বারামতি দুর্ঘটনা যেন দেখিয়ে দিল, দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন্ত্রিত এয়ারফিল্ডে মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব কেবল প্রশিক্ষণ উড়ানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভিআইপি চলাচল শুরু হলে সেই ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

শেষ আপডেট: 31 January 2026 20:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মহারাষ্ট্রের বারামতিতে সাম্প্রতিক বিমান দুর্ঘটনায় পাঁচ জনের মৃত্যুতে (যাঁদের মধ্যে ছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার-ও) প্রশ্নের মুখে পড়ল ভারতে তথাকথিত ‘অনিয়ন্ত্রিত’ (Uncontrolled) এয়ারফিল্ড থেকে ভিআইপি (VIP) উড়ান এবং সেই সংক্রান্ত নিরাপত্তা।
এই দুর্ঘটনার পর সামনে এসেছে আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য। NDTV-র একটি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালে Aircraft Accident Investigation Bureau (AAIB) গঠনের পর থেকে প্রকাশিত ৬৮টি চূড়ান্ত দুর্ঘটনা রিপোর্টের মধ্যে অন্তত ন’টি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে অনিয়ন্ত্রিত এয়ারফিল্ডে বা তার আশপাশে, যার বেশিরভাগই অবতরণের সময়।
এই দুর্ঘটনাগুলির অধিকাংশই গত এক দশকে বিভিন্ন ফ্লাইং ট্রেনিং অর্গানাইজেশন (FTO)-এর প্রশিক্ষণ উড়ান সংক্রান্ত। যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা কারণ চিহ্নিত করেছে তদন্তকারী সংস্থা, তবু বারবার উঠে এসেছে কিছু সাধারণ সমস্যা -
কেন বারামতি আলাদা করে উদ্বেগের কারণ?
বারামতি বিমানবন্দরকে ‘ক্লাস জি’ (Class G) এয়ারফিল্ড হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ, এখানে নেই আধুনিক নেভিগেশন এড, নেই পূর্ণ সময়ের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC) ব্যবস্থা, এমনকী অন্যান্য বাণিজ্যিক বিমানবন্দরের মতো স্থায়ী ফায়ার ট্রাকও নেই।
বারামতিতে ATC-র দায়িত্ব কার্যত সামলান সেখানকার দুটি বেসরকারি ফ্লাইং স্কুল - রেডবার্ড এভিয়েশন এবং কারভার এভিয়েশন-এর প্রশিক্ষক ও পাইলটরাই। অর্থাৎ, স্বাধীন ও পূর্ণকালীন ATC ইউনিট এখানে কার্যকর নয়।
এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এক অভিজ্ঞ পাইলট। তাঁর কথায়, “ভারতে প্রায় ১৫০টি অনিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দর রয়েছে। প্রশ্ন হল, যেখানে মৌলিক নিরাপত্তা সরঞ্জামই নেই, সেখানে ভিআইপিদের যাতায়াত কতটা যুক্তিসঙ্গত? এখানে প্রশিক্ষণের সময় উড়ান ভেঙে পড়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রাণহানিও হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এখনই নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি, কোন এয়ারফিল্ড ভিআইপিদের চলাচলের জন্য উপযুক্ত আর কোনগুলো নয়। অথচ এই সব জায়গায় মাঝেমধ্যেই ভিআইপি এবং প্রাইভেট উড়ান চলছে।”
জানা যাচ্ছে, অজিত পাওয়ার নিজেও আগে বারামাটিতে প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ পাথ ইন্ডিকেটর (Precision Approach Path Indicator), নাইট ল্যান্ডিং সুবিধা এবং নিয়মিত ATC পরিষেবার মতো পরিকাঠামোর দাবি জানিয়েছিলেন।
একের পর এক রিপোর্টে উঠে এসেছে ‘Missing Aids’-এর ছবি
২০১৩ সাল থেকে প্রকাশিত AAIB-এর চূড়ান্ত রিপোর্টগুলিতে বারবার দেখা যাচ্ছে, অনিয়ন্ত্রিত এয়ারফিল্ডে বা এমন বিমানবন্দরে গুরুতর ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ছিল না -
যদিও সব ক্ষেত্রেই এই ঘাটতিগুলি সরাসরি দুর্ঘটনার কারণ নয়, কিন্তু নিরাপত্তা সংক্রান্ত সুপারিশে এগুলি ঘুরেফিরে এসেছে।
রেওয়া দুর্ঘটনা: কুয়াশা, ভুল বোঝাবুঝি আর প্রাণহানি
২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি রেওয়া এয়ারড্রোমে একটি নাইট ট্রেনিং ফ্লাইট মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। দৃশ্যমানতা কম থাকার কারণে ক্রু রানওয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন না। প্রধান ফ্লাইট প্রশিক্ষক (CFI) তখন বারাণসীর দিকে রওনা দিলেও রেডিওতে জানানো হয়, NOTAM-এর কারণে সেখানে রানওয়ে বন্ধ।
তদন্তে উঠে আসে, ATC-র সঙ্গে যোগাযোগে NOTAM সংক্রান্ত তথ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ওই প্রশিক্ষক।
