১৯৯৪ সালে গান্ধী ময়দান থেকে লালু প্রসাদ যাদব চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন নীতীশকে, আজ সেখানেই দশম বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন তিনি। তিন দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী এই ঐতিহাসিক জায়গা আবারও দেখল বিহার রাজনীতির বড় মুহূর্ত।

নীতীশ কুমার ও লালু
শেষ আপডেট: 20 November 2025 15:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাটনার ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দান। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে ইমার্জেন্সি বিরোধী আন্দোলন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু মোড় ঘোরানো ঘটনার সাক্ষী এই মাঠ। এখানেই জেপি আন্দোলনের সময় জয়প্রকাশ নারায়ণের বিখ্যাত স্লোগান শোনা যায়, 'সিংহাসন ছোড়ো, কে জনতা আতি হ্যায়।' যা দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। তরুণ ছাত্রনেতা লালু প্রসাদ যাদব ও নীতীশ কুমার সেই আন্দোলন থেকেই উঠে আসেন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে।
বছর ৩০ পর, সেই গান্ধী ময়দানেই তৈরি হল ইতিহাস। দশমবারের জন্য শপথ নিলেন নীতীশ কুমার (Nitish Kumar Oath Ceremony)। মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, এই মঞ্চই নীতীশ–লালুর রাজনৈতিক সম্পর্কের উত্থান-পতনের সাক্ষী।
লালুর সঙ্গে স্বস্তির থেকে দূরত্বের শুরু
১৯৯০ সালে লালু প্রসাদ যাদব (Lalu Prasad Yadav) প্রথমবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন। গান্ধী ময়দানের সেই সভায় তাঁর পিছনে হাততালি দিচ্ছিলেন নীতীশ। দুই নেতা তখন একদম সহযোদ্ধা। কিন্তু অল্প সময়েই দূরত্ব বাড়ে। নীতীশ মনে করতেন লালু শাসনব্যবস্থা ঠিকমতো দেখছেন না। লালুর সন্দেহ ছিল নীতীশ তাঁকে সরানোর চেষ্টা করছেন।
প্রবীণ সাংবাদিক শংকরশণ ঠাকুরের বই The Brothers Bihari–তে লেখা আছে, এক আলাপচারিতায় লালু নীতীশকে ঠাট্টা করে বলেন, 'তুম হামকো রাজ-পাঠ শিখাওগে? গভার্নেন্স সে পাওয়ার মিলতা হ্যায় ক্যায়া? পাওয়ার মিলতা হ্যায় ভোট ব্যাঙ্ক সে।'
১৯৯২ নাগাদ সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। কথা বন্ধ হয়ে যায় দু’জনের মধ্যে। দিল্লির বিহার ভবনে তীব্র তর্কাতর্কির পর নীতীশ লালুকে চিঠি লেখেন, তিনি আর একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন না।
কুর্মি–কোয়েরি আন্দোলন ও কঠিন সিদ্ধান্ত
মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সময় কুর্মি ও কোয়েরি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। অভিযোগ, যাদবরা না কি সব সুবিধা পাচ্ছে। এই অসন্তোষেরই বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৯৪ সালের কুর্মি-চেতনা ব়্যালিতে। লালুর কাছে খবর যায়, নীতীশ সেখানে গেলে তিনি ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন। গান্ধী ময়দানে তখন ঢল নেমেছে মানুষের। লালুর প্রশ্ন, “আয়া জি নিতিশওয়া? পতা করো কাঁহা হ্যায়?”
নীতীশ ছিলেন কাছেই, বন্ধু বিজয় কৃষ্ণের বাড়িতে। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, তাঁর ঘনিষ্ঠরা বলেছিলেন, এটাই সুযোগ, না গেলে আর কোনওদিন সুযোগ পাবেন না।
বিকেল তিনটে। নীতীশ মঞ্চে ওঠেন। আর ফেরার পথ নেই, গর্জে ওঠেন, “ভিক ন্যাহি, হিস্সেদারি চাহিয়ে... যো সরকার হামারে হিতো কো নজারআন্দাজ কারতি হ্যায়, ও সরকার সত্ত্বা মে ব়্যাহে নহি সকতি।” আর গান্ধী ময়দানে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তখনই অন্য পথে মোড় নেয়।
৩১ বছর পর- গান্ধী ময়দানে নীতীশের দশম ইনিংস
আজ, ২০২৫–এ, সেই গান্ধী ময়দানেই দশমবার শপথ নিলেন নীতীশ কুমার। এই সময়ের মধ্যে তিনি তৈরি করেছেন ‘সুশাসন বাবু’র ভাবমূর্তি, আবার রাজনৈতিক পালাবদলের জন্য পেয়েছেন ‘পাল্টু কুমার’ উপাধিও।
এদিকে লালু যাদবের দল RJD বড় ধাক্কা খেয়েছে এবার, পরিবারেও শুরু হয়েছে ভাঙন। লালু নিজে বয়স ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় জেরবার, একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি। নীতীশও বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন।
তবু আজকের দিনটা নীতীশ কুমারের। বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সেই নীতীশই মুখ্যমন্ত্রী। আর লালুর দেওয়া চ্যালেঞ্জ, সেই জায়গা থেকেই এদিন শুরু হল বিহারের আগামী পাঁচ বছরের পথচলা।