Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

নামের সঙ্গে ‘বিহারী’, অটলের 'জঙ্গলরাজ'কে লালু এমন মোচড় দিয়েছিলেন, দিশাহারা হয় বিজেপি

বিজেপির হাত ধরার পর নীতীশ পদ্ম শিবিরের একটাই স্লোগান ধার করেছেন। তা এই জঙ্গলরাজ। এজন্য নানা অবকাশে বাজপেয়ীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। 

নামের সঙ্গে ‘বিহারী’, অটলের 'জঙ্গলরাজ'কে লালু এমন মোচড় দিয়েছিলেন, দিশাহারা হয় বিজেপি

বিহার ভোট ২০২৫।

শেষ আপডেট: 4 November 2025 16:40

অমল সরকার

গান্ধী ময়দানে সেদিন তিল ধারণের জায়গা নেই। বহুদিন পর বিহারের (Bihar Election 2025) রাজধানীতে এসেছেন অটল বিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Bajpayee)। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই প্রথম। প্রধানমন্ত্রীর বিহারে না যাওয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ি দেবী নানা সভা-অনুষ্ঠানে বাজপেয়ীকে খোঁচা দিয়ে বলছেন, ‘নামের সঙ্গে বিহারী, কিন্তু বিহারের প্রতি বিন্দুমাত্র দরদ নেই।’ এক ধাপ এগিয়ে জেলবন্দি লালুপ্রসাদ (Laluprasad Yadav) বলছেন, ‘আসলে নীতীশ (Nitish Kumar) চায় না বলেই বাজপেয়ীজি বিহারকে উপেক্ষা করছেন। উনি নিজে একজন সজ্জন ব্যক্তি। সকলকে নিয়ে চলার মানুষ।’ নীতীশ তখন বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রী। ২০০০ সালে মাত্র দিন দশের জন্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন রাজ্যপালের কৃপায়। সংখ্যালঘু সরকার টেকাতে পারেননি। ফের মুখ্যমন্ত্রী হন রাবড়ি দেবী। 

বাজপেয়ীর বিমান নামার মুহূর্তে গান্ধী ময়দানের সভায় সে কী গর্জন। যেন কামান দাগা হচ্ছে। পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত লালুপ্রসাদ জেল থেকে মাঝেমধ্যে হুঙ্কার ছাড়েন। কিন্তু দিন দিন রাজ্যের রাশ যে তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, নানা ঘটনায় তার আভাস মিলতে লাগল। চুরি-ডাকাতি-অপহরণের বিরাম নেই। তার উপর লালুপ্রসাদের দুই শ্যালক সাধু ও সুভাষের দাদাগিরিতে অতিষ্ঠ রাজ্যের ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা। দোকান থেকে ফার্নিচার, টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের বাহিনী। তোলাবাজির ঠেলায় অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। 

Bihar Election 2025

লালুর দুই শ্যালক তখন বিহারের ত্রাস। দিদির প্রশাসনে নিজেকে শেষকথা হিসেবে তুলে ধরতে রাবড়ির মেজো ভাই সাধু বাংলোর সরকারি ঠিকানা বদলে করেন ১০ জনপথ। আসলে দিল্লিতে তখন ১০ জনপথের সুবিশাল বাংলোয় থাকেন কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী। সভাপতি হওয়ার আগে থেকেই কেন্দ্রে নরসিংহ রাও এবং রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার চলত তাঁর কথায়, এটাই প্রচার ছিল রাজনৈতিক মহলে। সাধু দেখাতে চাইতেন, পদে না থাকলেও তিনিই প্রশাসনের শেষ কথা। এ নিয়ে ছোট ভাই সুভাষের সঙ্গে প্রায়ই লেগে যেত। একে লালুপ্রসাদ জেলে, তাঁর উপর রাজ্যের বেহাল দশা। বাড়তি উৎপাত সাধু ও সুভাষের বাহিনীর দলাদলি, মারামারি, কাটাকাটি। মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ি দেবীর তখন দমবন্ধকর অবস্থা। জনরোষ চরমে। 

বাজপেয়ী বোধহয় এমন সন্ধিক্ষণের অপেক্ষায় ছিলেন। রাবড়ি সরকারের বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভের সুনামির মধ্যে পাটনার গান্ধী ময়দানে সভা করতে এলেন। বিহারের রাজধানীর এই ময়দানটি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের তুলনায় আয়তনে ছোট। তবে রাজনীতির উত্থানপতনে এই ময়দানের গুরুত্ব কলকাতার ব্রিগেড ময়দানের থেকেও বেশি। বলা চলে এই ব্যাপারে গান্ধী ময়দানের কাছে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড হেরে গেছে। 

