
শেষ আপডেট: 30 September 2022 15:48
কংগ্রেস সভাপতি (congress president) পদে শেষ পর্যন্ত লড়াই হচ্ছে মল্লিকার্জুন খাড়্গে (Mallikarjun Kharge) এবং শশী তারুরের (Sashi Tharoor) মধ্যে। তবে খাড়্গের জয় নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, তিনি শুধু সনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi), রাহুল গান্ধীদের পছন্দের প্রার্থী নন, বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী বলে পরিচিত জি-২৩-এর বহু নেতা মল্লিকার্জুনের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হিসাবে সই করেছেন। ফলে ১৩৭ বছর বয়সি দলটির ৯৮ তম সভাপতি হতে চলেছেন কর্নাটকের প্রবীণ নেতা কংগ্রেসের রাজ্যসভার নেতা খাড়্গেই। পরিস্থিতির চাপে শশী তারুর শেষ পর্যন্ত লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন, এমন সম্ভাবনাও এখন উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
কিন্তু সনিয়ার উত্তরসূরি কংগ্রেসের মতো একটা দলকে কতটা সময় দিতে পারবেন, পার্টির মধ্যে এ নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিজেপির মোকাবিলায় দলকে টেনে তোলা, চাঙা করা, কর্মীদের মনোবল ফেরানো যেখানে আশু প্রয়োজন, তখন খাড়্গের মতো প্রবীণ, অসুস্থ নেতাকে দিয়ে সেই লক্ষ্যপূরণ কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
কংগ্রেসের একাংশ বলছে, দল নতুন সভাপতি পেতে চলেছে, গান্ধী পরিবারের বাইরের কেউ সভাপতি হবেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁকে বেছে নেওয়া হবে—এই সবই বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেসের বড় অস্ত্র হতে চলেছে সন্দেহ নেই।

বিজেপি বারে বারেই বলে থাকে, সনিয়া ও রাহুল গান্ধীর সভাপতিত্ব মিলিয়ে ২৪ বছর কংগ্রেস গান্ধী পরিবারের হাতে বন্দি। এই সময়কালের মধ্যে বিজেপির নয় জন সভাপতি হয়েছেন। কংগ্রেসের পাল্টা জবাব, সনিয়া একবার অন্তত নির্বাচনে জিতে সভাপতি হয়েছেন। কংগ্রেসে দলীয় সভাপতি নির্বাচনের একটি ঐতিহ্য আছে। কিন্তু বিজেপির জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত একজন সভাপতিও নির্বাচিত নন। সকলেই কিছু প্রভাবশালী নেতার কৃপায় সভাপতি হয়েছেন।
কিন্তু কংগ্রেসের অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছে, জেপি নাড্ডা কিংবা অমিত শাহের মতো বিজেপির বর্তমান ও প্রাক্তন সভাপতিদের মতো খাড়্গে কি দিনে ১৭-১৮ ঘণ্টা দলকে সময় দিতে পারবেন দলকে? ছুটতে পারবেন দেশের নানাপ্রান্তে। এখন কংগ্রেসের যা অবস্থা তাতে কংগ্রেস সভাপতির ‘ভারত দর্শন যাত্রা’ জাতীয় কর্মসূচি সবচেয়ে জরুরি।

তাছাড়া সব দলের কাছেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন। আর শিয়রেই গুজরাত এবং হিমাচলপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। এবছর ডিসেম্বরে এই দুই রাজ্যের বিধানসভা ভোট ছাড়াও জম্মু-কাশ্মীরেও নির্বাচন হতে পারে। কংগ্রেসের নতুন সভাপতি নির্বাচনী লড়াইয়ে সনিয়া, রাহুলের ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা আটকাতে পারবেন কিনা সে প্রশ্ন খুব জরুরি হয়ে উঠেছে দলের মধ্যে।
অনেকেই মনে করছেন, এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট করা উচিত ছিল, যিনি অন্তত ক্রাউডপুলার হবেন। খাড়্গে এর ধারেকাছে নেই। বিশেষ করে ভারতে এখন যখন যুবসমাজ ভোটে অংশ নিচ্ছে, ভোটার তালিকায় নাম তুলছে, বুথে ভিড় জমাচ্ছে তখন তাদের আশা আকাঙ্খা পূরণ করাটা অনেক বেশি জরুরি। খাড়্গের মতো একজন প্রবীণ দক্ষিণী নেতাকে দিয়ে সেই কাজ কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বেশ সংশয় রয়েছে। কংগ্রেসের পুনরুজ্জীবনে আরও কমবয়সি কোনও মুখ প্রয়োজন ছিল। এরাজ্যের এক প্রবীণ নেতার কথায়, যুব সমাজকে কংগ্রেসের সভা-সমিতিতে টেনে আনাটাই এখন প্রধান কাজ। সেটা এই প্রবীণ নেতার কাছ থেকে প্রত্যাশা করাটাও অন্যায় হবে। নরেন্দ্র মোদীর বয়স ৭২ হলেও ২৭ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সঙ্গে দলের রাজনৈতিক সেতুবন্ধনের কাজটা দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। বিজেপিতে এটা মোদীর অনেক বড় অবদান। তাঁর ভাষা এবং দৈহিক ভাষার মধ্যে তরুণ সমাজকে আকর্ষিত, উদ্দীপিত করার ক্ষমতা আছে।
খাড়্গের বয়স আশি। তবে বয়সের থেকেও এই প্রবীণ নেতার প্রধান সমস্যা শরীর। ভারী শরীর। তিনি হাঁটুর অপারেশন করিয়েছেন কিছু দিন হল। তারপরও সহায়ক ছাড়া বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না। সিঁড়ি ভাঙা বারণ। এছাড়া তাঁর হাই ব্লাড প্রেসার ও সুগার আছে। সেই দুটি সমস্যা ওষুধে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও মল্লিকার্জুনের হাঁটাচলাতেও চিকিৎসকদের নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। যদিও তিনি রাজ্যসভায় কংগ্রেসের নেতা হিসাবে দীর্ঘ বিতর্কে অংশ নেওয়া এবং দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করার নজির আছে।

