সুপ্রিম কোর্টে জামিন খারিজ উমর খালিদের (Umar Khalid)। তিহাড় জেলের কাচের ওপারে বনজ্যোৎস্নার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, অপেক্ষা ও লড়াইয়ের গল্প।

উমর খালিদ ও বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী।
শেষ আপডেট: 5 January 2026 19:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: “ভাল, ভাল… চলে এসো। এটাই এখন জীবন!”
সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) থেকে জামিন না পাওয়ার খবরের পর বাঙালি প্রেমিকা বনজ্যোৎস্নার (Banjyotsna Lahiri) উদ্দেশে এই কথাটিই বলেছেন ছাত্র আন্দোলনের বন্দি নেতা উমর খালিদ (Umar Khalid)। এইটুকু কথায় না আছে কোনও হাহাকার, না কোনও বিস্ফোরণ— কেবলই একধরনের নিঃশব্দ মেনে নেওয়া, দীর্ঘ বন্দিজীবনের সঙ্গে আপস করে নেওয়ার স্বীকারোক্তি।
২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র মামলায় আজ, সোমবার উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও এন ভি অঞ্জারিয়ার বেঞ্চ জানায়, মামলায় “অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের” প্রাথমিক প্রমাণ রয়েছে। যদিও একই মামলায় গুলফিশা ফাতিমা, মীরান হায়দার, শিফা উর রহমান, মহম্মদ সলিম খান এবং শাদাব আহমেদের জামিন মঞ্জুর করেছে শীর্ষ আদালত। তার পরেই সামনে আসে বনজ্যোৎস্নার পোস্ট।
তাঁদের এই সম্পর্কের গল্প অবশ্য আজকের নয়। কাশ্মীরি যুবক উমর খালিদ ও বনজ্যোৎস্নার আলাপ হয়েছিল ২০০৮ সালে। তখন ঝকঝকে তরুণ উমর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করছেন। বনজ্যোৎস্না জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন।
আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও, একই সঙ্গে একটা কাজ করছেন খুব মন দিয়ে। রাজনীতি। আন্দোলন। বিদ্রোহ। সেই সময়েই জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্রদের সঙ্গে সংহতি জানাতে গিয়ে তাঁদের প্রথম দেখা। সে দেখায় যে শুধু চোখের মিল হয়েছিল তাই নয়, ধীরে ধীরে মিলে যায় রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক ন্যায় এবং সমতার প্রশ্ন। দ্রোহের পথেই একসঙ্গে পথ চলতে শুরু করেন তাঁরা। ২০১৩ সালে অফিসিয়ালি শুরু হয় প্রেম।
দীর্ঘ সাত বছর একসঙ্গে পথ চলার পরে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই উমর খালিদের ঠিকানা তিহাড় জেল। সেই থেকে একই শহরে থেকেও তাঁদের সম্পর্ক কার্যত ‘লং ডিস্ট্যান্স’। শত ওঠাপড়া-ভাঙাগড়ার পরেও, যোজন দূরত্বের পরেও, কেউ কারও হাত ছাড়েননি। স্পর্শ ছাড়াই ছুঁয়ে থেকেছেন, বিনিসুতোয় বেঁধে রেখেছেন।
আজকের রায়ের পরই সমাজমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভাগ করে নেন উমরের সঙ্গী বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী। এক্স-এ দেওয়া একটা পোস্টে তিনি লেখেন, অন্য অভিযুক্তদের জামিন পাওয়ার খবরে উমর খালিদ খুশি হয়েছেন, স্বস্তি পেয়েছেন। তিনি বনজ্যোৎস্নাকে বলেছেন, “যাঁরা জামিন পেয়েছেন, তাঁদের জন্য আমি খুব খুশি। সত্যিই অনেকটা স্বস্তি লাগছে!”
এর উত্তরে বনজ্যোৎস্না জানান, তিনি পরেরদিন তিহাড় জেলে ‘মুলাকাত’-এ আসবেন। তখনই উমরের সংক্ষিপ্ত উত্তর— “ভাল, ভাল… চলে এসো। এটাই এখন জীবন।”

এই কয়েকটি শব্দ যেন তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা বন্দিজীবন, অপেক্ষা আর আইনি লড়াইয়ের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েছে। সমাজমাধ্যমে সেই পোস্ট মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়, দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকার মানসিক চাপ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর তার প্রভাবও ফুটে ওঠে।
কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বনজ্যোৎস্না জানিয়েছিলেন, সপ্তাহে একদিন তাঁরা দেখা করেন— তিহাড় জেলের কাচের দেওয়ালের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, ইন্টারকমে কথা বলে।
বনজ্যোৎস্না বলেছিলেন, “আমরা হাসি, মজা করি। দুঃখের কথা বলি না। আমি একা বেরিয়ে এলে তখন মন খারাপ হয়।” আদালতে হাজিরার সময়ও তাঁদের কথোপকথন চলে ইশারায়। কখনও উমরের চুল কাটা নিয়ে ঠাট্টা, কখনও ফুটবল বনাম ক্রিকেট নিয়ে খুনসুটি।
বনজ্যোৎস্না মজা করে বলেছিলেন, “ও ফুটবল বোঝে না। আইপিএল দেখে। আমায় জিজ্ঞেস করেছিল, কোন দল সাপোর্ট করি। এদিকে আমি তো ক্রিকেটই দেখি না!”
এই সম্পর্কের পথে কাঁটাও কম ছিল না। ২০১৬ সালে এক জাতীয় টিভি বিতর্কে উমর ও বনজ্যোৎস্না দু’জনেই 'টার্গেট' হয়ে যান। ২০১৮ সালে উমরের উপর হামলার চেষ্টাও হয়—ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন বনজ্যোৎস্না। সেই ঘটনার সময়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি দেখেছি, লোকটা রিভলভার বের করল। পুলিশ বলেছিল, ভাগ্য ভাল বন্দুকটা জ্যাম হয়ে গিয়েছিল।”
তবু সবকিছুর মধ্যেও সম্পর্কের ভিত শক্ত হয়েছে। জেলে বসে উমর যত বই পড়েছেন, সেগুলোর জন্য বনজ্যোৎস্না নাকি নতুন বইয়ের আলমারিও কিনতে শুরু করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুখের লড়াই আমরা ছাড়িনি।”
এদিন সুপ্রিম কোর্টে ফের জামিন খারিজের রায়ের পরে উমরের কথা তাই আসলে কেবল একজন বন্দির কথা হয়ে রয়ে যায়নি, তা হয়ে উঠেছে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এক সম্পর্কের ধৈর্য আর এক রাজনৈতিক সময়ের প্রতিচ্ছবি।