.webp)
ইউসুফ পাঠান - ফাইল চিত্র।
শেষ আপডেট: 21 March 2024 22:50
সকালে একবার মসজিদের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুঁ মেরেছি। তখন আটটা বাজে। মসজিদে ঢুকে চওড়া উঠোনের ডান দিকের কোণে দুটো ঘুপচি ঘর। বাইরে থেকে আন্দাজ করা যাচ্ছিল, একেকটি ঘরের আয়তন দশ বাই দশ হবে কিনা সন্দেহ। রান্নাবান্নার ব্যবস্থাও তারই মধ্যে। দরজার সামনে মলিন একটা পর্দা ঝুলছে।
ভিতরে কেউ আছে কিনা হেঁকে ডাকলে এক কিশোরী বেরিয়ে আসে। কথা বলে জানলাম ওঁর বোন। নাম শগুফতা। বলল, ‘বাবা নেই। মা-বাবা দাদার খেলা দেখতে পাকিস্তানে গেছে। বড়ে ভাইও বাড়িতে নেই। প্র্যাকটিসে গেছে। আপনি সাড়ে ১০টা নাগাদ আসুন’।
বড়োদরা শহরের মাণ্ডবি এলাকাটি তখনও তুলভনায় অনগ্রসর। সরু রাস্তা। ঘাড়ে ঘাড়ে বাড়ি, দোকান। মসজিদের কাছে মোড়ের মাথায় সকালে বেশ জমজমাট। আড়াই ঘণ্টা সময় কাটাতে হবে বুঝে নিয়ে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম।
দেশে তখন লোকসভা ভোট চলছে। সেই সুবাদে গুজরাতে ভোট কভার করতে যাওয়া। আমদাবাদে যে দুদিন ছিলাম, তার মধ্যে এক ফাঁকে উঠতি ক্রিকেটার পার্থিব প্যাটেলের ফ্ল্যাটে গেছিলাম। পার্থিব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন খেলতে। তাঁর বাবা, মাও গিয়েছিলেন ছেলের খেলা দেখতে। ফ্ল্যাটে ছিলেন একা ঠাকুমা।
বহু টানাপোড়েনের পর বাজপেয়ী জমানার একদম শেষ লগ্নে পাকিস্তানে ওয়ানডে ও টেস্ট সিরিজ খেলতে গেছিল ভারতীয় ক্রিকেট দল। ২০০৪ সালের মার্চ-এপ্রিলে হয়েছিল সেই সিরিজ। ভারতীয় একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন গুজরাতের দুই তরুণ ক্রিকেটার। পার্থিব প্যাটেল ও ইরফান পাঠান। সেই সিরিজ নিয়ে উত্তেজনা ছিল। তাই ভোটের খবরের সঙ্গে পার্থিব-ইরফানকে নিয়ে কিছু একটা লেখার আগ্রহ মাথায় ঘুরছিল।
বড়োদরার মাণ্ডবি এলাকার ওই ছোট মসজিদের মোতোয়াল্লি-মোয়াজ্জেম ছিলেন ইউসুফ পাঠান ও ইরফান পাঠানের বাবা মেহমুদ খান পাঠান। তাঁর কাজ ছিল মসজিদের দেখভাল করা। সকালে আজান দেওয়া ইত্যাদি।
চায়ের দোকানে লম্বা সময় কাটল এর তার সঙ্গে গল্প করে। কখনও ভোটের কথা। কখনও পাঠান পরিবারে কথা। পাড়ার মোটামুটি ভাবে সকলেরই মত ছিল, ছোট ভাই ইরফানের চেয়ে বড় ভাই ইউসুফ পাঠান চৌখস ক্রিকেটার। সফল অলরাউন্ডার। কিন্তু ইরফানের ভাগ্য সদয়।
ইউসুফ পাঠান তখনও ভারতীয় দলে সুযোগ পাননি। সাড়ে ১০টা নাগাদ যখন ফের মসজিদের দরজা ঠেলে ঢুকলাম, দেখি ভিতরটা সকালের মতই খালি। উঠোন পেরিয়ে মসজিদের দালান। দেখি এক যুবক ঝাঁটা-বালতি হাতে দালান ধুচ্ছে। পরণে ঢোলা পাজামা। সেটি হাঁটু পর্যন্ত গোটানো। গায়ে হাফ স্লিভ শ্যান্ডো গেঞ্জি।
ইনিই ভারতীয় ক্রিকেট দলের সেই সময়কার নবাগত ফাস্ট-মিডিয়াম স্যুইং আর সিম বোলার ইরফানের দাদা ইউসুফ পাঠান। বললেন, ‘মসজিদ ধুতে আরেকটু সময় লাগবে। আপনি অপেক্ষা করুন’।
ছোট বেলা থেকে দুই ভাইয়ের ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ, স্কুল পালিয়ে খেলতে যাওয়া। বডোদরা ক্রিকেট আন্ডার ফোরটিন টিমে ইরফানের সুযোগ পাওয়া, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইউসুফের ব্রেক-প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে কথাবার্তায় সেসবই উঠে এসেছিল। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে আড়ষ্ট ছিলেন ইউসুফ পাঠান। শেষে লোকসভা ভোটের প্রসঙ্গ তুলতে হেসে বলেছিলেন, ওসবে আমার আগ্রহ নেই। ভোট দিতে যাব, এটুকুই।
তখন অফিসের দেওয়া একটা নোকিয়া ৫৫১০ ফোন ছিল সঙ্গে। কোনও ক্যামেরা ছিল না। এখনও আফশোস হয়, সেদিন ঝাঁটা হাতে মসজিদ ধোয়ানোর ছবি যদি তুলে রাখা যেত! মসজিদের কোণে একফালি ঘর থেকে দুটি ছেলের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প রূপকথার মতো। তাঁদের অধ্যাবসয়ও অনুপ্রেরণা দেওয়ার মতো।
সেই লোকসভা আর এই লোকসভার মধ্যে কুড়ি বছর পেরিয়ে গেল। বর্তমান পত্রিকায় ইউসুফ পাঠানের সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। রবিবাসরীয় ব্রিগেডের ইরফান পাঠানকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিনের ঘটনা। সেদিন যে যুবকের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ ছিল না, সেই তিনি বহরমপুর লোকসভা আসনে বাংলার শাসক দলের প্রার্থী হচ্ছেন। শুধু প্রার্থী হচ্ছেন না, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছেন, রাজনীতিটা সিরিয়াসলিই করতে চাই। ভাবা যায়