গত ১১ বছর ধরে এই ধারা চলছে। ১৫ অগস্ট (15th August) , স্বাধীনতা দিবসে (Independence Day) লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। আর আমরা অনেকেই বিস্ময় বালকের মতো চেয়ে থাকি!
.jpeg.webp)
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 15 August 2025 17:43
গত ১১ বছর ধরে এই ধারা চলছে। ১৫ অগস্ট (15th August) , স্বাধীনতা দিবসে (Independence Day) লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। আর আমরা অনেকেই বিস্ময় বালকের মতো চেয়ে থাকি! ভাবি— আহা, বাহা, স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে এমন কথা কোন প্রধানমন্ত্রীই বা বলতে পেরেছেন!
ফি বছর লালকেল্লায় মোদীর সাফাও (পড়ুন পাগড়ি) বদলে বদলে যায়। আমরা খবর লিখি তা নিয়েও। অথচ সারা বছর কঠোর কায়িক পরিশ্রমের মধ্যে, এই ১৫ অগস্ট দিঘা-পুরী-দার্জিলিংয়ের অবসরে খুব কম মানুষই হয়তো ভেবে দেখি, কোন কথা নতুন, কোন কথা পুরো ফাঁপা, আর কোন কথাই বা কেবল রাজনীতি আর হাততালির জন্য!
শুক্রবার লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এবারেও একটি ‘নতুন ঘোষণা’ করেছেন। এমন একটি কথা, যা শুনে শুভেন্দু অধিকারী বা শমীক ভট্টাচার্যরা অতিশয় আহ্লাদিতও হয়ে পড়তে পারেন। তা হল, এবার একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ গঠন করবে মোদীর সরকার। যে মিশনের লক্ষ্য হবে, দেশজুড়ে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
লালকেল্লায় গেরুয়া পাগড়ি পরে মোদী এদিন বলেন, “পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার বিন্যাস বদলানোর চেষ্টা চলছে, নতুন সঙ্কটের বীজ বপন করা হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীরা দেশের যুবকদের রোজগার কেড়ে নিচ্ছে, আমাদের মা-বোন-মেয়েদের নিশানা করছে, আদিবাসীদের জমি দখল করছে। এটা কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না।”
আমি দিল্লিতে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম ২০০৩ সালে। তখন অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী হলেন লালকৃষ্ণ আডবাণী। সে সময়ে এখনকার মতো শ’য়ে শ’য়ে মিডিয়া ছিল না। সংসদের ভিতরে বা বাইরে এবং বিজেপির পার্টি অফিসে লালকৃষ্ণ আডবাণীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেত। প্রশ্নের উত্তর দিতেও দ্বিধা করতেন না তিনি। অন্তত একশো বার আডবাণীর বক্তৃতায় বা তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অনুপ্রবেশ নিয়ে অসন্তোষের কথা শুনেছি। এমনকি মনমোহন জমানাতেও আডবাণী বারবার সরব হয়েছেন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে। তিনি সমালোচনা করতেন এ ব্যাপারে মনমোহন-সনিয়ার নরমপন্থা নিয়েও। বিজেপির ওয়েবসাইটে গেলে এখনও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁর সেই সব বিবৃতি।
আডবাণীর সে সব কথার পরে প্রায় দুই যুগ সময় অতিক্রান্ত। তাই সরল ও স্বাভাবিক প্রশ্ন হল, অনুপ্রবেশ যে সমস্যা, তা বুঝে উঠতে এত বছর সময় কেটে গেল? ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তথাকথিত ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ গঠন করতে কেন ১১ বছর লেগে গেল তাঁর সরকারের!!
আসলে হয়তো এও ষোল আনা রাজনীতি। গ্যালারির জন্য। পুরনো ‘পেপার ব্যাকের’ নতুন ‘হার্ড কভার’।
প্রধানমন্ত্রীকে অনেকেই প্রশ্ন করতেই পারেন, আচ্ছা, অনুপ্রবেশের ঘটনা ঠিক কবে থেকে ঘটছে? ঠিক কবে বোঝা গেল, ভারতের জনবিন্যাস বদলে বদলে যাচ্ছে, দেশের যুবকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে ঘুসপেটিয়ারা, আর এ দেশের মা-বোনেরা আক্রান্ত হচ্ছে?
২০১৪ থেকে আপনার নেতৃত্বে দেশ চলছে। সীমান্ত সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়ভার আপনার সরকারের হাতে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, এটা আগের কংগ্রেস সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যা হয়, তবে গত ১১ বছরে আপনি কী করলেন? কেন এখনও অনুপ্রবেশের সমস্যার সমাধান হল না?
সন্দেহ নেই, মানুষের আবেগ, জাতীয়তাবোধ ও নিরাপত্তাহীনতার মনোভাবকে এই পুরনো ভয় দিয়ে নাড়ানোর কৌশল রাজনৈতিকভাবে চৌখস। কারণ, ভোটাররা অনেকে এখনও এইসব সহজ আবেগঘন গল্পে প্রভাবিত হয়ে যান।
ঠিক যেমন ভাবে চোদ্দো সালের আগে মনে হয়েছিল, আচ্ছে দিন আসবে, কালো টাকা দেশে ফিরবে, আর দেশের সব মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে ঢুকে যাবে। মেক ইন ইন্ডিয়া, জনধন যোজনা, মুদ্রা স্কিম, অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট, স্বচ্ছ ভারতের মতো প্যাকেজিং এভাবেই তো চলেছে বছরের পর বছর। বা পুরনো প্রকল্প নতুন জামা পরে হেঁটে এসেছে ব়্যাম্পে। তার পর ক্রমশ ফিকে হয়ে মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। আমরা খোঁজও রাখিনি। ঠিক যেভাবে খোঁজ রাখিনি, কোভিডের সময়ে থালা বাজানোর পরে, সেই শব্দ কত দূর পর্যন্ত গেল!
