মুখ্যমন্ত্রী খাণ্ডু প্রশ্ন তুলেছেন উত্তর-পূর্বের বাকি রাজ্যগুলো কেন এই জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের দায় বহন করবে না। কোনও কোনও মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, অরুণাচল সরকার আসলে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেই চাকমা ও হাজং জনগোষ্ঠীকে সরাতে চাইছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 10 October 2025 23:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু দাবি তুলেছেন তাঁর রাজ্য থেকে চাকমা ও হাজং জনগোষ্ঠীর একাংশকে অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিতে হবে। তাঁর প্রশ্ন, শুধু অরুণাচল প্রদেশ কেন এই সম্প্রদায়ের মানুষকে পুনর্বাসনের দায়িত্ব বহন করবে।
প্রসঙ্গত বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকার চাকমা ও হাজং জনজাতির উদ্বাস্তুদের অরুণাচলের বিভিন্ন জায়গায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট রায় ছিল।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী খাণ্ডু প্রশ্ন তুলেছেন উত্তর-পূর্বের বাকি রাজ্যগুলো কেন এই জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের দায় বহন করবে না। কোনও কোনও মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, অরুণাচল সরকার আসলে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেই চাকমা ও হাজং জনগোষ্ঠীকে সরাতে চাইছে। এই এই দুই জনগোষ্ঠীর আদিবাসস্থান হল পার্বত্য চট্টগ্রাম যা এখন বাংলাদেশের অংশ।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সামাজিক ও ধর্মীয় সংঘাতের কারণে এই সম্প্রদায়ের মানুষ উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। অতীতে পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারও এই দুই জনগোষ্ঠীর প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে চলছে। এমন সময় অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে এই দুই জনগোষ্ঠীর মানুষ ক্ষুব্ধ এবং চিন্তিত।
মানবাধিকার সংগঠন দ্য রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপ (RRAG)-এর পরিচালক সুহাস চাকমা শুক্রবার এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, মেঘালয়ের কনরাড কে সাংমা, ত্রিপুরার মানিক সাহা, তিপ্রা মোথার প্রধান মহারাজা প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেববর্মা, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তাঁরা অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডুর সঙ্গে তাঁদের রাজ্য থেকে আগত অভিবাসীদের বোঝা ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেন। সংগঠনের দাবি পেমা খাণ্ডু সম্প্রতি চাকমা ও হাজং সম্প্রদায়ের কতিপয় ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনায় উদ্বাস্তু বিনিময়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।
সুহাস চাকমা বলেন, 'ভারতে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে যেখানে ৪৮ জন মানুষের বাস, সেখানে অরুণাচল প্রদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মা ১৭ জন বসবাস করেন। এটি সবচেয়ে কম জনবহুল রাজ্য। অতএব, অরুণাচল প্রদেশ আরও মানুষের বসবাসের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে।
সংগঠনটির বক্তব্য, যদি অরুণাচল প্রদেশ অন্য রাজ্যগুলিকে তার তথাকথিত বোঝা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানায়, তাহলে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে ওই রাজ্যও অন্য রাজ্যগুলির বোঝা ভাগ করে নেওয়ার নৈতিক দায় এড়াতে পারে না।
আরআরএজি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। আরআরএজি'র পরিচালকের বক্তব্য, 'চিন তাদের জিয়াওকাং প্রকল্পের অধীনে ভারত-চিন সীমান্ত বরাবর ৬২৮ টি গ্রাম নির্মাণ করেছে। যার মধ্যে ৯০ টি গ্রাম অরুণাচল প্রদেশ সংলগ্ন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর গড়ে তোলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অরুণাচল প্রদেশে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আরও জনসংখ্যার প্রয়োজন, কম নয়। চাকমা সম্প্রদায়ের হলেও তারা ভারতীয় নাগরিক—তাদের বিতাড়ন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। জাতীয় নিরাপত্তার এই হুমকি গোটা দেশের উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। চিন যেখানে সীমান্তে গ্রাম নির্মাণ করছে, সেখানে ভারত তার সীমান্ত জনবসতি হ্রাস করতে পারে না বা সেই মানুষদের নিপীড়ন করতে পারে না, যাদের জাতীয় স্বার্থে সেখানে বসবাসের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর ভারত সরকার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে (NEFA) জনবসতি বাড়ানোর একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের আওতায় তৎকালীন তিরাপ জেলায় বিজয়নগরে অসম রাইফেলসের প্রাক্তন সেনা এবং চাকমা ও হাজংদের বসবাসের জন্য প্রায় দুই হাজার পরিবারকে স্থানান্তরিত করা হয়। এই বসতি স্থাপন সম্পর্কিত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৯ সালের ১ মে'র রায়ে উল্লেখ করে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল:
'..এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন এবং বসবাস উৎসাহিত করা উচিত। এই অঞ্চল ভারতের সীমান্তবর্তী অংশ এবং এটি জনসাধারণের স্বার্থে এবং দেশের মঙ্গলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।'
চাকমা অভিযোগ করেন, কেবল চাকমা ও হাজংরাই নয়, বরং অসম রাইফেলস কর্মীরাও আজ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এবং তাঁদের সুরক্ষার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে আবারও চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল রায় দিতে হয়েছে।
ওই দুই জনগোষ্ঠীর বক্তব্য, চাকমা ও হাজংদের ওপর নিপীড়নের যেন শেষ নেই। ১৯৬৪ সালে যারা ভারতে চলে এসেছিল, তাদের এখনও নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। যদিও ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাদের পক্ষে রায় দিয়েছিল।
আরআরএজি'র পরিচালক চাকমা অরুণাচল প্রদেশ সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, '১৯৯৬ সালের রায় অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশ সরকার চাকমা-হাজং অভিবাসীদের নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত তাদের সরাতে পারে না। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার চাকমা-হাজং সেখানে বসবাস করছেন। তাদের সন্তানরা জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক। তারা নাগরিক হিসেবে ভোটও দিচ্ছেন। একজন চাকমা নাগরিকও অন্য কোনও উপজাতি নাগরিকের মতোই সমান অধিকারভোগী। সংবিধানের এমন প্রকাশ্য লঙ্ঘন, যেমন জীবনের অধিকার, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার, আইনের চোখে সমতা এবং বৈষম্যহীনতা মেনে নেবে না – যদি অরুণাচল প্রদেশ কোনওভাবে তাদের স্থানান্তর করতে চায়।