ভবানীপুরের ফলাফল শেষমেশ যাই হোক, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে এই আসনে লড়াইটাই হতে চলেছে মহাকাব্যিক।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস।
শেষ আপডেট: 16 March 2026 21:11
বিজেপি যে শুভেন্দু অধিকারীকে (Suvendu Adhikari) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বিরুদ্ধে ভবানীপুরে (Bhawanipur) প্রার্থী করতে চলেছে তা গত বৃহস্পতিবার সবার আগে দ্য ওয়ালে লেখা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনেই লেখা হয়েছিল বিজেপির এই কৌশলের কার্যকারণ কী? শুভেন্দু এ ব্যাপারে কী বুঝিয়েছেন অমিত শাহদের। এবং কেন শেষমেশ রাজি হয়েছেন অমিত শাহ-নরেন্দ্র মোদী। সোমবার ভবানীপুরের প্রার্থী হিসাবে (BJP Candidate list 2026 West Bengal) শুভেন্দুর নাম আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেছে বিজেপি। তার পর আরও একবার তলিয়ে দেখা জরুরি যে, কেন এই পদক্ষেপ করলেন মোদী-শাহরা। কেন এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক ভাবে অর্থবহ।
বাংলায় বিজেপি ও তৃণমূলের সম্পর্ক নিয়ে বহু মানুষ একটি মিথকে বিশ্বাস করেন। তা হল, বিজেপি-তৃণমূল সেটিং রয়েছে। এই মিথ একদিনে গড়ে ওঠেনি। এরও ইতিহাস রয়েছে। একদা বিজেপি-র সঙ্গে জোট করে লোকসভা ভোটে লড়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রে এনডিএ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে জোট ভেঙে গেলেও বিভিন্ন ও বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনাক্রমে এই সেটিং তত্ত্ব জগদ্দল পাথরের মতো বসে যায় বাংলা ও বাঙালির একাংশের মনে। এবং তাঁদের মনে বার বার প্রশ্ন উঠতে থাকে, মোদী-শাহরা কি আদৌ বাংলার ব্যাপারে সিরিয়াস। নাকি তলে তলে আঁতাত রয়েছে। এই তত্ত্ব নিয়ে রাজনৈতিক ভাবে বার বার বলেছেন বামেরাও।
এবার বিধানসভা ভোটের অনেক আগে থেকে শুভেন্দু অমিত শাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, এই তত্ত্ব ভাঙা জরুরি। এমন কিছু ট্যানজিবল হওয়া উচিত যাতে মনে হয়, বিজেপি এবার বাংলায় পরিবর্তন আনার জন্য সিরিয়াস। শুধু শুভেন্দু নয়, বিজেপির মধ্যে থেকে ছোট বড় মাঝারি বহু নেতার এই দাবি ছিল। তাঁরা মনে করছিলেন, ভোটের আগে সিবিআই-ই়ডির ধরপাকড় এমন হওয়া উচিত, তৃণমূলের কিছু মন্ত্রী সান্ত্রী গ্রেফতার হওয়া উচিত, তাতেই সেটিং তত্ত্ব ভেঙে যাবে। কিন্তু ঝাড়খণ্ডে হাত পোড়ানোর পর ধরপাকড়ের আর ঝুঁকি নিতে চায়নি কেন্দ্রীয় বিজেপি। লোকসভা ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে গ্রেফতার করেছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি। কিন্তু জেলে বসেই ঝাড়খণ্ডে স্যুইপ করে সোরেনের পার্টি।
ঠিক এই পরিস্থিতিতেই ভবানীপুরে শুভেন্দুর প্রার্থী হওয়ার বাসনাকে ইতিবাচক মনে হয় অমিত শাহদের। দল চাইলে তিনি যে ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে পারেন, এই কথাটি শুভেন্দু গত প্রায় দু’বছর ধরে নাগাড়ে বলছেন। গত বুধবার দিল্লিতে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য বিজেপি নেতারা বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকে আলাদা করে ভবানীপুরের ব্যাপারে শুভেন্দুর সঙ্গে কথা বলেন অমিত শাহ। তাঁর কাছে জানতে ফাইনালি কী ভাবছেন শুভেন্দু? ঠিক এই কথাটা নিয়ে আবার শুভেন্দুর সঙ্গে কথা বলেন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন।
জানা গেছে, দুজনেই শুভেন্দু বলেন, ভবানীপুরে আমাকে প্রার্থী করলে দলের সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা ঘটবে তা হল, সাধারণ মানুষের কাছে এই মেসেজ চলে যাবে বিজেপি এবার সিরিয়াস। কেউ আর সেটিংয়ের তত্ত্ব আওড়াবে না। আমি মাটি কামড়ে লড়ে যাব। এটাই ভোটে বড় ফারাক গড়ে দেবে।
শুভেন্দুর এই আগ্রহে সম্মতি দেওয়ার ক্ষমতা বা অধিকার সেখানে উপস্থিত কারও ছিল না বলেই খবর। জানা গেছে, এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলেন অমিত শাহ। মোদীর সম্মতি আদায় করে নেন। তার পর শুভেন্দুকে তা জানিয়েও দেন অমিত শাহ। গত শুক্রবারই শুভেন্দু জেনে গেছিলেন দল তাঁকে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও প্রার্থী করবে।
ভবানীপুরে শুভেন্দুর প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আরও একটা কারণে আগ্রহ ছিল বলে অনেকে মনে করেন। বাংলার ভোটে কোনও একজন নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী প্রোজেক্ট করে ভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি। কিন্তু দলের নেতারাও বুঝতে পারছেন, ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে বর্তমান বিরোধী দলনেতা ডিফল্ট প্রোজেক্টেড হয়ে গেলেন। আরও একটি ঘটনা এখানে নজর করার মতোই। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে দুটি পৃথক দফায় ভোট হবে। নন্দীগ্রামে প্রথম দফায় ভোট হবে ২৩ এপ্রিল। ভবানীপুরে ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। অর্থাৎ নন্দীগ্রামে ভোট মেটার পর ভবানীপুরে আলাদা করে সময় দিতে পারবেন শুভেন্দু।
ভবানীপুরের এই অঙ্ক অনেক আগে থেকেই কষা শুরু করেছিলেন বিরোধী দলনেতা। সম্ভবত সেই কারণে ভবানীপুরে ভোটার তালিকার সংশোধনের উপর নজর রেখেছিলেন তিনি। দোলের দিনও দেখা যায়, ভাবনীপুরে গিয়ে দোল উৎসবে অংশ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী।পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, ভবানীপুরের ফলাফল শেষমেশ যাই হোক, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে এই আসনে লড়াইটাই হতে চলেছে মহাকাব্যিক।