
শেষ আপডেট: 24 February 2023 06:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাটির তলায় যেন দানব জাগ্রত হয়েছে। মৃত্যু আর ধ্বংসের এক ভয়ঙ্কর তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে কোনও আসুরিক শক্তি। এই শক্তির আভাস এসেছিল আগেই। মাটির কম্পন জানান দিয়েছিল, ধ্বংসের দূত হয়ে সে আসছে। তার নিঃশ্বাসে ছাড়খাড় হয়ে যাবে সব (Turkey Earthquake)। প্রাণের স্পন্দন মুছে যাবে এক এক করে। মৃত্য়ুপুরী হয়ে উঠবে আস্ত একটা দেশ। কিন্তু এই শক্তিকে থামানোর বা রুখে দেওয়ার কোনও পদ্ধতি এখনও জানা নেই বিজ্ঞানের। শুধু তার পদশব্দ থেকে সাবধানটুকু করতে পারে বিজ্ঞান। তাই হয়েছে তুরস্কের ক্ষেত্রে।
অত্যধিক ভূমিকম্পপ্রবণ এই দেশ ধ্বংসের রূপ দেখেছিল ১৯৩৯ সালেই। এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প (Turkey Earthquake) তছনছ করে দিয়েছিল সব। পায়ের তলা থেকে কেড়ে নিয়েছিল মাটি। ৮৪ বছর পরে ফের সে ফিরে আসবে তেমন পূর্বাভাস ছিলই। দিনকয়েক আগেই বিজ্ঞানীরা ভূস্তর পরীক্ষা করে সতর্ক করেছিলেন তার আসার সময় হয়েছে। কতটা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে সে আসবে জানা নেই, তবে ক্ষতি কিছু কম হবে না। তাই হয়েছে। নিরূপায় মানুষ প্রকৃতির হাতে নিজেদের সমর্পণ করে মৃত্যুর প্রহর গুনেছে। গত দু'দিনে পাঁচ পাঁচটা ভূমিকম্প আর শতাধিক আফটার শক (ভূমিকম্পের পরবর্তী কম্পন) মিলে গ্রাস করেছে দেশটাকে। মৃত্যু আট হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আহতের সংখ্যা গোনাই যায়নি। বোধকরি আর সংখ্যা গোনার মতো মানুষজনও নেই। হাজার হাজার পরিবার ধ্বংসস্তূপের নীচে পিষে নিঃশেষ হয়ে গেছে। শোকপালনের মতোও কেউ অবশিষ্ট নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমন ভূমিকম্প বার বার হচ্ছে তুরস্কে? কেন এত অশান্ত হয়ে পড়েছে ভূস্তর? কেন থরথর কেঁপে আর্তনাদ করে উঠছে বারে বারে, আছাড়ি পিছাড়ি দিয়ে উপড়ে ফেলছে মাটির উপরের সবকিছুকে? যেন মনে হচ্ছে বহু যুগ ধরে কোনও চাপা আক্রোশ এক ভয়ঙ্কর গর্জন হয়ে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। সেই রোষানলে ছারখার হয়ে যাচ্ছে সবকিছু।
পাগলা ঘোড়ার মতো দাপিয়ে বেড়ায় টেকটনিক প্লেট, যুদ্ধ হয় মাঝেমধ্যেই
পৃথিবীর কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি কাঠানো যা আকারে, আয়তনে বিশাল। যার পরিধি প্রায় ১০০০ কিলোমিটার এবং ২৫ কিলোমিটারের মতো পুরু। ওই এলাকার নাম হল ‘আলট্রা-লো ভেলোসিটি জ়োন’ (Ultra-Low Velocity Zone) । যে ভূকম্পন তরঙ্গ বা ভূ-তরঙ্গ (Seismic Wave)বয়ে চলেছে ওই এলাকার মধ্যে দিয়ে তার গতিবেগ খুবই কম। কীভাবে ওই ভূ-তরঙ্গ তৈরি হল সেটা এখনও রহস্য। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ওই এলাকার রাসায়নিক গঠন ও তাপমাত্রাও অনেকটাই আলাদা।

পৃথিবীর ভেতরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন স্তর। তাদের রাসায়নিক ও ভৌত গঠন, বৈশিষ্ট্য আলাদা। সবচেয়ে বাইরের স্তরটি রাসায়নিক গঠনগতভাবে ভিন্ন, নিরেট সিলিকেট ভূত্বক যার নীচে রয়েছে ম্যান্টল। একে বলে গুরুমণ্ডল। ভূত্বক এবং গুরুমণ্ডলের উপরের অংশকে একসঙ্গে বলে লিথোস্ফিয়ার। প্লেট টেকটোনিক্স (Plate Tectonics) ভূতাত্ত্বিক মতবাদ অনুসারে ভূত্বক প্রধানত সাতটি বড় ও কয়েকটি ক্ষুদ্র গতিশীল কঠিন শিলাখণ্ড নিয়ে তৈরি।
ভূপৃষ্ঠের নীচে পৃথিবীর শিলামণ্ডল কতগুলো অংশে বা খণ্ডে বিভক্ত। এগুলোকে প্লেট বলে। এই প্লেটগুলো গুরুমণ্ডলের আংশিক তরল অংশের ওপরে ভাসমান অবস্থায় আছে। ভূত্বকীয় প্লেটগুলোকে মূলত সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন—আফ্রিকান প্লেট, আন্টার্কটিক প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট, উত্তর আমেরিকান প্লেট, প্যাসিফিক প্লেট, দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট। এই প্লেটগুলো প্রতিবছর কয়েক সেন্টিমিটার কোনও এক দিকে সরে যায়। কখনও একে অন্যের দিকে তেড়ে আসে, কখনও আবার কয়েক মিলিমিটার উপরে উঠে বা নীচে নেমে যায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, উপগ্রহ চিত্রে পৃথিবীর যে রূপ এখন আমরা দেখতে পাই তার সঙ্গে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর মিল নেই। একটু একটু করে রূপ বদলাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই বদলের অন্যতম কারণ হচ্ছে এই টেকটনিক প্লেট ও তার নীচে পৃথিবীর গভীরে থাকা ম্যান্টল স্তরের চলাফেরা। গলিত ম্যান্টলের প্রবাহের ফলে তার উপরের টেকটনিক প্লেটগুলোর একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। কখনও মৃদু ধাক্কা আবার কখনও জোরদার ঠোকাঠুকি হয়ে প্লেটগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। কখনও বা একটি প্লেট অন্যটার ঘাড়ে উঠে যায়। এই ধাক্কাধাক্কির ফলেই ভূত্বকের পরিবর্তন হয়। আর তখনই ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাত হয়।
