পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ও তখন নিজের দলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল। ১৯৯৮-এ তিনি তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেই বিজেপির হাত ধরেন। জোড়া ফুলের লড়াইয়ে ঘাসফুলের ঝুলিতে আসে লোকসভার সাতটি আসন।

লালুপ্রসাদ যাদব ও নীতীশ কুমার।
শেষ আপডেট: 5 November 2025 14:47
বিহারের রাজনীতিতে (Bihar Politics) তখন রথী মহারথীর ছড়াছড়ি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সাংসদ, কে নেই! সেই নেতাদের ক্যারিশমা ছাপিয়ে জনতা দলের লালুপ্রসাদ যাদব (Lalu Prasad Yadav) ও নীতীশ কুমারের (Nitish Kumar) বন্ধুত্ব নিয়ে তখন চর্চা মুখে মুখে। তাঁদের তখন ‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না….’ সম্পর্ক। ১৯৯০-এর বিধানসভা ভোট (Bihar Election) শেষে জনতা দলের বিধায়কদের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রিত্বের লড়াইয়ে যে অমূল্য তিনটি ভোটের ব্যবধানে লালুপ্রসাদ বাকি দুই নেতাকে হারিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন নীতীশ অনুগামী।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ সিং চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হোন রামসুন্দর দাস। অন্যদিকে, উপ প্রধানমন্ত্রী দেবীলালের পছন্দ লালুপ্রসাদকে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চন্দ্রশেখর মনে করলেন, তিনিই বা হাত গুটিয়ে থাকবেন কেন? নিজের পছন্দের নেতা রঘুনাথ ঝাকে লড়াইয়ে এগিয়ে দিলেন। তিন নেতার লড়াইয়ে লালুপ্রসাদকে জিতিয়ে দিলেন ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকে ছায়াসঙ্গী, অভিন্ন হৃদয় বন্ধু নীতীশ। যদিও সমাজবাদী শিবিরের প্রবীণ ব্রিগেড নবীন লালু, নীতীশকে আটকাতে কম চেষ্টা করেননি।

অনেকেই মনে করেন, নীতীশ মনে করেছিলেন যাদব সম্প্রদায়ের মানুষ লালুপ্রসাদ মুখ্যমন্ত্রী হলে পরোক্ষে লাভ তাঁরও হবে। আশা করেছিলেন, স্বজাতি যাদবদের পাশাপাশি নীতীশের কুর্মি জাতির জন্যও লালু অনেক কিছু করবেন।
বছর চারেকের মধ্যে নীতীশ বুঝতে পারেন, লালু প্রসাদের মন্ত্রিসভায় থাকলে তিনি হারিয়ে যাবেন। বিহারে ততদিনে যাদব-রাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। লালুপ্রসাদ স্বঘোষিত যাদব সম্রাট। উচ্চবর্ণের দাপট ভাঙতে তৈরি হয়েছে ‘যাদব সেনা’। লাঠি হাতে তারা গ্রাম শাসন শুরু করে দিয়েছে। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে সরকারের নানা পদে যাদবদের উপস্থিতি নিয়ে রাজ্যে ক্ষোভ অসন্তোষের চোরাস্রোত বইছে। সরকারি দফতরের চুরিচামারির খবরও একটু একটু করে ফাঁস হতে শুরু করেছে।

কলেজ জীবনে নীতীশ ও লালুপ্রসাদ। তখন ছিল গলায় গলায় বন্ধুত্ব। ক্ষমতার স্বাদ পেতে বন্ধুত্বের ইতি টানেন নীতীশ।
লালুর বদনামের পারা যত বাড়তে লাগল ততই তাঁর থেকে দূরত্ব তৈরি করতে লাগলেন নীতীশ। কেন্দ্রের মন্ত্রী, মুজফ্ফরপুরের সাংসদ জর্জ ফার্নান্ডেজ এটাই চাইছিলেন। বিজেপির দুই শীর্ষ নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আডবানিরা এই সমাজবাদী নেতাকে দিয়ে লালু-নীতীশের ঘরে ফাটল ধরাতে ব্যস্ত। প্রথম ঘা মারলেন ১৯৯৪-এ। শিয়রে অর্থাৎ পরের বছর বিধানসভার ভোট। এক বছর আগে লালুপ্রসাদের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে জজ ফার্নান্ডেজকে নিয়ে নীতীশ গড়লেন নতুন দল সমতা পার্টি।
