
শেষ আপডেট: 21 December 2023 17:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৮ মাসের মাথায় মণিপুরে জাতি দাঙ্গায় নিহত কুকি সম্প্রদায়ের ৮৭ জনের দেহ বুধবার গণ কবর দেওয়া হল। কুকি-জো জাতি গোষ্ঠীর চোখে যাঁরা জাতি দাঙ্গার শহিদ। মেইতেই সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের খুন করেছে বলে কুকিদের অভিযোগ। বুধবার কুকিদের একটি সংগঠন দাবি করেছে, কবর দেওয়ার আগে নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গান স্যালুট দেওয়া হয়।
গণ সৎকারের পর কুকি সম্প্রদায়ের নাগরিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, জাতি দাঙ্গা শুরুর পর প্রশাসনের একাংশ এবং মেইতেই সম্প্রদায় দাবি করেছিল নিহত কুকিরা বহিরাগত। তারা মায়ানমারের ভাড়াটে সেনা। কিন্তু বেশিরভাগ নিহতের পরিবার নথি সহ দেহ শনাক্ত করায় প্রমাণ হয়েছে তাঁরা মণিপুরেরই বাসিন্দা।
বুধবার মণিপুরের চূড়াচাঁদপুরের শেখেন গ্রামে গণ কবরের ব্যবস্থা করা হয়। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় নিহতদের পরিবার এবং জয়েন্ট ফিলানথ্রপিক অর্গানাইজেশন যৌথভাবে সৎকারের ব্যবস্থা করে বলে জানা গিয়েছে।
এর আগে গত ১৬ ডিসেম্বর কুকি সম্প্রদায়ের নিহত ১৯ জনের দেহ কাংগপকপি জেলায় কবর দেওয়া হয়। নিহতরা সকলেই খ্রিষ্টান।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকার বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকা দেহ সৎকারের উদ্যোগ নেয়। কুকি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন দাবি করেছিল দেহগুলি গণ কবরের ব্যবস্থা করতে হবে।
বুধবার যে ৮৭টি দেহ কবর দেওয়া হয় তার মধ্যে ৪৬টি চূড়াচাঁদপুরের হাসপাতালের মর্গে রাখা ছিল। বাকি ৪১টি দেহ সংরক্ষিত রাখা ছিল ইম্ফল হাসপাতালে। গত সপ্তাহে হেলিকপ্টারে করে দেহগুলি চূড়াচাঁদপুরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
মণিপুরের তিনটি মর্গে পড়ে থাকা ৯৪টি মরদেহের মধ্যে ৮৮টি দু সপ্তাহের মধ্যে সৎকার করতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে ১৩ ডিসেম্বর।
রাজ্য প্রশাসনের অনুরোধে কেন্দ্রীয় সরকার হেলিকপ্টার বরাদ্দ করে। কপ্টারে চাপিয়ে দেহগুলি সংশ্লিষ্ট জেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সড়ক পথে দেহগুলি নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বলে রাজ্য সরকার মনে করছিল।
মণিপুরে জাতি দাঙ্গা শুরু হয় গত ৩ মে। মর্গে পড়ে থাকা দেহগুলি ছিল সেই সময়ে কুকি ও মেইতেইদের মধ্যে সংঘর্ষে এবং পুলিশ ও আধা সেনার অভিযানে নিহতদের।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য ছিল, চলতি পরিস্থিতিতে নাগরিক সংগঠনগুলির গণ সৎকারের দাবি মানা সম্ভব নয়। তাতে রাজ্যে জাতিগত সংঘাত আরও বেড়ে যেতে পারে। সরকারই দেহগুলির সৎকার করবে।
কিন্তু সংঘর্ষে লিপ্ত কুকি এবং মেইতেই সম্প্রদায় দাবিতে অনড় ছিল যে দেহ তাদের সংগঠনের হাতে দিতে হবে। সেই দাবি রাজ্য সরকার আংশিক মেনে নেয়।
মণিপুরে গত ৩ মে জাতিদাঙ্গা শুরুর পর এখনও পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। বেসরকারি মতে সংখ্যাটি অনেক বেশি।
সংঘর্ষ চলাকালে বহু দেহ লোপাট করে দেওয়া হয়েছে বলে দু পক্ষই দাবি করেছে।
মর্গে থাকা ৯৪টি দেহের মধ্যে ৮৮টি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরিবারের লোকেরা শনাক্ত করার পর তাদের হাতে দেহ তুলে দিতে চায় প্রশাসন। কিন্তু মণিপুরে কুকি ও মেইতেই সংঘর্ষে লিপ্ত দুই সম্প্রদায়েরই নাগরিক সমাজ দাবি তোলে তাদের সম্প্রদায়ের নিহতদের দেহগুলি তারা গণ সৎকার করবে। দেহগুলি তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক।
সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত একটি কমিটির বক্তব্য ছিল, একাধিক নাগরিক সংগঠন নিহতদের পরিবারকে দেহ সৎকারে বাধা দিচ্ছে।
মণিপুরে মানবিক সংকটের বিষয়গুলি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি গীতা মিত্তালের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গড়ে দেন। সেই কমিটি হিংসাবিদ্ধস্ত রাজ্যটিতে এই মানবিক সংকট চিহ্নিত করে।
৯৪টির মধ্যে ছয়টি দেহের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। বাকি ৮৮টি মৃতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ব্যক্তিগতভাবে দেহ নিতে অস্বীকার করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত কমিটির চেয়ারপারসন বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) গীতা মিত্তলের বক্তব্য ছিল, বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর চাপ রয়েছে পরিবারগুলির উপর। তাই স্বজনেরা দেহ নিতে আসছে না। প্রধান বিচারপতির এজলাসে এই মর্মে রিপোর্ট জমা হওয়ার পর শীর্ষ আদালত মণিপুর সরকারকে বলে, শনাক্ত হওয়া দেহগুলি যেন দু’সপ্তাহের মধ্যে প্রশাসন সৎকার করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত কমিটি শীর্ষ আদালতকে দেওয়া রিপোর্টে বলেছিল, দেহগুলির সরকারি উদ্যোগে সৎকার করা হোক। এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে অনুরোধ করে কমিটি।
৩ মে জাতি দাঙ্গা শুরুর পর সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ নিহত হন। আহত হাজারের বেশি। তাদের অনেকের এখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।
আদালতে কুকি ও মেইতেই দুই সম্প্রদায়ের তরফেই দাবি করা হয়েছিল, তাদের হাতে সম্প্রদায়ের নিহতদের দেহগুলি দেওয়া হোক। তারা গণ সৎকারের ব্যবস্থা করতে চায়। কিন্তু প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ এই দাবি মানতে চায়নি।
তাদের বক্তব্য, এতে অশান্তি ফের বেড়ে যাবে। গণ সৎকারের ছবি মানুষের মনে হিংসা জাগ্রত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে এমন দাবি মানা সম্ভব নয়।
সরকারি সূত্রে খবর, এই ব্যাপারে আর জেদাজেদির সুযোগ না দিয়ে রাজ্য প্রশাসন দুই সম্প্রদায়ের দাবিই মেনে নিল। রাজ্য সরকারের অনুরোধে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক দেহ বহনের জন্য গত সপ্তাহে দুটি হেলিকপ্টার বরাদ্দ করে।