বিজেপি নেতা অমিত শাহ এখন দেশের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ছাড়িয়ে গেলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ ও লালকৃষ্ণ আডবাণীকে।

শেষ আপডেট: 5 August 2025 13:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট, সংসদের রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন ইতিহাসের এক বড়ো পরিবর্তনের— জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ করে অনুচ্ছেদ ৩৭০ তুলে নেওয়ার কথা। সেই ঘোষণার ছয় বছর পর, ২০২৫ সালের এই দিনেই আরেকটি ইতিহাসে নাম লেখালেন তিনি। বিজেপি নেতা অমিত শাহ এখন দেশের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ছাড়িয়ে গেলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ ও লালকৃষ্ণ আডবাণীকে।
অমিত শাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সামলানোর দিনসংখ্যা পৌঁছল ২,১৯৪-এ। আডবাণীর ছিল ২,১৯৩ দিন। জওহরলাল নেহরুর জমানায় একটা ৬ বছর ৫৬ দিন দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ। লালকৃষ্ণ আডবাণী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন ৬ বছর ৬৪ দিন। আর অমিত শাহ ৬ বছর ৬৫ দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পদে রয়েছে।
৩৭০ বিলোপ: বিজেপির আদর্শগত জয়ের রূপকার
২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরে অমিত শাহ যে প্রথম বড়ো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা ছিল ৩৭০ বিলোপ। বিজেপির দীর্ঘদিনের আদর্শগত লড়াইকে বাস্তবায়িত করে এই পদক্ষেপ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে লালকৃষ্ণ আডবাণী— বহু নেতার স্বপ্ন ছিল এক দেশ, এক সংবিধান। অমিত শাহ সেই স্বপ্নকে রূপ দেন বাস্তবে। জম্মু-কাশ্মীরের পুনর্গঠন আইন এনে রাজ্যটিকে ভাগ করেন দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে— জম্মু-কাশ্মীর (বিধানসভা সহ) এবং লাদাখ (বিধানসভা ছাড়াই)।
২০১৯-এর ৫ আগস্ট রাজ্যসভায় অমিত শাহ যে প্রস্তাব পেশ করেন, তা ছিল রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা পরিচালিত, এবং তা ১৯৫৪ সালের পুরনো আদেশকে বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের ওপর ভারতীয় সংবিধানের সব ধারা কার্যকর করে।
কাশ্মীরে সন্ত্রাস হ্রাস, পর্যটন বৃদ্ধি
শাহের মেয়াদে কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা অনেকটাই কমেছে। সন্ত্রাসবাদী হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ শতাংশ কমেছে এবং নিরাপত্তারক্ষীর প্রাণহানি কমেছে ৫৬ শতাংশ। সেই সঙ্গে কাশ্মীরে পর্যটনের নতুন জোয়ার এসেছে, যা পাকিস্তানের জন্য চিন্তার কারণ হয়েছে।
নকশাল দমনে সাফল্য
অমিত শাহের নেতৃত্বে বামপন্থী চরমপন্থা বা নকশাল সমস্যার বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান শুরু হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে যেখানে প্রায় ৫,২০০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়ায় ৬০০-র নিচে। একাধিক রাজ্যে সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে চরমপন্থা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নাগরিকত্ব আইন ও অপরাধ আইন সংস্কার
অমিত শাহের আরেকটি বড় উদ্যোগ ছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), যা ২০১৯ সালে পাস হয়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আগত সংখ্যালঘু হিন্দুদের নাগরিকত্ব পেতে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয় এই আইনে।
এ ছাড়াও, শাহের নেতৃত্বে দেশের ফৌজদারি আইনের বড় সংস্কার হয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং প্রমাণ আইনের পরিবর্তে আনা হয়েছে ভারতীয় ন্যায় সঞ্জীবিনী (BNS), নাগরিক সুরক্ষা সঞ্জীবিনী (BNSS) এবং ভারতীয় সাক্ষ্য আইন (BSA)। এই তিনটি নতুন আইন স্বাধীন ভারতের নিজস্ব বিচার কাঠামোর প্রতিষ্ঠা বলে মনে করছেন অনেকে।
তিন তালাক ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি
অমিত শাহের মেয়াদে বিলুপ্ত হয় তিন তালাক প্রথা। পাশাপাশি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (UCC) পক্ষেও কড়া সওয়াল করতে দেখা গেছে তাঁকে। এক দেশে এক আইনের পক্ষেই বার বার সওয়াল করে এসেছেন তিনি।
তবে সব কিছু সাফল্যের গল্প নয়। মণিপুরে দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত হিংসা এখনও শাহের মন্ত্রকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতা এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।