
শেষ আপডেট: 27 January 2024 17:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গভীর রাতে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ কানে গেলেই ভয়ে সারা শরীর হিম হয়ে আসে বাসিন্দাদের। এইবুঝি সর্বগ্রাসী নদী এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সবকিছু। সকালে দোর খুলেই বাসিন্দারা আগে মেপে নেন জয় কতটা দূর এগোল। যার বাড়ির চৌকাঠ ছোঁবে জল, তারই শিয়রে সর্বনাশ। হয়ত আর একটা ভোর হওয়ার আগেই আস্ত বাড়িটা গিলে খেয়ে নেবে নদী। জল যতই এগোয়, ততই পিছোয় মানুষজন। জল আর বসতির অনুপাতটা এখানে স্থির নয়। নিয়তির হাতে সবটাই সঁপে দিয়ে বসে আছেন গৃহস্থেরা। আর এভাবেই জলের পাল্লা ভারী হচ্ছে দিন দিন। ছোট হয়ে আসছে বসতির বৃত্তটা।
মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘোড়ামারা দ্বীপকে ঘিরে রয়েছে নদী ও সমুদ্র। এক দিকে বটতলা, মুড়িগঙ্গা ও হুগলি নদী। অন্য দিকে বঙ্গোপসাগর। সাগরদ্বীপে যাওয়ার সময়ে ডান হাতে পড়ে ঘোড়ামারা দ্বীপ। এক সময়ে সাগরদ্বীপেরই অংশ ছিল। সাগর ও ঘোড়ামারা দ্বীপের মাঝে ছিল ছোট্ট একটা খাল। সেই খাল এখন বেড়ে প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার চওড়া নদী হয়ে গিয়েছে। আর ক্রমেই ক্ষয়ে নদীরগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে সে দ্বীপ। ঘোড়মারা ভাঙছে, ডুবছে, ক্ষয় হচ্ছে রোজ একটু একটু করে। ভরা কোটালের সময় বাঁধ ভেঙে সর্বগ্রাসী নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায় কত সংসারকে। সে হিসেব রাখেনি ঘোড়ামারা।
ধান আর পান—এই দুইয়ের জন্যই বিখ্যাত ঘোড়ামারা। উর্বর ধান চাষের জমি আর বরোজ ভরা পানই বাসিন্দাদের গর্ব। তাই ভিটেমাটি হারালেও দ্বীপ ছাড়তে রাজি নন অনেকেই। ঘোড়ামারার বাসিন্দা অরবিন্দ করক। বলছেন, আগে সাগরদ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন। তারপর ঘোড়ামারায় সংসার পাতেন। হাজার পাঁচেক মানুষের বাস এখানে। তবে দিন দিন ঘরগুলো খালি হচ্ছে। ভিটেমাটি ছেড়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরে চলে যাচ্ছেন অনেকেই। ১৯৬০ সালে এখানে হাজার পঁচিশেক মানুষের বসতি ছিল। এখন সংখ্যাটা পাঁচ হাজারে ঠেকেছে। অরবিন্দের কথায়, “বুড়োরা ভিটে আগলে থাকলেও নবীনরা কেউ থাকতে চায় না ঘোড়ামারায়। আর থাকবেই বা কেন, এখানে কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না। কবে কার ঘর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নদী তা তো বলা যায় না। ঘোড়ামারার ছেলেদের কেউ জামাই করতে চায় না। এখানকার মেয়েদেরও বিয়ে হয় অন্য গ্রামে।”
কাকদ্বীপ থেকে লঞ্চে করে ঘোড়ামারায় আসা যায়। প্রবীণ বাসিন্দারা জানালেন, ঘোড়ামারা ভাঙছে দ্রুত। এখন আদখাওয়া পাঁউরুটির মতো আকৃতি হয়েছে দ্বীপের। কোনদিন সবশুদ্ধ ডুবে যাবে। ঘোড়ামারার দক্ষিণে ছিল লোহাচরা। নদী গিলে খেয়েছে। একটু একটু করে পুরো দ্বীপটা জলের তলায় চলে গিয়েছে। এখন কাকদ্বীপের ৮ নম্বর লটের ৪ নম্বর ঘাট থেকে লঞ্চে করে সাগরদ্বীপ যাওয়া-আসার পথ। সাফ হয়ে গিয়েছে দ্বীপের নব্বই ভাগ। অরবিন্দ বলছেন, জলের শব্দে যে কোনও দিন ভয় লাগতে পারে, তা ভাবেননি। জলবায়ু পরিবর্তনে ভূখণ্ডের মানচিত্র থেকে অনেক দ্বীপ মুছে যাচ্ছে। আর সেখানকার বাসিন্দারা সব কিছু হারিয়ে হয়ে যাচ্ছেন উদ্বাস্তু। ঘোড়ামারাও কবে মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যা তা কে বলতে পারে!
ঘোড়ামারার দক্ষিণে আরও দু’টি দ্বীপ ছিল একসময়। লোহাচরা আর সুপারিভাঙাচরা। সমুদ্র এগিয়ে এসে ক্রমে গিলে খেয়েছে সেই দ্বীপদু’টিকে। দ্বীপের বাসিন্দারা কেউ ঘোড়ামারায় উঠে এসেছেন, কেউ চলে গিয়েছেন অন্যত্র। বৃষ্টি হলে নদীর জল বাড়ে। তখন ভিটেমাটি ছেড়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে হয়। এখানকার বাসিন্দারা বলেন, ঢেউয়ের তোড়ে কেউ বাবলা গাছে, কেউ খেজুর গাছে আশ্রয় নিয়ে কাটিয়েছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্কুল, ডাকঘর, সরকারি অফিস সবই জলের তলায় চলে গেছে। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে বাঁধ ভাঙতে ভাঙতে খুব শীঘ্র ঘোড়ামারাও তলিয়ে যাবে সমুদ্রের গ্রাসে। বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় গত কয়েকবছর ধরেই কমছে দ্বীপের জনসংখ্যা। অনেকেই উদ্বাস্তু। অরবিন্দের মতো স্থানীয় কয়েকজন যুবক বলছেন, "কথা বলে জলই জীবন। কিন্তু ঘোড়ামারায় জলই জীবন বিপন্ন করে দিচ্ছে। ছারখার করে দিচ্ছে সবকিছু।"