বিয়ের পর দিন একহাত ঘোমটা মাথায় সলজ্জ নতুন বউয়ের মতো মুখ নামিয়ে ধীরপায়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করার মতো হেঁটে রাজভবনের ভিতরে গেলেন তিনি। স্বামীর পরামর্শে শপথ নেওয়ার সময়টুকু ঘোমটা সরালেন। সেই পর্ব শেষ হতে ফের ঘোমটার আড়ালে মুখ্যমন্ত্রী।

রাবড়ি দেবীর শপথগ্রহণ। ফাইল চিত্র।
শেষ আপডেট: 4 November 2025 16:39
পাটনার বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের জন্য দিনটা বড় দুঃখের। নানা সূত্র থেকে তাঁরা খবর পেয়েছিলেন লালুপ্রসাদ (Lalu Prasad Yadav) পদত্যাগ করলে কে হতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। বিকালে যাঁর নাম সরকারিভাবে ঘোষণা করা হল, নামজাদা সাংবাদিকেরা কেউই তাঁর নাম ভাবতে পারেননি। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা আছে শুনে, রাজনীতির (Bihar Election) হাঁড়ির খবর রাখা সাংবাদিকরা পর্যন্ত হাসিঠাট্টা করেছেন।
লালুপ্রসাদ মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে পাটনার ১ অ্যানে মার্গের বাংলোটি ছিল গড়ের মাঠের মতো। যার যখন মনে হত ঢুকে পড়া যেত। পশুখাদ্য মামলায় অভিযুক্ত লালুপ্রসাদকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে, জানতে পেরে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা-কর্মীরা দলে দলে অ্যানে মার্গের বাংলোয় ভিড় করেছেন। তাঁরাও জানতে আগ্রহী, কার হাতে ব্যাটন তুলে দেবেন আরজেডি সুপ্রিমো। দলের কিছু নেতার নাম ঘুরেফিরে আসছে। কেউই নিশ্চিত নন। সকাল থেকে বাংলোর আউটহাউসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের বৈঠক চলছে।

খবরটা মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ল, দলের কোনও নেতা বা সিনিয়র মন্ত্রী নন, স্ত্রী রাবড়ি দেবীকে মুখ্যমন্ত্রী করতে চলেছেন লালুপ্রসাদ। সরকারিভাবে নাম ঘোষণা হল আরও ঘণ্টা খানেক পর, অদূরের রাজভবন থেকে। রাজ্যপালের অফিস থেকে জানানো হল সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন রাবড়ি দেবী (Rabri Devi)। আরও জানা গেল, সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুপুরেই রাজভবনে রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা করে এসেছেন লালুপ্রসাদ।
পাকা খবর পাওয়ার পরেও যেন ধন্ধ কাটছে না। রাবড়ি দেবীকে সেদিন দুপুরেও দেখেছি দোতলার রান্না ঘরে হাতা-খুন্তি নাড়তে। ছট পুজো ছাড়া তাঁকে কখনও বাংলোর বাইরে এমনকী দোতলার বাইরেও দেখা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী তথা রাজ্যের ফার্স্ট লেডি হিসাবেও কোনও অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি লালু-পত্নীকে। স্বামী বাদে আরও দুই রাজনীতিককে চিনতেন, তাঁরই দুই ভাই সাধু ও সুভাষ যাদব।
দিনটা ছিল ১৯৯৭-এর ২৫ জুলাই। বিকাল পাঁচটা নাগাদ রাজভবনের পোর্টিকোয় থামল হবু মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি। সঙ্গে লালুপ্রসাদ। বিয়ের পর দিন একহাত ঘোমটা মাথায় সলজ্জ নতুন বউয়ের মতো মুখ নামিয়ে, ধীরপায়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করার মতো হেঁটে রাজভবনের ভিতরে গেলেন তিনি। স্বামীর পরামর্শে শপথ নেওয়ার সময়টুকু ঘোমটা সরালেন। সেই পর্ব শেষ হতে ফের ঘোমটার আড়ালে মুখ্যমন্ত্রী।