১৯৭৪-এ এই ময়দান থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ক্রান্তির ডাক দিয়েছিলেন রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন এলেছিলেন বিহারের নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ। ১৯৭৭-এ কংগ্রেস সরকারকে হটিয়ে কেন্দ্রে তৈরি হয়েছিল দেশের প্রথম জোট সরকার। ১৯৯০-এ প্রথমবার লালুপ্রসাদ যাদব এই ময়দানে খোলা আকাশের নীচে শপথ নিয়ে বিহারের রাজনীতিতে নিজের জায়গা পাকা করে নেন। 

বাজপেয়ীর জনসভা নিয়ে সেদিন যেন ১৯৭৪-এ জয়প্রকাশের সভার আবহ। এই ময়দানে সেদিনের সভায় বাজপেয়ীর বলা একটি শব্দই পরবর্তীকালে বিহারে লালুপ্রসাদের গদি টলিয়ে দিয়েছিল। উত্থান হয়েছিল নতুন নেতা নীতীশ কুমারের। সেদিন দীর্ঘ ভাষণে রাবড়ি সরকারকে বলতে গেলে তুলোধুনো করলেন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী। বিহারী রাজনীতির যাদব দম্পতির মুণ্ডপাত করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, স্বামী-স্ত্রী মিলে জঙ্গলরাজ কায়েম করেছেন।

বাজপেয়ীর এই কথায় সেদিন যেন বাজ পড়ে গান্ধী ময়দানে। প্রধানমন্ত্রীর কথায় হাততালি দিতে গোটা মাঠ উঠে দাঁড়িয়েছে। জনতার গর্জন আর থামে না। সেই থেকে বিহারে লালু-রাবড়ির আরজেডির বিরুদ্ধে বিজেপি এবং জনতা দল ইউনাইটেডের প্রচারে সবচেয়ে চালু কথাটি হল জঙ্গলরাজ। সেই ২০০৫ থেকে সব ভোটে বিজেপির প্রচারে নিশানায় যাদব দম্পতির জঙ্গলরাজ। বাজপেয়ীর বলা ‘জঙ্গলরাজ’-এর অবসান হয়েছিল ২০০৫। সেবারই প্রথম পাকাপাকিভাবে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেন নীতীশ।

বলা হয়, বিজেপির হাত ধরার পর নীতীশ পদ্ম শিবিরের একটাই স্লোগান ধার করেছেন। তা এই জঙ্গলরাজ। এজন্য নানা অবকাশে বাজপেয়ীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিহারের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও মনে করেন বাজপেয়ীর ওই কথা রাজ্যের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ধসিয়ে দিয়েছিল লালু-রাবড়ির পনেরো বছরের রাজ। জঙ্গলরাজের বিপরীতে নীতীশ নিজের সরকারকে ‘সুশাসনরাজ’ বলে দাবি করা শুরু করেন। বিজেপি-জেডিইউ জোট তাঁকে ‘সুশাসনবাবু’ বলা শুরু করে। তবে মজার কথা হল, জঙ্গলরাজের কপিরাইট বাজপেয়ীকে দেওয়া হলেও বিহারে শব্দটি নয়া মাত্রা পেয়েছিল পাটনা হাইকোর্টের এক ডিভিশন বেঞ্চের দুই বিচারপতির কথায়।

সেটা ১৯৯৭-এর ৬ অগস্টের কথা। এগারো দিন আগে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদল হয়েছে। পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত লালুপ্রসাদ মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জেলে চলে গিয়েছেন। রাজ্যপাট সঁপেছেন স্ত্রী রাবড়ি দেবীকে। একে বর্ষাকাল। তার উপর সেবার গোটা দেশের বৃষ্টি যেন বিহারে হচ্ছে। রাজধানী পাটনায় কোমর সমান জল। বিদ্যুৎ নেই, নেই পানীয় জল। হোটেল পর্যন্ত হাত তুলে দিয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে চার্জ না দেওয়ায় ব্যাটারি অচল। হোটেলে খাবার বলতে ডাল-ভাত-আলুচোখা। কারেন্ট না থাকায় কলকাতার অফিসে ফ্যাক্স পাঠাতে পারছি না। হোটেল থেকে যোগাযোগের একমাত্র সম্বল টেলিফোন, সেটাও অচল হয়ে গেল জমা জলে। 