অনেকের মতে, ২০২৫ সালের ১৫ অগস্টে আমরা যে মোদীকে দেখলাম, তিনি ২০১৪-র ঝলমলে, আত্মবিশ্বাসী নেতার কেবল ছায়ামাত্র। নতুন কোনও দৃষ্টিভঙ্গি নেই, নেই সৃজনশীল নীতির প্রস্তাব। বরং পুরনো কৌশল, পুরনো স্লোগান, পুরনো প্রতিশ্রুতির ভিড়ে ঠাসা বক্তৃতার ভাষা ও ভঙ্গিতে এক ধরনের ক্লান্তি ধরা পড়েছে। সেটা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে নয়, বরং নতুন কিছু বলার মতো বিষয় ফুরিয়ে আসার ইঙ্গিতটাই দিচ্ছে টিংটং করে।
সংবিধান, ঐক্য, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সমাবেশি অর্থনীতির কথা বলেছেন মোদী। অথচ অনেকে মনে করেন, এই সব ‘উচ্চ নীতি’ তাঁর সরকারের কার্যকলাপে সেভাবে প্রতিফলিতই হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, তিনি এমন সব আইন বাতিল করবেন যা নাগরিকদের অযথা জেলে পাঠাতে কাজে লাগানো হত। অথচ গত এক দশকে বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, সামাজিক আন্দোলনকারী তো এই সব আইনেরই অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, সমাজমাধ্যমে মতপ্রকাশের জন্য গ্রেফতার, আদালতে জামিন প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে রাখা— এসবই তাঁর শাসনকালে ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী এদিনও ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। অথচ বেশি না, সামান্য পিছনে হাঁটলেই দেখা যাবে বিভাজনমূলক মন্তব্য, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ আক্রমণ করা, ভোটের প্রচারে সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত— এসব তাঁর রাজনৈতিক অস্ত্রভাঁড়ার আলো করে ছিল। চব্বিশ সালে বাংলায় প্রচারে এসে তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেটুকু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেই যথেষ্ট। আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, ব্যারাকপুরে তাঁর বক্তৃতার রেকর্ডিংটা একবার মিলিয়ে দেখা যেতেই পারে। তাই সংবিধানপ্রণেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের প্রশংসা মুখে যতই শোভা পাক, কার্যক্ষেত্রে তা অনেক সময়ই বিপরীত সংকেত দিয়েছে বলেই বহুজনের মত।
প্রধানমন্ত্রী এদিন তাঁর বক্তৃতায় বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নয়নের পথে ৫০ বছর ফাইল আটকে ছিল। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে, চণ্ডীগড়ে সেমিকন্ডাক্টর কমপ্লেক্স ১৯৮৩ সালেই গড়ে উঠেছিল। একইভাবে, তিনি মহিলাদের স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন যেন দেশের স্বনির্ভর আন্দোলনের সূচনা তাঁর হাত ধরেই। ভারতের কো-অপারেটিভ আন্দোলন এবং মহিলা গোষ্ঠীর আর্থিক ক্ষমতায়নের ইতিহাস বহু পুরনো— যা নেহরু, ইন্দিরা এবং অন্যান্য নেতাদের সময়েই বিকশিত হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী এখনও ‘লোকাল ফর ভোকাল’ স্লোগান দিয়ে আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখান। কিন্তু বাস্তব ছবি তাঁর কথাকেই চ্যালেঞ্জ ঠোকে। ২০১৪ সালে চিনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ১০ বছর পর ২০২৪ সালে তা ১০০ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। মেক ইন ইন্ডিচয়ার প্রভাব এই পরিসংখ্যানে দেখা যায় কি!
রাজনীতিক এবং অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশের মতে, বর্তমান ভারতবর্ষের মূল সমস্যা হল— বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, আয় বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো খাতে দুর্বলতা। কিন্তু শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় এ সব নিয়ে স্পষ্ট দিশার অমিল। বরং অনুপ্রবেশ, ষড়যন্ত্র, জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার বিষয় নিয়ে অনেক সময় ব্যয় করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, তিনি বিরোধীদের সমালোচনা করতে চান না। কিন্তু এই বক্তৃতাতেই কংগ্রেস জমানায় সিন্ধুর নদীর জল চুক্তির মাধ্যনে পাকিস্তানকে সাহায্য করার অভিযোগ তুলেছেন। একবারও তাঁর মনে পড়েনি ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে সবুজ বিপ্লব হয়েছিল। জহরলাল নেহরুর সময়ে তৈরি হয়েছিল বিজ্ঞান, শক্তি ও মহাকাশক্ষেত্রে মাইলফলক সব প্রতিষ্ঠান।
প্রধানমন্ত্রী এদিন জিএসটি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা বিরোধীরা বহুদিনের দাবি ছিল। একইভাবে আয়কর আইনের পরিবর্তনকেও বড় সংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করেছেব প্রধানমন্ত্রী। সেটাও নতুন কোনও চিন্তা নয়।
সর্বভারতীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা অনেকে মনে করেন, স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ বা আত্মপ্রশংসার মঞ্চ নয়— দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নকশা যেন লালকেল্লার বক্তৃতায় দেখতে পান মানুষ। এবারের বক্তৃতায় সেই দূরদর্শিতা দেখা গেল কি? একবার কি গভীরে গিয়ে ভাবব না আমরা?