গোল বাঁধল রাজভবনের চা-চক্রে। মুখ্যমন্ত্রীর নাম, স্বামীর নাম বাদ মিডিয়ার কিছুই জানা নেই। এক সাংবাদিক গলা চড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর জন্মস্থান, বয়স, শিক্ষা ইত্যাদি জানতে চাইলেন এক অফিসারদের কাছে। আমরা বাকি সাংবাদিকেরাও ঘিরে ধরলাম তাঁকে। আচমকা চায়ের কাপ হাতে হাজির লালুপ্রসাদ। 'চিল্লাইয়ে মাত!' বলে সাংবাদিকদের শাসন করে বললেন, 'লিখ লিজিয়ে।' নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম আর তাঁর স্বামীর নাম বলে লালুপ্রসাদ হাঁটা দিলেন রাজ্যপালের দিকে। সাংবাদিকেরা জানতে চাইলেন বয়স! লালু সহাস্যে জবাব দিলেন, ‘ঔরত কি উমর নহি পুঁছনা চাহিয়ে।’ একজন জানতে চাইলেন, এডুকেশন? ডিগ্রি? গলা চড়িয়ে লালু বললেন, ‘লিখ দিজিয়ে, ম্যাডাম এডুকেটেড’।
পূর্ব পরিকল্পনা মতোই পরদিন সকালে পাটনার নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন সদ্য পদত্যাগী মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ। বিচারক তাঁকে বেউর জেলে রাখার নির্দেশ দিল। সেখানে আগেই অফিসারদের একটি সেল ঝাড়পোঁছ করে রাখা হয়েছিল। দুপুরের পর শুরু হয় লালুপ্রসাদের জেলযাত্রা। নাচ-গান-বাজনা-বাজি সহযোগে নেতার জেল যাত্রার আয়োজন করেছেন আরজেডির কর্মী-সমর্থকেরা। গোটা পাটনা অবরুদ্ধ। রাস্তার দু’পাশে জড়ো হওয়া জনতার দিকে গাড়ি থেকে হাত নেড়ে, টাকা ছুড়তে ছুড়তে চলেছেন আরজেডি সুপ্রিমো মুখ্যমন্ত্রী। মনে হচ্ছিল যেন কোনও ধনকুবের কিংবা মাফিয়া ডনের বিয়ের শোভাযাত্রা, যেমনটা দেখা যায় সিনেমার পর্দায়।
বেউর জেলের গেট সেদিন হাট করে খোলা। পুলিশ ও কারারক্ষীরা কাউকে বাধা দেয়নি। লালুপ্রসাদের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীসাথীরাও জেলের ভিতর ঢুকে পড়ে। নির্ধারিত অতিথিশালায় নিয়ে যাওয়া হয় ভিভিআইপি আসামিকে। খানিক পরেই সেই আসামির সঙ্গে দেখা করতে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাবড়ি দেবীর মন্ত্রিসভার তখনও দফতর বণ্টন হয়নি। শুধু একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ঘোষণা করা হয় কারা দফতর থাকবে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। তিনি জেলে থাকার সময় যাতে রাবড়ি দেবী প্রয়োজন মতো কারাগারে এসে স্বামীর সঙ্গে সরকারি বিষয়ে আলোচনা করে যেতে পারেন, তার জনই মুখ্যমন্ত্রীর হাতে কারা দফতর রাখা হয়েছিল।
দলে অনেক প্রবীণ নেতা থাকা সত্ত্বেও লালুপ্রসাদ রাজনীতির ‘র’ না জানা, নিপাট গৃহবধূ স্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় আরজেডি ভেঙে যাবে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। নীতীশ কুমারের দল এবং বিজেপি মিলে কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু পরিবারতন্ত্রের এমন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনের পরও লালুপ্রসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে হাঁটেননি একজন নেতা-এমএলএ-এমপি। আসলে বিহারের রাজনীতিতে লালুপ্রসাদ নিজেকে এমন শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠা করেছেন যে দলে কেউই তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার স্পর্ধা ধরেন না।
দিন কয়েক পর নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে অবশ্য অফিসারদের চিন্তা বাড়ল। স্বাধীনতার পর থেকে রীতি হল ১৫ অগস্ট পাটনার গান্ধী ময়দানে ভাষণ দেন মুখ্যমন্ত্রী। হিন্দিতেই ভাষণ দিয়েছেন আগের মুখ্যমন্ত্রীরা। এদিকে, রাবড়ি দেবী ভোজপুরী ছাড়া আর কোনও ভাষা জানেন না, বোঝেন না। অগত্যা অফিসারদের কাজ বাড়ল। শপথের আগে মাকে সাক্ষর করার দায়িত্ব বর্তেছিল বড় মেয়ে মিসার উপর। মাকে কাজ চালানোর মতো হিন্দি শেখানোর ভারও তাঁকেই নিতে হয়। সঙ্গে একজন অফিসারকেও নিয়োগ করা হয় এই কাজে। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সসম্মানে উতরে যান রাবড়ি।
রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী ভালই শুরু করেছিলেন। জেলে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে তারপর ফাইলে সই-সাবুদ করছিলেন। অফিসার এবং মন্ত্রীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাল কাটে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর দুই ভাই সুভাষ আর সাধুকে নিয়ে। দিদি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাদের তোলাবাজি, রংবাজি আরও বেড়ে গিয়েছিল। তার উপর লালুপ্রসাদ জেলে থাকায় প্রশাসনের উপরও মাতব্বরি শুরু করে তাঁর শ্যালক।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেমন ছিল রাবড়ি দেবীর ইনিংস। লালুপ্রসাদ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন টানা সাত বছর। দু-দফায় রাবড়ি ছিলেন আট বছর। স্বামী-স্ত্রীর এই পনরো বছরকে বিজেপি ও নীতীশের দল ‘জঙ্গলরাজ’ বলে থাকে। তবে সবাই একবাক্যে মানেন, বিহারের প্রথম মহিলা এবং দেশের প্রথম নিরক্ষর মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ি দেবী আর হাতা-খুন্তি নাড়া গৃহবধূটি থাকেননি। মাস ছয়েকের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলেন। বিরোধী নেত্রী হিসাবেও নীতীশ কুমারকে ভালই মোকাবিলা করেন।