বিহারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘মহিলা রোজগার যোজনা'র ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটের মুখে সরকার সওয়া ১ কোটি মহিলার হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়ায় এর নির্বাচনী প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

মোদী, নীতীশ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 8 October 2025 17:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারে চরম সরকার বিরোধিতায় ভুগছিল নীতীশ কুমারের (Nitish Kumar) নেতৃত্বে এনডিএ জোট। একে নীতীশের শরীর আর দিচ্ছে না। তার উপর গত পাঁচ বছরে নীতীশ এমন কোনও কাজ করে দেখাতে পারেননি যা শোকেসে সাজানো যায়। ঠিক এমনটা একটা পরিস্থিতিতে ভোটের (Bihar Election 2025) মুখে বড় পদক্ষেপ করেছেন নীতীশ ও বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই রাজ্যে চালু হয়েছে ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’ (Mukhyamantri Mahila Rojgar Yojana )—এমন একটি প্রকল্প, যার আওতায় প্রতিটি পরিবারের একজন মহিলা সদস্যকে দেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২৬ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পটির সূচনা করেন। ওই দিনই ৭৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো হয় ৭৫০০ কোটি টাকা। এরপর মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার দুটি পর্যায়ে মোট ৪৬ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠিয়েছেন এই টাকা।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য—‘আত্মনির্ভর মহিলা’ তৈরি করা, যাতে তাঁরা কৃষি, পশুপালন, হস্তশিল্প, দর্জি কাজ, তাঁত বয়ন বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় নিজেদের রোজগারের পথ তৈরি করতে পারেন। নীতীশ ও মোদী এও প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, কোনও মহিলা ভাল ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করে দেখাতে পারলে ভবিষ্যতে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থ সাহায্য দেবে সরকার। তবে অনেকের মতে, সে আপাতত গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেলের মতই।
বিহারে এই মুহূর্তে প্রতিটি পরিবার থেকে এক জন মহিলা বছরে একবার ১০ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (Lakshmir Bhandar West Bengal) প্রকল্পে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা মাসে ১০০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি শ্রেণির মহিলারা মাসে ১২০০ টাকা করে পান। অর্থাৎ, বার্ষিক হিসাবে বাংলায় সাধারণ শ্রেণির মহিলারা পান ১২,০০০ টাকা, আর অনগ্রসর শ্রেণির মহিলারা পান ১৪,৪০০ টাকা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সংখ্যার হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ এখনও এগিয়ে। বিহারে একবারে ১০,০০০ পাওয়া গেলেও, বাংলার মহিলারা প্রতি মাসে নিশ্চিত আয় পান, যা তাঁদের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর। বিশেষত, বাংলায় ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT)-এর মাধ্যমে নিয়মিত অর্থপ্রবাহ মহিলাদের হাতে নগদ টাকার নিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা স্থানীয় বাজারে সরাসরি চাহিদা বাড়াচ্ছে।
তবে বিহারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘মহিলা রোজগার যোজনা'র ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটের মুখে সরকার সওয়া ১ কোটি মহিলার হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়ায় এর নির্বাচনী প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। বিহারে মোট ভোটার সংখ্যা ৭.৪ কোটি। তার মধ্যে ১ কোটি ২১ লক্ষ মহিলা তথা মোট ভোটারের প্রায় ১৭ শতাংশকে এককালীন ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। ভোটে এর অনিবার্য প্রভাব পড়বে বলেই রাজনীতির বহু পণ্ডিত মনে করছেন।
তবে পর্যবেক্ষকরা এও বলছেন, বিহারের তুলনায় বাংলার প্রকল্পটি অনেক দিন ধরেই জনমনে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করেছে—বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যে, যারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থ দিয়ে গৃহস্থালি খরচ, মেয়ের পড়াশোনা বা ছোট ব্যবসা চালান।
বিহারে এখনও দেখা বাকি, এককালীন ১০,০০০ টাকা প্রকৃতপক্ষে কতটা আত্মনির্ভরতা গড়ে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, টাকার পরিমাণ নয়, বরং নিয়মিত আয়ই মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রকল্পের সাফল্যের মূল কারণ হল সুবিন্যস্ত ধারাবাহিকতা। নিয়মিত অর্থপ্রবাহ পরিবারে বাজেট পরিকল্পনায় সাহায্য করে, যা এককালীন অনুদানের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, বিহারের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকার সাহায্য অনেকটা নির্বাচনী মুহূর্তে ‘ক্যাশ ইনজেকশন’ হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব আনবে কি না, তা সময়ই বলবে।
আপাতত বিহার ভোটে এই এককালীন আর্থিক অনুদান ‘রোজগার’ না হয়ে ‘রায়’-এর কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।