এয়ার ইন্ডিয়ার আমদাবাদ দুর্ঘটনায় যাত্রী ও তৃতীয় পক্ষের জন্য ক্ষতিপূরণ কীভাবে নির্ধারিত হবে? আইন অনুযায়ী কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে, জানুন বিস্তারিত।

এয়ার ইন্ডিয়া দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ।
শেষ আপডেট: 17 June 2025 12:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬০ জনেরও বেশি। এই দুর্ঘটনায় শুধু যাত্রীরা মারা গেছেন তা নয়, চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিমানের ধাক্কায় গুঁড়িয়ে যাওয়া বিজে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের মেস। বহু তরুণ চিকিৎসা-শিক্ষার্থীর প্রাণ গেছে। আশপাশের বাড়িঘরও ধ্বংস হয়েছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আইনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে। জেনে নেওয়া যাক, কোন আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণের দাবি করা সম্ভব এবং কী ধরনের দায়বদ্ধতা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ভারতের বর্তমান আইনি কাঠামোয় বিমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কয়েকটি প্রধান আইনের মধ্যে পড়ে, যার মধ্যে রয়েছে Carriage by Air Act, 1972, Montreal Convention, 1999, এবং সাধারণ টর্ট আইন।
প্রথমত, Carriage by Air Act, 1972, মূলত আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে তৈরি একটি আইন যা যাত্রী, মালপত্র ও বিমানের মাধ্যমে পরিবহনে তৃতীয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ করে। এই আইন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের উড়ান পরিষেবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এই আইনের পাশাপাশি, ১৯৯৯ সালের মন্ট্রিয়াল কনভেনশন ভারতের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক, কারণ ভারত ২০০৯ সালে এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই কনভেনশনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রী নিহত বা আহত হলে বিমান সংস্থার ওপর একটি কঠোর দায়বদ্ধতা আরোপ করা হয়। অর্থাৎ, বিমান সংস্থার কোনও দোষ প্রমাণ না হলেও তারা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
মন্ট্রিয়াল কনভেনশনের ধারা অনুযায়ী, বিমান দুর্ঘটনায় একজন যাত্রী মারা গেলে বা গুরুতর আহত হলে, বিমান সংস্থাকে সর্বোচ্চ ১,১৩,১০০ স্পেশাল ড্রইং রাইটস (SDR), যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) নির্ধারিত একটি মুদ্রা একক পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি টাকারও বেশি। এই ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয় বিমা কাভারেজ, যাত্রীর বয়স, উপার্জনক্ষমতা ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের বিবেচনায়।
দুর্ঘটনার আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এই বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে সেসময় সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যাঁরা বিমানের যাত্রী ছিলেন না, কিন্তু দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, বা আহত হয়েছেন, তাঁরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন।
এই ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে টর্ট আইন, যা ভারতীয় দণ্ডবিধির বাইরের একটি বেসরকারি নাগরিক আইন। টর্ট আইনের আওতায়, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্যের ক্ষতির জন্য দায়ী হয়, বিশেষত অবহেলার কারণে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সেই পক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
এক্ষেত্রে বিমানটি যেভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হোস্টেলের মেসে আছড়ে পড়েছে, যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে এর পিছনে এয়ার ইন্ডিয়ার অবহেলা ছিল, কারিগরি ত্রুটি বা উড়ানের আগে যথাযথ নিরাপত্তা যাচাই না করার দৃষ্টান্ত ছিল, তবে বিমান সংস্থার বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষেরও ক্ষতিপূরণের মামলা করার সুযোগ থাকবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের বা মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি পদ্ধতিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। নাগরিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা বা সিভিল স্যুট, এবং যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিমান পরিবহন সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল বা আন্তর্জাতিক ফোরামে মামলা।
তবে সরকার যদি তদন্তে প্রমাণ পায় যে দুর্ঘটনার পেছনে অবহেলা রয়েছে, তবে ক্রিমিনাল দায়ও নির্ধারিত হতে পারে।
এই দুর্ঘটনায় ডিজিসিএ (DGCA) ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। বোয়িং, এয়ার ইন্ডিয়া এবং এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া—এই তিন পক্ষের ভূমিকাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হোস্টেলে বিমান আছড়ে পড়া নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা এবং জমির ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়ও তদন্তাধীন।