তারপরও দলের অনেকেই মনে করছেন, শুধু সভাপতি বদলে তো দলের পায়ের নিচে মাটি ফিরবে না। কংগ্রেস সভাপতিকে দেশের নানা প্রান্তে ছুটতে হবে। সাধারণ কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে মিশতে হবে। মল্লিকার্জুনকে নিয়ে এক্ষেত্রেও সমস্যা আছে। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকলেও তাঁর জনসংযোগ একেবার শূন্য। খানিক সাংগঠনির অভিজ্ঞতা আছে।
কিন্তু উত্তর ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে অবহিত নন। গান্ধী পরিবারের তাঁকে বেছে নেওয়ার একমাত্র কারণ, আনুগত্য। তিনি এতটাই নির্ভরযোগ্য যে গান্ধী পরিবারের প্রথম পছন্দ অশোক গেহলট লড়াই থেকে সরে যাওয়ার পরও কোনওরকম ইগো নিয়ে চলেননি। কংগ্রেসের সাংগঠনিক সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল তাঁকে সনিয়া গান্ধীর বার্তা, আসলে নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া মাত্র রাজি হয়ে যান। কিন্তু তিনি দলকে কী দিতে পারবেন, সেই প্রশ্ন আলোচনা হতে শুরু করেছে সব স্তরেই।

একের পর এক নির্বাচনে ভরাডুবির পর কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের একাংশ সনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখে দল পরিচালনায় যে সব পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন তার অন্যতম ছিল দলে একজন সর্বক্ষণের সভাপতি জরুরি ছিল। জি-২৩ নামে খ্যাত সেই গোষ্ঠীর নেতাদের চিঠির জবাব দিতে ওয়ার্কিং কমিটির পরের বৈঠকেই অন্তবর্তীকালীন সভাপতি সনিয়া স্বভাব বিরুদ্ধভাবে গলা উঁচিয়ে বলেছিলেন, কে বলল কংগ্রেসে সর্বক্ষণের সভাপতি নেই? আমিই সর্বক্ষণের সভাপতি।
সেই সনিয়া গান্ধী সনিয়া গান্ধী এবার দলের সব গোষ্ঠীর অনুরোধ সত্ত্বেও কংগ্রেস সভাপতির পদে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর বয়স এখন ৭৫। প্রথমসারির রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে ৭৫ বছর তেমন একটা বয়স নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এখন ৭২ চলছে।
কিন্তু সনিয়া গুরুতর অসুস্থ। ফলে ২০১৯-এর জুলাই থেকে অন্তবর্তী সভাপতি হিসাবে তাঁর যাবতীয় কাজকর্ম দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বলতে গেলে দলের প্রয়োজনে নিজের বাসভবনের বাইরেও খুব কমই দেখা গিয়েছে। একমাসও পেরোয়নি বিদেশ থেকে চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন। মূলত অসুস্থতার কারণেই বাড়ি থেকে বের হন না খুব একটা।
তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নির্বিবাদী মানুষ মল্লিকার্জুন খাড়্গের যোগ্যতা নিয়ে দলে কোনও গোষ্ঠীর তেমন কোনও আপত্তি নেই। দলিত পরিবারের সন্তান খাড়্গে ১৯৭২ সালে প্রথম কর্নাটক বিধানসভার সদস্য হন। কেন্দ্র ও রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। অনেকবারই কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর নাম এসেছে। কিন্তু রাজ্য-রাজনীতির সমীকরণ মেলাতে পারেননি। তবে একনিষ্ঠ কংগ্রেসি ও গান্ধী পরিবারের প্রতি অনুগত। ফলে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, সনিয়া তাঁর ‘মনমোহন মডেল’ এবার দলে কার্যকর করলেন। মনমোহন সিংহকে ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসিয়ে রিমোর্টে সরকার চালাতেন তিনি ও রাহুল, এটা এখন আর বিরোধীদের অভিযোগ নয়। এবার দলও চলবে সেই কৌশলে। কংগ্রেস একজন পুতুল সভাপতিই পেতে চলেছে।
কেজরিকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে ডিনার খাওয়ানো অটোচালক বলছেন, ‘আমার মন জুড়ে শুধু মোদী’