দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশে করোনা সংক্রমণ সাড়ে তিন লাখের গণ্ডি পেরিয়েছে। মোট সংক্রামিতের প্রায় ৩৮ শতাংশই দেশের তিন মেট্রো শহর মুম্বই, চেন্নাই ও দিল্লিতে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, দেশের অন্যতম বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব বেঙ্গালুরুতে করোনা সংক্রমণ এখনও লাগামছাড়া হয়নি। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের হিসেবে গতকাল, বুধবার অবধি বেঙ্গালুরুতে কোভিড পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ৮২৭। এখনও অবধি দেশের বড় মেট্রো শহরগুলির তুলনায় যা অনেকটাই কম।
মহারাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণ এক লাখের বেশি, যার মধ্যে মুম্বইতেই আক্রান্ত ৬০ হাজারের বেশি। দিল্লিতে সংক্রামিত ৪৭ হাজারের কাছাকাছি, চেন্নাইতে ৩৪ হাজার ২৪৫। সেখানে আশা জাগিয়েছে বেঙ্গালুরুর করোনা রিপোর্ট। এখনও অবধি সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের।
ব্রুহাট বেঙ্গালুরু মহানগর পালিকে (বিবিএমপি)-র পরিসংখ্যাণ বলছে, ৮ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে যখন করোনা সংক্রমণ ক্রমেই রেকর্ড জায়গায় পৌঁছচ্ছিল, বেঙ্গালুরুতে তখন সংক্রামিতের সংখ্য ছিল ৩৫৮। মৃত্যু হয়েছিল ১০ জনের। মার্চের শেষ থেকে আজ অবধি করোনা পজিটিভ রোগীর সংখ্যা হাজার পার হয়নি। কানপুর, অমৃতসর, লখনৌ, নাগপুর, জলন্ধর, আজমেঢ়, মেরঠ, উদয়পুর ও শাহারানপুরের থেকেও বেঙ্গালুরুতে কোভিড রোগীর সংখ্যা অনেক কম। কীভাবে করোনা সংক্রমণকে একটা গণ্ডিতেই বেঁধে ফেলা গেল এই প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর এপিডেমোলজি রিসার্চ গ্রুপের বিশেষজ্ঞ ডক্টর গিরিধর আর বাবু বলেছেন, কনট্যাক্ট ট্রেসিং মডেলেই সংক্রমণ অনেকটাই আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়েছে।
[caption id="attachment_230865" align="aligncenter" width="600"]
কিরণ মজুমদার শ[/caption]
বেঙ্গালুরুর কনট্যাক্ট ট্রেসিং মডেল
করোনার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল রোগীদের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন তাঁদের চিহ্নিত করা। কোভিড পজিটিভ রোগীদের কাছাকাছি বা সংস্পর্শে আসাদের শনাক্ত করা গেলেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমবে। করোনা মোকাবিলায় এই কনট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের উপরেই জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। গোষ্ঠীস্তরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া আটকাতে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেঙ্গালুরুতে শুরু থেকে এই কাজটাই সঠিকভাবে করা হয়েছে। বায়োকনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কিরণ মজুমদার শ বলেছেন, বেঙ্গালুরুতে এই কনট্যাক্ট ট্রেসিং রেশিও ১:৪৭, অর্থাৎ প্রত্যেক করোনা পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে আসা ৪৭ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়ছে। মুম্বইতে এই রেশিও ১:৩। কনট্যাক্ট ট্রেসিংয়ে করোনা সন্দেহে থাকা লোকজনের কোভিড টেস্ট করিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিবিএমপি কমিশনার অনীল কুমার বলছেন, তিন পদ্ধতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া আটকানো গেছে।
এক, কোভিড রোগী চিহ্নিত করা (Trace), দুই, দ্রুত টেস্টিং (Test) এবং তিন, চিকিৎসা (Treatment)। বেঙ্গালুরুতে আইটি হাবের সংখ্যা বেশি থাকায় দেশের নানা রাজ্য থেকে কর্মসূত্রে মানুষজনের আনাগোনা লেগেই থাকে। এই শহরে কলেজ, ইউনিভার্সিটির সংখ্যাও অনেক। কাজেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ও বেশি ছিল। কমিশনার বলেছেন, শুরু থেকেই তাই শক্ত হাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শহরের নানা প্রান্তে র্যাপিড টেস্টিং শুরু হয়। কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়লেই আইসোলেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় রোগীদের। আরও একটা ব্যাপারে খেয়াল রাখা হয় সেটা হল, কর্নাটক সরকারের উদ্যোগে প্যারামেডিক্যাল স্টাফদের নিয়ে একটা টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হয়। এই টিমের কাজ ছিল, কোন এলাকায় কত মানুষ সাম্প্রতিক সময় প্যারাসিটামল, কাশির ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক কিনেছেন সেটা খেয়াল রাখা। প্রয়োজন হলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্ক্রিনিং করা হয়, সংক্রমণের সামান্য সন্দেহ হলেই সঙ্গে সঙ্গেই কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কোভিড পজিটিভিটি রেট কম বেঙ্গালুরুতে, অ্যান্টি-কনট্যাক্ট ট্রেসিং মডেল চালু করেছে বিবিএমপি
কর্নাটক কোভিড ওয়ার-রুমের ইনচার্ড মুনিশ মুদগিল বলেছেন, আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইন, এই দুই অস্ত্রেই কাবু করা গেছে করোনা সংক্রমণকে। কনট্যাক্ট ট্রেসিং মডেলে শনাক্ত করা সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের আলাদা করার পরেই কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। সংক্রমণ ধরা পড়লে আইসোলেশনে। তাছাড়া বিবিএমপি এখন অ্যান্টি-কনট্যাক্ট ট্রেসিং মডেল চালু করেছে। নতুন করে করোনা সংক্রমণ ছড়াতে পারে এমন এলাকা বা করোনা-ক্লাস্টার জ়োন চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি চালানো হচ্ছে। ওই এলাকার প্রতিজনের থেকে নমুনা সংগ্রহ করে টেস্ট করা হচ্ছে। প্রতি এলাকায় কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পও তৈরি হয়েছে।
বেঙ্গালুরুতে এখন মোট ১৯১টি অ্যাকটিভ কনটেইনমেন্ট এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। কোভিড টেস্ট হয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার। এর মধ্যে অ্যাকটিভ করোনা রোগীর সংখ্যা অর্থাৎ কোভিড পজিটিভিটি রেট মাত্র ১.২%। জরুরি অবস্থায় করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য কর্নাটকের প্রায় ২৫ হাজার ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দিনে গড়ে আট হাজারের বেশি কোভিড টেস্টিং করা হচ্ছে।