পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছিলেন হরিশ রানা (Harish Rana)। ২০১৩ সালে তাঁর পেয়িং গেস্ট হাউসের চারতলা থেকে পড়ে মারাত্মক আঘাত পেয়েছিলেন মাথায়।

অন্তিম যাত্রায় হরিশ রানা
শেষ আপডেট: 16 March 2026 10:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৩ বছর কোমায় শুয়ে ছেলে, সবরকম চেষ্টা করেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছেন বাবা-মা। দিনের পর দিন চোখের সামনে কেবল ছেলেকে যন্ত্রণা পেতে দেখেছেন, বেঁচে ছিলেন লাইফ সাপোর্টে। শেষমেশ সেই হরিশ রানার (Harish Rana) চিকিৎসা বন্ধ করে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)।
শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পর ৩২ বছরের হরিশ রানাকে গাজিয়াবাদ থেকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে দিল্লির এইমসে (AIIMS)। যেখানে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে লাইফ সাপোর্ট (Life Support) তুলে নেওয়া হবে। দেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম আদালত-স্বীকৃত প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার (passive euthanasia) ঘটনা।
শুক্রবার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় (Harish Rana Video Social media) ছড়িয়ে পড়ে, হরিশকে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন তাঁর ব্রহ্মাকুমারী বোন। চোখ ভরা জল, কপালে তিলক, আর কোমল স্বরে বলছেন, "সবাইকে ক্ষমা করে দাও, সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও… এবার যাওয়ার সময় হয়েছে।”
ব্রহ্মাকুমারীদের সঙ্গে বহু বছর ধরে যুক্ত রানা পরিবার। ১৩ মার্চ ব্রহ্মাকুমারী কেন্দ্রের আধ্যাত্মিক নেত্রী সিস্টার কুমারী লাভলি দিদি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে তিলক ও প্রার্থনা করেন হরিশের জন্য।
দুর্ঘটনা ও ১৩ বছরের সংগ্রাম
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছিলেন হরিশ রানা (Harish Rana)। ২০১৩ সালে তাঁর পেয়িং গেস্ট হাউসের চারতলা থেকে পড়ে মারাত্মক আঘাত পেয়েছিলেন মাথায়। তারপর থেকেই তিনি কোমায় এবং পরবর্তী সময়ে ভেজিটেটিভ স্টেটে (vegetative state) ছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর অবস্থার আর উন্নতির সম্ভাবনা ছিল না।
হরিশ রানার জীবন কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখা হচ্ছিল ফিডিং টিউবের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করে। কিন্তু ২০১৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকায় মূলত ভেন্টিলেটরের মতো জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র সরানোর কথা বলা হয়েছিল। ফিডিং টিউবের মাধ্যমে পুষ্টি দেওয়া বন্ধ করা যাবে কিনা— এই বিষয়টি তখন স্পষ্ট ছিল না। এই আইনি জটিলতার কারণেই হাসপাতাল স্তরে চিকিৎসা প্রত্যাহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। এহেন পরিস্থিতিতেই হরিশ রানার বাবা-মা আদালতের দ্বারস্থ হন।
গত ১১ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে জানায়, এই ধরনের মামলায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে— জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া রোগীর জন্য সত্যিই উপকারী হচ্ছে কিনা বা তাঁর কাজে লাগছে কিনা। নাকি সেটা কেবল কৃত্রিমভাবে তাঁর জীবনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আদালত জানায়, রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ (best interest) বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ভারতের কোনও আদালতের নির্দেশে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার (passive euthanasia) ঘটনা এটিই প্রথম। আইনজ্ঞদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক Common Cause মামলার নির্দেশিকাকে আরও স্পষ্ট করল। ২০১৮ সালে Common Cause বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবার মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এর অংশ বলে স্বীকৃতি দেয় এবং প্যাসিভ ইউথেনেশিয়াকে বৈধতা দেয়। তবে সেই রায়ে কিছু প্রক্রিয়াগত বিষয় পরিষ্কার ছিল না। হরিশ রানার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশিকাকে আরও স্পষ্ট করে দিল।
হরিশ রানার দীর্ঘ ১৩ বছরের চিকিৎসা-সংগ্রামের শেষে এই রায় শুধু তাঁর পরিবারের জন্যই নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিশা দেখাবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।