রাজ্যের সেই পরিস্থিতি থেকে নিস্তার চেয়ে কৃষ্ণ সহায় নামে জনৈক ব্যক্তি পাটনা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করলেন। তখন বিহারের ৯০ ভাগ জনস্বার্থ মামলায় মামলাকারীরা ছিলেন বিজেপির নেতা অথবা আরএসএসের লোকজন। বাঘা বাঘা উকিল তাঁদের মামলা লড়তেন। জল জমা নিয়ে সেই মামলায় বিচারপতি বিপি সিংহ এবং বিচারপতি ধর্মপাল সিনহার বেঞ্চ সব শুনে মন্তব্য করে, রাজ্যে জঙ্গলরাজ কায়েম হয়েছে। জঙ্গল থেকে জন্তু-জানোয়ারদের বেরিয়ে আসাটুকুই যা বাকি। 

উচ্চ আদালতের মন্তব্যটি নিয়ে দু-চারদিন হইচই হলেও কেউই তেমন মনে রাখেননি। কিছুদিন পর হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে লালুপ্রসাদ ফের রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জঙ্গলরাজ নিয়ে বাজপেয়ী ও বিজেপির বিরুদ্ধে পাল্টা লোক খ্যাপাতে শুরু করেন। বলেন, বিহারে আমাদের শাসনামলে গরিব মানুষের রাজ কায়েম হয়েছে। তাই উচ্চবর্ণের পার্টি বিজেপি আমাদের জমানাকে জঙ্গলরাজ বলছে। ওরা আসতে পিছড়ে জাতিকেই জঙ্গলের পশুর সঙ্গে তুলনা করছে। সত্যি কথা বলতে কী লালুর পাল্টা আক্রমণে বিজেপি দিশাহারা হয়ে পড়ে।  ২০০৫-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপি-জেডিইউ জোট বাজিমাত করলেও আগের বছর লোকসভা নির্বাচনে লালুর দল বিপুল জয় হাসিল করে। সঙ্গে সঙ্গী কংগ্রেস এবং বাম দলগুলির মুখেও হাসি ফোটান লালু। 

তারপর বিহারের গঙ্গা, শোন নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেলেও দলের প্রথম সভাপতি অটল বিহারী বাজপেয়ীর ‘জঙ্গলরাজ’ শব্দটির ব্যবহার বন্ধ করেনি পদ্ম শিবির। ২০১৩ সাল থেকে লালুপ্রসাদ সক্রিয় রাজনীতিতে নেই। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী ভোটে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার উপর বছর দুই আগে কিডনি বদলের পর শরীর-স্বাস্থ্যও তেমন ভাল যাচ্ছে না। কার্যত গৃহবন্দি। তাঁদের স্বামী-স্ত্রী’র জমানার অবসান হয়েছে বছর কুড়ি আগে। এবারের নির্বাচনে বিরোধী জোট মহাগঠবন্ধনের মুখ্যমন্ত্রী মুখ লালুপ্রসাদ পুত্র তেজস্বী। দু’দশক আগে লালু-রাবড়ির বিরুদ্ধে চালু করা জঙ্গলরাজ শব্দটি আজ কতটা প্রাসঙ্গিক সে প্রশ্ন উঠেছিল বিজেপির অন্দরে। কোনও কোনও নেতা বলার চেষ্টা করেন, নতুন প্রজন্ম লালু-রাবড়ি রাজ দেখেনি। 

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ জুড়ে থাকছে জঙ্গলরাজের কথা। মনে করাচ্ছেন কেমন ছিল লালুপ্রসাদ-রাবড়ি দেবীর জমানা। বিশেষভাবে মনে করাচ্ছেন শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতির কথা। দলকে মোদীর সাফ কথা, লালু-রাবড়ির অপশাসনের চিত্র তুলে না ধরলে বিজেপি জোট সরকারের সাফল্য তুলে ধরা সম্ভব হবে না।

তবে দলের পরামর্শ পুরোপুরি ফেলে দেননি মোদী। দিনকয়েক আগে সমস্তিপুরের সভায় নতুন শব্দ ‘লঠবন্ধন’ আমদানি করে চর্চা উসকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। লালুপ্রসাদ-রাবড়িদেবীর সময়ে স্বজাতি যাদবদের লাঠি নিয়ে বীরত্ব ও রাজ কায়েমের দিনগুলি স্মরণ করিয়ে দিতেই প্রধানমন্ত্রী ওই শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর। প্রধানমন্ত্রী সেদিন বিরোধী মহাগঠবন্ধনকে ‘অটক দল’ (যারা মানুষের জন্য কাজ করে না), ‘লটক দল’ (যারা নানা অপকর্মে ফেঁসে আছে), ‘ভটক দল’ (পথহারা), ‘ঝটক দল’ (যারা ঝটকা লেগে ছিটকে গেছে) এবং ‘পটক দল’ (যারা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে)।


```