যেসব দেশর এই টেকটনিক প্লেটগুলো অশান্ত ও ছটফটে হয়ে ওঠে, সেইসব দেশেই বারে বারে ভূমিকম্প হয়।
তুরস্কের ভূমির নীচে ভয়ঙ্কর লড়াই হয়, আনাতোলিয়ান প্লেটগুলো শান্ত হয় না
ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থানই এমন যে দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে গেছে। সহজ করে ব্যাপারটা বলা যাক। দেশটির মূল অবস্থান আনাতোলিয়ান টেকটনিক প্লেটের (Anatolian Plate) উপর। দেশটি আরও দুটি মহাদেশীয় টেকটনিক প্লেটের উপরেও অবস্থান করছে। সেই প্লেট দুটি হল-- ইউরেশিয়ান ও আফ্রিকান টেকটনিক প্লেট। এছাড়া আরও একটি প্লেট এই অংশে এসে সংযুক্ত হয়েছে। সেটি হলো অ্যারাবিয়ান প্লেট। চার চারটি ছটফটে টেকটনিক প্লেটের উপরে অবস্থানে কারণেই তুরস্কের ভূমি অশান্ত। এইসব প্লেটের কোনও একটির সামান্য নড়াচড়া করলেই বা একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করলেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হবে। আর সেটাই হচ্ছে।

এই টেকটনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থল বা ফল্ট লাইনগুলোও বিপজ্জনক। তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে উত্তর আনাতোলিয়ান ও পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্ট লাইন। উত্তর আনাতোলিয়ান ফল্ট লাইনের ক্ষেত্রে আনাতোলিয়ান এবং ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেট মিশেছে। উত্তর আনাতোলিয়ান ফল্ট লাইনটি ইস্তাম্বুলের দক্ষিণ থেকে তুরস্কের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। তুরস্কের ইতিহাসে যত ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে তার অধিকাংশের পেছনেই এই ফল্টলাইনের বিচ্যুতিই দায়ী।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, ভূত্বকের বিশাল খণ্ডকে টেকটনিক ফল্ট বলা হয়। আর দুটি টেকটনিক প্লেটের মাঝে থাকা ফাটলকে ফল্ট লাইন বলা হয়। পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্টের অবস্থান আবার অ্যারাবিয়ান প্লেট ও আনাতোলিয়ান প্লেটের মাঝে। এই ফল্ট লাইন দিয়ে দুই প্লেটের সংঘর্ষ হলেই ভূমিকম্প হবে।
পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্টলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার, যা পূর্ব তুরস্ক থেকে ভূমধ্যসাগরের উচ্চভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত। পরে সেখান থেকে এটি দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়ে গ্রেট রিফট সিস্টেমের সঙ্গে মিশেছে, যা আবার আফ্রিকান টেকটনিক প্লেট থেকে অ্যারাবিয়ান প্লেটকে আলাদা করে। পশ্চিম তুরস্ক বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ার কারণ হল আরও একটি ছোট টেকটনিক প্লেট, যা ইজিয়ান সাগর প্লেট নামে পরিচিত। এইরকমই বেশ কয়েকটি ছোট ও বড় টেকটনিক প্লেটের ওপর অবস্থানের কারণে তুরস্ক অতীতে বেশ কয়েকবার ভয়াবহ ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়েছে।
১৯৯৯ সালে তুরস্কের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে ৭. ৪ মাত্রার এক ভূমিকম্পে ১৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগে ১৯৩৯ সালে দেশটির এরজিনকান প্রদেশে এক ভূমিকম্পে মৃত্যু হয় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের। ১৯৩৯ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত পাঁচটি তীব্র ভূমিকম্প হয় তুরস্কে যার কারণই ছিল এই আনাতোলিয়ান প্লেট ও তাদের ফল্ট লাইনগুলোর বিচ্যুতি। এ বছরের ভূমিকম্পের কারণও তাই। অদূর ভবিষ্যতেও তুরস্ক আরও ভয়াবহ ভূমিকম্পের মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।