এরপর ফের রেওয়ায় অবতরণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঘন কুয়াশা ও খারাপ দৃশ্যমানতার মধ্যে বিমানটি এয়ারফিল্ড খুঁজে না পেয়ে উমরি গ্রামে ভেঙে পড়ে, যা বিমানবন্দর থেকে মাত্র ১.৬ কিলোমিটার দূরে। দিকভ্রান্ত হয়ে বারবার নীচে নামতে গিয়ে কোনও দৃশ্যমান চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় CFI-র।
রেওয়ায় কোনও নিজস্ব আবহাওয়া কেন্দ্র ছিল না। দৃশ্যমানতার হিসেব নেওয়া হচ্ছিল বারাণসী ও জবলপুর বিমানবন্দরের IMD রিপোর্ট থেকে। স্থানীয়ভাবে দৃশ্যমানতা নির্ধারণ করা হচ্ছিল একটি স্কুল টাওয়ার দেখে, যেটিও পরে আর চোখে পড়ছিল না। তদন্তকারী দল জানায়, এমনকী ATC টাওয়ারও ৬০ মিটার দূর থেকেই দৃশ্যমান ছিল না।
AAIB স্পষ্ট করে বলে, রেওয়ায় স্থানীয় দৃশ্যমানতা নির্ধারণের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না, এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতিরও ঘাটতি ছিল।
আলিগড়, নাগার্জুনসাগর থেকে দেওঘর - একই ছবি বারবার
২০২২ সালের জানুয়ারি - আলিগড়ের কাছে FTO প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে পড়ার ঘটনায় উঠে আসে, কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও নাইট ফ্লাইট চালানোর ক্ষেত্রে DGCA নির্দেশিকায় অস্পষ্টতা রয়েছে।
আলিগড়ে ATC টাওয়ার থাকলেও তা কার্যকর নয়। সেখানে নেই ILS, PAPI, নিজস্ব আবহাওয়া পরিষেবা বা পূর্ণাঙ্গ ATC। AAIB সুপারিশ করে, যেখানে টাওয়ার আছে সেখানে অবিলম্বে ATC চালু করা হোক, যাতে প্রশিক্ষণ উড়ান আরও নিরাপদ হয়।
একই বছর, ফেব্রুয়ারি - আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর AAIB নির্দেশ দেয়, সব অনিয়ন্ত্রিত এয়ারফিল্ডে VHF রেডিও কথোপকথনের রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করা হোক। নাগার্জুনসাগর এয়ারফিল্ডের অডিটের কথাও বলা হয়। সেখানে প্রযুক্তিগত ত্রুটির সম্ভাবনার কথা বলা হলেও জরুরি সময়ে VHF গাইডেন্সের অভাব স্পষ্ট ছিল।
২০২১ সালের জুলাই - এক ছাত্র পাইলটের মৃত্যু হওয়া দুর্ঘটনায় দেখা যায়, এয়ারফিল্ডে মাত্র একটি উইন্ডসক ছিল, কোনও অতিরিক্ত নেভিগেশন সুবিধা নয়।
২০২০ সালের জুন - ওড়িশার বিরাসালে দুর্ঘটনায় দু’জনের মৃত্যু হয়। তখন আবার CCTV বসানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তোলে তদন্ত রিপোর্ট।
২০১৫ সাল - কর্ণাটকের কুর্গে বেগুরকল্লি ঘাসের স্ট্রিপে দুর্ঘটনায় উঠে আসে, নেভিগেশন এড বা উইন্ডসক ছাড়া এমন স্ট্রিপে অপারেশন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
২০১৩ সাল - দেওঘরে ট্রেনিং মোটর গ্লাইডার দুর্ঘটনায় দেখা যায়, নিজস্ব আবহাওয়া কেন্দ্র না থাকায় রাঁচি থেকে তথ্য নিতে হচ্ছিল।
বারামতিতেও আগেও দুর্ঘটনা
বারামতিতে এটিই প্রথম নয়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এক দুর্ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ, VHF রেকর্ডিং বা Garmin G3X ডেটা না থাকায় সাক্ষীদের বক্তব্য পুরোপুরি যাচাই করা যায়নি। ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণে উঠে আসে, পুনরায় আকাশে ওঠার পর প্রশিক্ষণরত পাইলট সঠিক ল্যান্ডিং পদ্ধতি অনুসরণ করেননি।
এরও আগে, ২০১৩ সালের জুনে বারামতিতে আরেকটি প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনায় রানওয়ে ২৯-এর কাছে ছড়িয়ে থাকা নুড়ি পাথর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা রানওয়ে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
এবার কি বদল আসবে?
এক প্রাইভেট অপারেটরের হয়ে কাজ করা আরেক পাইলট বলছেন, “এই সব দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এখনই। বিশেষ করে বারামতির ঘটনার পর, যেসব এয়ারস্ট্রিপে FTO-র বাইরে অন্য ট্রাফিকও চলে, সেখানে ন্যূনতম পরিকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।”
বারামতি দুর্ঘটনা যেন আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন্ত্রিত এয়ারফিল্ডে মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব কেবল প্রশিক্ষণ উড়ানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভিআইপি চলাচল শুরু হলে সেই ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।
প্রশ্ন এখন একটাই, এই সতর্ক সংকেতের পর কি সত্যিই নড়েচড়ে বসবে নীতি নির্ধারকেরা?