পদপিষ্ট হয়ে ১১ জনের মৃত্যু ঘটনার পর কমিশনার বি দয়ানন্দকে বরখাস্ত করায় কর্নাটক জুড়ে সমালোচনার ঝড়, বিজেপি-কংগ্রেসে চাপানউতোর।

পুলিশ কমিশনার বি দয়ানন্দ।
শেষ আপডেট: 6 June 2025 15:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরসিবি-র জয়মিছিলের হুল্লোড়ে পদপিষ্ট হয়ে ১১ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর শহরের পুলিশ কমিশনার বি দয়ানন্দকে বরখাস্ত করায় রাজ্যজুড়ে দেখা দিয়েছে প্রবল জনরোষ এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের এই ঘটনার পরে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গলা তুলেছে জনতা, পুলিশ মহল ও বিরোধী দলগুলি।
দু'দিন আগেই বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। কর্নাটক স্টেট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (KSCA) এবং ডিএনএ নেটওয়ার্কসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপচে পড়া ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। সেখানেই ঘটে যায় ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা, প্রাণ হারান অন্তত ১১ জন। আহত হন বহু।
এর ঠিক একদিন পর, বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরু পুলিশ কমিশনার বি দয়ানন্দকে বরখাস্ত করে কর্নাটক সরকার। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় প্রবল প্রতিবাদ। #IStandWithBDayanand হ্যাশট্যাগে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর পক্ষে সমর্থন জানাতে থাকেন। প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিকরা, বিরোধী দল এবং সাধারণ নাগরিকরা এই সিদ্ধান্তকে ‘তড়িঘড়ি ও অন্যায়’ বলে মনে করছেন।
সূত্রের খবর, বেঙ্গালুরু পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত ঘিরে গভীর অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকে প্রতিবাদস্বরূপ কালো ব্যাজ পরার পরিকল্পনা করছেন। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেও মতবিরোধ দেখা গেছে। অনেকে শঙ্কা করছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
বেঙ্গালুরুর প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার মেঘারিখ মন্তব্য করেন, 'প্রাথমিক তদন্ত ও তথ্য যাচাই ছাড়াই কমিশনারকে বরখাস্ত করা দুঃখজনক। পুলিশ এখানে পুরো ঘটনার সামান্য অংশমাত্র। এই সিদ্ধান্ত সঠিক নয়।'
অপর এক প্রাক্তন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার ভাস্কর রাও আরও কঠোর ভাষায় বলেন, 'কমিশনারকে বরখাস্ত করা কর্নাটক পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার দিন। পুরো রাজ্য জানে, এই মৃত্যু মিছিলে মূল অপরাধী হলেন উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার। মুখ্যমন্ত্রীও আতঙ্কিত দিশাহীন এবং দায়িত্বহীন। সরকারের হাতে ইতিমধ্যেই রক্ত লেগে গেছে এবং এখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়েছে।”
এই বরখাস্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনাও চরমে। বিজেপি এই সিদ্ধান্তকে ‘পুলিশ বাহিনীর উপর চাপ সৃষ্টি’ বলেই উল্লেখ করেছে। কর্নাটক বিজেপি তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লেখে, 'এই প্রথম, শীতল মাথার খুনি সরকার শীর্ষ পুলিশ অফিসারদের শাস্তি দিচ্ছে।'
বিজেপির তরফে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া ও উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের ছবি বিকৃত করে, রক্তাক্ত চোখ ও দাঁত লাগিয়ে ড্রাকুলার মতো করে দেখানো হয়। বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিএস ইয়েদুরাপ্পা এই বরখাস্তকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, 'আরসিবির জয় উদযাপনের সময় সরকার তার নৈতিক দায়িত্ব ভুলে গিয়েছিল। জনরোষ শান্ত করতে ৫ জন পুলিশ অফিসারকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।'
Mr Siddaramiah has gone into Panic mode. The suspension of Bengaluru City Police Commissioner is the darkest day in the History of Karnataka Police.
The prize for telling the Truth and he and his Team slogged the whole night to keep Bengaluru Safe.
Everyone in Karnataka knows… pic.twitter.com/iYFsMEihGg— Bhaskar Rao (@Nimmabhaskar22) June 5, 2025
বিজেপি আরও অভিযোগ করে, এই বরখাস্তের মাধ্যমে সরকার আদালতের নজর এড়াতে চাইছে, যাতে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে।
জেডিএস নেতা এবং বিজেপির একাধিক বিধায়ক উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই আয়োজনের মূল পরিকল্পনা ছিল তারই, অথচ পুলিশকে দায়ী করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া ইতিমধ্যেই RCB, KSCA এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা ডিএনএ নেটওয়ার্কসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনার তদন্তভার সিআইডি-কে দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সকলেই দয়ানন্দকে নিষ্ঠাবান, দক্ষ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ পুলিশ অফিসার বলে বর্ণনা করেছেন, যিনি নিজের পদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। অনলাইনে তাঁর সমর্থনে এক পিটিশনও চালু হয়েছে, যেখানে তাঁকে পুনর্বহাল করার দাবি উঠেছে।
বেঙ্গালুরুর ঘটনায় কমিশনারের বরখাস্তকে ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তা শুধু পুলিশ বা রাজনীতি নয়, জনতার বিশ্বাস, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ন্যায্যতা, এবং প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞান সম্পর্কেও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কারণ এরকম কোনও দুর্ঘটনায় সাধারণত পুলিশের দিকেই আঙুল ওঠে। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, পুলিশকে আড়াল করার। কিন্তু এক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। কর্নাটক সরকার যখন পুলিশকে শাস্তি দিচ্ছে, নাগরিক সমাজ ও বিরোধীরা চেপে ধরছে, সরকারের নীতিনির্ধারণ ও নৈতিকতার প্রশ্নে।