’৯৫-এর ভোটে অবশ্য সুবিধা করতে পারলেন না। অখণ্ড বিহারের ৩২৫ আসনের মধ্যে সমতা পার্টি পেল মাত্র সাত আসন। প্রায় সব ক’টিই নীতীশের নিজের জেলা নালন্দার কুর্মি বহুল এলাকায়। লালুপ্রসাদের বিকল্প হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার প্রথম চেষ্টা প্রবল ধাক্কা খেল।
হতাশ নীতীশ এরপর আর তলে তলে নয়, ১৯৯৬-এর লোকসভা ভোটে সরাসরি হাত ধরলেন বিজেপির, এর আগে যে দলটিকে লালুপ্রসাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মন্দির পার্টি, সাম্প্রদায়িক দল বলে গালমন্দ করতেন।
বিজেপির তখন সর্ব ভারতীয় কৌশল ছিল, রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলের বাগি নেতাদের তোল্লাই দিয়ে বিদ্রোহী করে তোলা। এরপর তাদের লোকবল, টাকা-পয়সার জোগান দিয়ে নতুন দল তৈরি করিয়ে সেই দলের সঙ্গে পদ্মের বোঝাপড়া গড়ে তুলতে বাজপেয়ী, আডবানিরা এমন অনেক নেতাকেই প্রাপ্যের অধিক মর্যাদা এবং সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন।
বিহারে নীতীশের মতো পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ও তখন নিজের দলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল। ১৯৯৮-এ তিনি তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেই বিজেপির হাত ধরেন। জোড়া ফুলের লড়াইয়ে ঘাসফুলের ঝুলিতে আসে লোকসভার সাতটি আসন। অন্যদিকে, দু বছরের মাথায় বিহার বিধানসভার ভোটে বিজেপি ও নীতীশের দল মিলে পায় ১২১ আসন। রাবড়ি দেবীকে হটিয়ে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারায় মাত্র পনেরো দিনের মাথায় পতন হয় নীতীশের মন্ত্রিসভার। কংগ্রেসের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ফিরে পান রাবড়ি।
তারপর পাঁচ বছরের অপেক্ষা। ২০০৫-এর ভোটে নীতীশের জনতা দল ইউনাইটেড ৫৫ আর বিজেপি ৮৮ আসলে জয় হাসিল করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি নিয়ে অবাক করা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বাজপেয়ী, আডবানিরা। ৩৩ আসন বেশি পেলেও মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাটন নীতীশের দিকেই এগিয়ে দেয় বিজেপি।
সেই থেকে বিগত দু’দশকে বহুবার নীতীশ বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করলেও অবস্থান বদলায়নি বিজেপি। ২০১৩-তে প্রথমবার জোট ভেঙে বেরিয়ে ঘোষণা করেন, ‘মিট্টি মে মিল যায়েঙ্গে, বিজেপি কে সাথ ওয়াপস নহি যায়েঙ্গে।’ ২০১৪-র লোকসভা ভোটে মোদী ঝড়ের দাপটে রাজনীতির মাটিতে সত্যিই মিশে গিয়েছিলেন নীতীশ। ঘুরে দাঁড়াতে হাত ধরেন বন্ধু থেকে শত্রু বনে যাওয়া লালুপ্রসাদের। ২০১৫-র বিধানসভা ভোটে আরজেডি বেশি আসন পেলেও নির্বাচনের আগের ঘোষণা মেনে নীতীশকেই মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে দেন লালু। দু’জনের পুরনো বন্ধুত্বের কাহিনি ফিরে আসে আরজেডি, জেডিইউ শিবিরে।
তবে সেই বন্ধুত্বের বন্ধন স্থায়ী হয়নি। ২০২০-র বিধানসভা ভোটের আগে ফের বিজেপির হাত ধরেন বিহারী রাজনীতির চানক্য নীতীশ। ২০২২-এ ফের বিজেপিকে ছেড়ে আরজেডির হাত ধরেন। দু বছর পর আবার বিজেপি।
