরে বন্দর সহ একটি বাণিজ্য নগরী পত্তনের কথা ভাবছিল। তখন এগুলি ছিল পায়রাদের স্নানপানের ছোট ছোট ফোয়ারার মতো। এই কাজে সাত নম্বর আইল্যান্ডটি তৈরি করার পরই কোম্পানির শাসকরা দেশীয় বণিক মহলের জন্য আকর্ষণীয় সব ঘোষণা করে। যাতে প্রলুব্ধ হয়ে অনেক হিন্দু, জৈন, মুসলিম ও পারসি ব্যবসায়ীরা শহরে চলে আসেন।
শহরের ইতিহাসবিদ ভরত গোঠসকর সংবাদমাধ্যমকে জানান, গুজরাত থেকে আসা জৈন ও হিন্দুদের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, পশুপাখিদের প্রতি প্রেম ঈশ্বরের কাজ। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, পায়রাদের খাওয়ালে তাঁরা ভগবানের আশীর্বাদ পাবেন। ক্রমে শহর যখন আড়ে-বহরে বাড়তে থাকল, যেখানেই গুজরাতিরা গিয়ে পৌঁছলেন, সেখানেই গড়ে উঠল কবুতরখানা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও দেশীয় ধর্মীয় প্রথার ক্ষেত্রে কোনও আপত্তি জিগিয়ে তুলল না, বলেন ভরত।
তিনি আরও বলেন, রোগব্যাধি ছড়ানোর ক্ষেত্রে পায়রা হল বিপজ্জনক, এতে কোনও সন্দেহই নেই। যদি কবুতরখানা বন্ধও করে দেওয়া হয়, তাহলেও মানুষ পায়রাকে খাওয়াবে। তার জন্য নতুন জায়গা বেছে নেবেন তাঁরা। কারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস অনেক গভীরে পুঁতে রয়েছে। তাই জোর করে কিছু হবে না, সমাজপতিদের বুঝিয়ে সচেতনতা ফেরাতে হবে।