এই ঘটনায় আবারও রেললাইন ও বন্যপ্রাণীর সংঘর্ষ নিয়ে প্রশ্ন উঠল। বিশেষ করে হাতির করিডরের বাইরে এমন দুর্ঘটনা হওয়ায় বন ও রেল দফতরের সমন্বয় এবং আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
.jpeg.webp)
ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 20 December 2025 10:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসমের (Assam ) হোজাই জেলায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল শনিবার ভোররাতে। সাইরাং–নয়াদিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেসের (Rajdhani express) সঙ্গে একটি হাতির পালের সংঘর্ষে অন্তত ৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে (8 Elephants killed)। দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছে একটি হাতির শাবক, যাকে পরে বন দফতরের কর্মীরা উদ্ধার করেন। এই ঘটনায় রেল চলাচলেও বড়সড় ব্যাঘাত ঘটেছে (train services disrupted in north east)।
রেল ও বন দফতর সূত্রে খবর, শনিবার ভোর প্রায় ২টা ১৭ মিনিট নাগাদ এই দুর্ঘটনা ঘটে। রাজধানী এক্সপ্রেসটি মিজোরামের সাইরাং (আইজলের কাছে) থেকে নয়াদিল্লির আনন্দ বিহার টার্মিনালের দিকে যাচ্ছিল। হোজাইয়ের কাছে হঠাৎ লাইনের উপর উঠে আসে একটি হাতির দল। লোকো পাইলট হাতিদের দেখতে পেয়ে জরুরি ব্রেক কষেন, কিন্তু তাতেও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি। হাতিরা ট্রেনের সামনে ধাক্কা খেলে ইঞ্জিন ও পাঁচটি কোচ লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে।
বন দফতরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় মোট ৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই পালে ৮টি হাতিই ছিল এবং সংঘর্ষে অধিকাংশেরই প্রাণ যায়। যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে তা কোনও ঘোষিত হাতির করিডর নয় বলেও জানানো হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় কোনও যাত্রী হতাহত হননি বলে রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া এবং লাইনের উপর হাতির দেহাংশ ছড়িয়ে পড়ায় আপার অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রুটে রেল পরিষেবা ব্যাহত হয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রেল দুর্ঘটনা মোকাবিলা দল ও ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা।
রেল সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কোচের যাত্রীদের সাময়িকভাবে ট্রেনের অন্যান্য কোচের ফাঁকা বার্থে স্থান দেওয়া হয়েছে। ট্রেনটি গুয়াহাটিতে পৌঁছনোর পর অতিরিক্ত কোচ জুড়ে সকল যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
এই ঘটনায় আবারও রেললাইন ও বন্যপ্রাণীর সংঘর্ষ নিয়ে প্রশ্ন উঠল। বিশেষ করে হাতির করিডরের বাইরে এমন দুর্ঘটনা হওয়ায় বন ও রেল দফতরের সমন্বয় এবং আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যু (Train elephant collision )
ভারতের দ্রুত বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক ক্রমশই বন্যপ্রাণের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠছে—বিশেষ করে হাতিদের ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক একটি সরকারি সমীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। ২০০৯-১০ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে দেশে অন্তত ১৮৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির জেরে এবার ১৪টি রাজ্যের মোট ৭৭টি রেলপথ চিহ্নিত করেছে কেন্দ্র, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক, রেল মন্ত্রক এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য বন দফতরের যৌথ উদ্যোগে এই সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষার আওতায় আনা হয় ১২৭টি রেলপথ, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩,৪৫২ কিলোমিটার। অতীতে হাতির চলাচল ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে তার মধ্যে ৭৭টি রেলপথকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, এই ধরনের সুসংগঠিত রেল–বন্যপ্রাণ সংঘর্ষ বিশ্লেষণ এই প্রথম।
সমীক্ষার সময় বিশেষজ্ঞ দল পায়ে হেঁটে ও ট্রলির মাধ্যমে রেললাইন পরিদর্শন করেন। লাইনের উচ্চতা, আশপাশের ঝোপঝাড়, বিদ্যমান পরিকাঠামো এবং জলনিকাশির ব্যবস্থার মতো নানা বিষয় খতিয়ে দেখে ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
হাতির মৃত্যু কমাতে মোট ৭০৫টি বিশেষ কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
* ৫০৩টি র্যাম্প ও লেভেল ক্রসিং
* ৭২টি সেতুর সম্প্রসারণ ও পরিবর্তন
* ৬৫টি আন্ডারপাস
* ২২টি ওভারপাস
* ৩৯টি বেড়া, ব্যারিকেড বা ট্রেঞ্চ
* ৪টি এক্সিট র্যাম্প
এই সমস্ত কাঠামোর লক্ষ্য একটাই—হাতিদের নিরাপদে রেললাইন পার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া অথবা বিপজ্জনক এলাকাগুলি থেকে তাদের অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
হাতির সংখ্যা বেশি এমন রাজ্যগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অসমে তৈরি হবে ১৩১টি লেভেল ক্রসিং ও র্যাম্প, মহারাষ্ট্রে ১২৫টি এবং উত্তরপ্রদেশে ৯২টি।
২০১৭ সালের হাতি গণনা অনুযায়ী, কর্ণাটকে সবচেয়ে বেশি বন্য হাতি রয়েছে—৬,০৪৯টি। এরপরেই অসম (৫,৭১৯), কেরল (৫,৭০৬) এবং তামিলনাড়ুতে (২,৭৬১)। এই রাজ্যগুলিতেই ঘন বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে সক্রিয় রেললাইন যাওয়ায় সংঘর্ষের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।