২০২৫-এ নীতীশকে সামনে রেখেই বিধানসভা ভোটে লড়াই করছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ। তবে বর্তমান শাসক জোট ভোটে বিজয়ী হলে নীতীশকে সামনের সারিতে দেখা যাবে কিনা, তা নিয়ে ঘোর সংশয় আছে। সেই ২০০০ সাল থেকে বিধানসভার নির্বাচনগুলির সঙ্গে ২০২৫-এর ফারাক একটাই, নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেনি এনডিএ। মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডেকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বিজেপির দেবেন্দ্র ফড়ণবিশ। বিহারে নীতীশের দশা শিন্ডের মতো হলে বলতেই হয় বিহার মডেল দিয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্বে যাত্রা শুরু করে মহারাষ্ট্র মডেলে ইনিংশের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে বিহারের রাজনীতির বর্ণময় চরিত্র নীতীশ কুমারের। ‘সুশাসনবাবু’ থেকে জনমনে ‘পাল্টু রাম’ বনে যাওয়া নীতীশের বিজেপির সঙ্গে সংসার কেমন কাটল?
কোনও সন্দেহ নেই, তিনটি ক্ষেত্রে তিনি সফল। এক, নীতীশের সময়ে বিহারে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। দুই, বিজেপির সমর্থন নিয়ে তাদের চেয়ে কম আসনের নেতা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রিত্ব করলেও পদ্ম পার্টিকে খুল্লামখুল্লা উগ্র হিন্দুত্বের রাজনীতি করার ছাড়পত্র দেননি। তিন, নীতীশের মুখ্যমন্ত্রিত্বের লম্বা ইনিংসে বিজেপি বিহারে কোনও নেতা তৈরি করতে পারেনি, যাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ হিসাবে তুলে ধরতে পারে। একদা গলায় গলায় বন্ধু থেকে শত্রু বনে যাওয়া লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারই এখনও বিহারের রাজনীতির প্রধান দুই মুখ।
দু’জনের বন্ধুত্বে রাজনীতি যতই শক্রতার আবহ তৈরি করুক না কেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কে তেমন একটা চিড় ধরেনি। লালুপ্রসাদের কিডনি প্রতিস্থাপনের সময় সরকারিভাবে যতটুকু যা করার নীতীশ করেছেন। অন্যদিকে, লালুপ্রসাদও বরাবর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন নীতীশের উপস্থিতিকে। ছট পুজো, হোলি, ইদে লালু-রাবড়ির বাড়িতে নীতীশের নিমন্ত্রণ বাঁধা। আর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে লালুপ্রসাদের বড় মেয়ে মিশার বিয়ের দিনের সেই ঘটনাটির কথা তো এখনও মুখে মুখে ফেরে।
দৃশ্যটা বেশ মনে আছে। মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ের বিয়ে বলে কথা। গোটা পাটনা শহর যেন বিয়ে খেতে হাজির। ওদিকে, বাংলোর বাইরে ভিড়ে আটকে আছে বরের গাড়ি। পুলিশের হিমশিম অবস্থা। অগত্যা ভিড় ঠেলে বরকে ছাদনাতলায় পৌঁছে দিতে পুলিশের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদও লাঠি হাতে নেমে পড়েছেন। এমন সময় খবর এল, ভিড়ের কারণে গেট থেকেই ফিরে যাচ্ছেন নীতীশ। আমরা সাংবাদিকেরা পরিস্থিতি আঁচ করে নীতীশের সঙ্গী হয়েছি। আচমকা বাংলোর গেটের মুখে ভিড়ে ঠেলে লাঠি হাতে হাজির লালুপ্রসাদ। নীতীশের দিকে লাঠি উঁচিয়ে লালু বললেন, ‘অন্দর চলো, নেহি তো পিটেঙ্গে!’
হাসি মুখে নীতীশ গেলেন মিশাকে আশীর্বাদ করতে।