উঠেছে স্লোগান: ‘নতুন জীবন শুরু হোক জ্ঞানের পীঠস্থানে’। বিহারের পর্যটন দফতর এক্স-হ্যান্ডেলে এই মর্মেই নিজেদের পরিকল্পনা ভাসিয়ে দিয়েছে।

নালন্দা
শেষ আপডেট: 27 May 2025 13:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান-ব্যুৎপত্তি-মনীষার পীঠস্থান। কুমারগুপ্তের আমলে প্রতিষ্ঠা। সমৃদ্ধির আলো ছড়ায় পাল আমলে। সারস্বতবিদ্যার টানে দেশ-বিদেশের পরিব্রাজক পণ্ডিতদের পদধূলি পড়েছে। পাঠাভ্যাসে মগ্ন হিউয়েন সাং। তর্কবিদ্যায় নিজেকে মেলে ধরেছেন আচার্য শীলভদ্র।
শতাব্দীপ্রাচীন নালন্দা মহাবিদ্যালয়ের (Nalanda University) কথা চিন্তা করলেই এমন কিছু টুকরো টুকরো ছবিই পাঠকের মনে ভেসে ওঠে। এবার সেই দৃশ্যপট বদলে দিতে কোমর বেঁধে নামল বিহার সরকার (Bihar Government)। লক্ষ্য—কোষাগার ভরাট। উদ্দেশ্য—পিছিয়ে পড়া রাজ্যের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। চ্যালেঞ্জ—পর্যটন মানচিত্রে বিহারকে সামনের সারিয়ে তুলে আনা, জনপ্রিয় ‘ওয়েডিং ডেস্টিনেশন’ হিসেবে কেরল, গোয়ার মৌরিসিপাট্টায় থাবা বসানো!
আর এই আবহেই উঠেছে স্লোগান: ‘নতুন জীবন শুরু হোক জ্ঞানের পীঠস্থানে’। বিহারের পর্যটন দফতর এক্স-হ্যান্ডেলে এই মর্মেই নিজেদের পরিকল্পনা ভাসিয়ে দিয়েছে। কিছুই ‘বাস্তবায়িত’ হয়নি—সবই আলাপ-আলোচনার স্তরে রয়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে, আমজনতার ‘পালস’ বুঝতেই নালন্দা, বোধগয়া, মধুবনীর মতো শিল্পসংস্কৃতি ও বিদ্যাচর্চার ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলিকে ‘ভালবাসার গন্তব্য’ হিসেবে নবরূপ দিতে চাইছে নীতীশ কুমারের সরকার!
প্রকল্পকে জনপ্রিয় করতে সমাজমাধ্যমে কসরতের খামতি রাখছে না প্রশাসন। হাতিয়ার: নালন্দা, ঔরঙ্গাবাদ এবং বৌদ্ধ গয়ার ছবির মতো সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ ও ঐতিহাসিক রসের আবেদন। পালে হাওয়া জুগিয়েছে বিগত কয়েক বছরে বিহারের পরিকাঠামোগত উন্নতি। যেভাবে তড়িৎগতিতে রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, রাজ্য সড়ক জুড়েছে জাতীয় সড়কের সঙ্গে, নতুন সাজে সেজে উঠেছে সরকারি রিসর্ট, ভ্রমণকেন্দ্রকে ঘিরে বসেছে রেস্তরাঁ, হোটেল, ঢেলে সাজানো হয়েছে হাসপাতাল—তাতে বিহারের নড়বড়ে পর্যটন শিল্পের এক অর্থে নবজন্ম ঘটেছে।
কইমুর (Kaimur), রোহতাসের (Rohtas) মতো জায়গা একদা দুয়োরানি ছিল। বাইরের তো বটেই, রাজ্যের আপামর ভ্রমণপিপাসুও বেড়ানোর গন্তব্য বলতে সেই রাজগীর (Rajgir), নালন্দাই (Nalanda) বুঝতেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে জায়গাগুলিকে ভ্রমণের মানচিত্রে এনেছে। যার নিট ফল ধরা পড়েছে পর্যটকদের আগমনে। হিসেব বলছে, আজ থেকে দু’বছর আগে (২০২৩) প্রায় ৮ কোটি ২০ লক্ষ ভ্রমণার্থী বিহারে এসেছেন। রাজ্যের কোষাগারও হয়েছে সমৃদ্ধ।
যে কারণে মলয় বাতাসকে আরও ছড়িয়ে দিতে উৎসাহী বিহার সরকার। শুধুই পর্যটক নয়, হবু দম্পতিদের বিশেষ করে ‘টার্গেট’ করা হয়েছে। ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে স্লোগান: ‘বিহারেই বিয়ের গাঁটছড়া বেঁধে ফেলুন!’ আঙ্গিক বদলে বিকল্প ঘোষণাও সমাজমাধ্যমে ঢেউ তুলেছে: ‘বাগদান সেরে ফেলুন নালন্দার ঐতিহাসিক অবশেষের পাশে। শতাব্দীর প্রজ্ঞা মিশে যাক অন্তহীন ভালবাসায়!’
এতদিন গোয়া, রাজস্থান, কেরলই ছিল যুগলের ‘বৈবাহিক গন্তব্য’ (Wedding Destination)। বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমার কেন্দ্র হিসেবেও এই গোনাগুনতি জায়গাই দম্পতিদের নজর টেনেছে। এবার এই একঘেয়ে হয়ে যাওয়া ট্র্যাডিশনে ছেদ আনতে চাইছে বিহার সরকার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চাইছে ঐতিহাসিকতার অমলিন সুর! আমজনতার কাছে বিহারের দুই মেরুর পরিচিতি—একদিকে তা পিছিয়ে পড়া রাজ্য, অন্য চোখে সুমহান জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান। একদিকে অন্ধকার। অন্যদিকে আলো। পর্যটকের নয়া রূপরেখা আমদানি করে আঁধারের মাত্রা কিঞ্চিৎ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এই প্রসঙ্গে পর্যটন দফতরের শীর্ষ আধিকারিক রবিশঙ্কর উপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমরা একাধিক জায়গায় খুব ভাল পরিকাঠামো তৈরি করেছি। এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে নতুন কোনও জিনিস পর্যটকদের উপহার দিতে পারি।‘ এরপর সম্ভাবনার পরিসর নিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘গোয়া, রাজস্থান লোকের কাছে ম্যাড়মেড়ে হয়ে গিয়েছে। লোকে নতুন গন্তব্য চাইছে। এই কারণে আমরা ঐতিহ্য, ইতিহাস ও ধর্মকে মেলানোর রাস্তায় হাঁটছি।‘
ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ‘নালন্দা’-র ব্যুৎপত্তি সংক্রান্ত একাধিক তত্ত্ব প্রচলিত। চীনা তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাংয়ের মতে, এই নামটি এসেছে ‘ন অলম দা’ থেকে। যার অর্থ: “উপহার দানে যার বিরাম নেই” বা “অবিরত দান”। শতাব্দী পেরিয়ে, যুগান্তরের পর্বে দাঁড়িয়ে যুগল ও দম্পতিদের নতুন উপহার দিতে নালন্দার এখনও এতটুকু কার্পণ্য নেই।