আকবরকে স্কুলে ভর্তি করান আইকু। চায়ের দোকানের সামান্য আয় থেকেই ছেলের ছোট-বড় ইচ্ছে, প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।

আকবর-আইকুর মানবতার বন্ধন! (গ্রাফিক্স- দ্য ওয়াল)
শেষ আপডেট: 29 November 2025 16:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধর্মের দেওয়াল ভেঙে মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন লখনউয়ের বাসিন্দা আইকু লাল (Aiku Lal Story)। পেশায় একজন সাধারণ চা ওয়ালা, কিন্তু তাঁর কাহিনি দেশজুড়ে প্রশংসিত, যার সূত্রপাত ২০০২ সালে।
শীতের এক দুপুরে চায়ের দোকানের পাশের জঙ্গল থেকে ৩ বছরের আকবরকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন আইকু লাল (Akbar-Aiku Lal)। শিশুটি কেবল নিজের নাম বলতে পেরেছিল। পরিবার বা বাড়ির ঠিকানা, কিছুই জানত না। বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে বারবার বলছিল, 'আব্বু'। অসহায় অবস্থায় শিশুটি তাঁর কাছেআসে, আর এরপরই আইকু লালের একাকীত্বের জীবন চিরকালের জন্য পাল্টে যায়।
আকবরকে যখন পাওয়া গিয়েছিল তখন তার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল। তাই শিশুটিকে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে যান আইকু (Akbar-Aiku Lal bond)। চিকিৎসা করান নিজের সামর্থ্য মতো। অন্যদিকে, শিশুটির পরিবারের খোঁজ করতে থাকেন, পুলিশের কাছেও যান। কিন্তু কয়েকমাস চেষ্টা করেও কারও কোনও খোঁজ পাননি।
এরপর চেনা পরিচিত, এমনকি পুলিশের কাছ থেকে আকবরকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসার পরামর্শ পেয়েছিলেন আইকু। কিন্তু তাকে ছাড়তে চাননি তিনি। তাই কারও পরোয়া না করেই আকবরকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার সব দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নেন। সিদ্ধান্ত নেন আকবরকে নিজের সন্তান হিসেবেই মানুষ করবেন।
হিন্দু বাড়িতে এক মুসলিম শিশু, এনিয়ে সমালোচনা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কোনও কিছুই আইকুর সিদ্ধান্তকে টলাতে পারেনি। এমনকি শিশুটির ধর্মীয় পরিচয় যাতে হারিয়ে না যায়, সে ব্যাপারে শুরু থেকেই ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। স্থানীয় মসজিদে এক মৌলভীর কাছে নিয়ে গিয়ে আকবরকে কোরআন পড়া, নামাজ কায়েম করা—সব কিছুর ব্যবস্থা করে দেন তিনি। হিন্দু হওয়ার পরও শিশুটির ধর্মকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই ভাবনা বহু মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে।
আকবরকে স্কুলে ভর্তি করান আইকু। চায়ের দোকানের সামান্য আয় থেকেই ছেলের ছোট-বড় ইচ্ছে, প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।
সবকিছু ঠিকই চলছিল। এক সাংবাদিক তাঁদের ব্যাপারে জানতে পেরে সেই কাহিনি সকলের সামনে তুলে ধরেন। আইকু কীভাবে আকবরকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, আকবরকে তার মা কী নামে ডাকতেন, এই ছোট ছোট বিবরণ থেকেই হারিয়ে যাওয়া ছেলের খোঁজ পান আকবরের আসল বাবা-মা। কিন্তু তাঁরা পুলিশের দ্বারস্থ হলেও লাভ হয় না। আকবর তার পালিত বাবাকে ছেড়ে যেতে চায়নি। এরপর তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আকবরকে ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় সুপ্রিম কোর্টে।
২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ রায় দেয়, আকবর ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আইকু লালের কাছেই থাকবে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর আকবর নিজে ঠিক করবে সে তার আসল পরিবারের কাছে ফিরবে কিনা। আদালত জানায়, আইকু যেভাবে শিশুটির লালন-পালন করেছেন, তা মানবতার এক উদাহরণ এবং ছেলেটির ভবিষ্যতের জন্য এই সিদ্ধান্তই সর্বোত্তম।
দুই ভিন্ন ধর্ম, দুই ভিন্ন জীবন—তবু একই পরিবারের আবরণে বাঁধা। আকবর–আইকুর এই কাহিনি সমাজকে মনে করিয়ে দেয়, ভালবাসাই শেষ সত্য।