দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাত বছর পেরিয়ে গেল। আজও খোঁজ মেলেনি কলকাতা জাদুঘরের প্রিজারভেশন অফিসার ড. সুনীল উপাধ্যায়ের। পরিবারের তরফে হেবিয়াস করপাস মামলা অর্থাৎ নিখোঁজ ব্যক্তিকে সশরীরে আদালতে হাজির করার আর্জি মেনে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারের রিপোর্ট তলব করেছিল বছর কয়েক আগে। কিন্তু কলকাতা পুলিশ, সিআইডি, কোনও এজেন্সিই আজও ওই অফিসারকে খুঁজে পায়নি। ঘনিষ্ঠজনেরা চান, ওই অফিসারের অন্তর্ধান রহস্যের অবসান হোক। চলতি সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টে কলকাতা মিউজিয়ামে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সিবিআই তদন্ত চেয়ে যে মামলা হয়েছে তাতে সুনীল উপাধ্যায় অন্তর্ধানের ঘটনাকেও যুক্ত করার দাবি উঠেছে।
কেন এই দাবি?
নিখোঁজ অফিসারের সহকর্মী এবং ঘনিষ্ঠজনেদের বক্তব্য, কলকাতার জাতীয় জাদুঘরে বদলি হয়ে আসার পর সুনীল বেশ কিছু অনিয়ম চিহ্নিত করেন। তিনি সরকারি পদ্ধতি মেনে সেগুলির অবসান চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা শুরু করেন। ক্রমে জাদুঘরের এই তরুণ প্রিজারভেশন অফিসার একজন হুইসেলব্লোয়ার হয়ে ওঠেন। একের পর এক অনিয়ম ফাঁস করতে শুরু করেন তিনি। রীতিমতো শোরগোল ফেলে দেন প্রতিষ্ঠানে। তার মধ্যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও ছিল।

আবার মিউজিয়ামে প্রত্নসামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়ম, নিম্নমানের রাসায়নিকের ব্যবহার, সংরক্ষণের কাজে অনভিজ্ঞদের নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে অসবরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারকে চুক্তিতে নিয়োগের মতো গুচ্ছ বিষয়ে আপত্তি তুলে সহকর্মী এবং ঊর্ধ্বতন অফিসারদের একাংশের যেমন সমর্থন পেয়েছেন, তেমনই চক্ষুশূল হয়েছেন অনেকের।
২০০৪ সালে কলকাতা মিউজিয়াম থেকে রহস্যজনকভাবে চুরি যায় দুর্লভ এক বুদ্ধমূর্তি। সিবিআই বুদ্ধমূর্তিটি উদ্ধার করা দূরে থাক, কারা চুরি করে, কীভাবে করে এই রহস্যও উদঘাটন করতে পারেনি। বিশ্বভারতী থেকে কবিগুরুর নোবেল পদক উধাও হওয়ার ঘটনার মতো বুদ্ধমূর্তি চুরির ঘটনাতেও তারা তদন্ত শেষ পর্যন্ত গুটিয়ে নেয়।
জানা যায়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইপডি ড. সুনীল উপাধ্যায় কলকাতায় বদলি হয়ে এসে বুদ্ধমূর্তি চুরির ঘটনা নিয়েও খোঁজ-খবর শুরু করেন। সরব হন মিউজিয়ামের ঢিলেঢালা সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও। এমনকি প্রয়োজন ছাড়াই মিউজিয়াম ভবন সংস্কারের নামে বিপুল অর্থ খরচ নিয়েও আপত্তি জানান কর্তৃপক্ষের কাছে। যে অভিযোগের সত্যতা পরবর্তীকালে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের অডিট রিপোর্টেও প্রতিফলিত হয়। সেই সিএজি রিপোর্টে উল্লেখিত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়েই সিবিআই তদন্তের দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। সুনীলের সহকর্মী এবং ঘনিষ্ঠরা চান, আদালত সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিলে সুনীলের অন্তর্ধানকেও তার অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

ঘটনার সময় সুনীলের পদস্থ সহকর্মী ছিলেন সঞ্জীব সিং। বর্তমানে তিনি দিল্লির জাতীয় জাতীয় জাদুঘরে কর্মরত। এদিন টেলিফোনে তিনি বলেন, সুনীল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহসী অফিসার। আপস শব্দটি তাঁর অভিধানে ছিল না। ঘনিষ্ঠদের অনেকেই মনে করেন, ওই অফিসারের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রের সম্পর্ক আছে। সুনীলের অন্য সহকর্মীরা সরকারি চাকরির শর্ত রাখার দায়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। তাঁরা চাইছেন, সংশ্লিষ্ট মামলায় বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত করুক আদালত।
কীভাবে নিখোঁজ হন সুনীল?
কলকাতায় বদলি হয়ে এসে কিছুদিন মিউজিয়ামের অতিথিশালায় থাকার পর ওই অফিসার সুইস পার্কে তাঁর দাদা সরোজের সঙ্গে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। ২০১৪-র ৩ জুলাই তিনি অফিস যাননি। তাঁর দাদা তদন্তকারীদের জানান, বুকে ব্যথার কথা বলায় তিনি ভাইকে বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করিয়ে নিতে বলেন। সেই মতো সরোজ জাদুঘরের অফিসে গিয়ে ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্র তৈরি করে নিয়ে আসেন। সেদিনই সন্ধ্যায়, একটু আসছি বলে সুনীল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর তাঁর খোঁজ মেলেনি। মোবাইলটিও তিনি সঙ্গে নেননি।
তদন্তের পরিণতি
সুনীল অন্তর্ধান রহস্য উদঘাটনে প্রথমে স্থানীয় লেক থানা তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তভার যায় সিআইডির হাতে। সিআইডির তৎকালীন স্পেশ্যাল আইজি দময়ন্তী সেনের নেতৃত্বে তদন্ত চলে। কিন্তু সুনীল অন্তর্ধান রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি সিআইডির গোয়েন্দারা। সিআইডি তদন্ত চলাকালে সুনীলের পরিবার সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানায়। সেই আর্জি তখন গৃহীত হয়নি। তারপর থেকে নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে শোরগোলও থেমে যায়। সিবিআই তদন্তের দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারও আর এগোয়নি।