২০২৫ সালের গোড়ার দিকে পুরুলিয়া জেলার পাহাড়ি জঙ্গলে বসানো একটি মোশন-সেন্সর ক্যামেরায় ধরা পড়ে ঝাপসা এক ছায়া—ঝোপঝাড় পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটি বাঘ।

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার
শেষ আপডেট: 2 January 2026 10:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (Sundarban Tigers) শুধু একটি রাজকীয় প্রাণী নয়—ওই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু সর্বশেষ যে ছবিটা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠেছে, সুন্দরবনে কি বাঘেদের জন্য যথেষ্ট জায়গা রয়েছে? ২০২৫ সালে গোটা দেশে বাঘ-মৃত্যুর উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় প্রথম বাঘের উপস্থিতি সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
পুরুলিয়ার পাহাড়ে বাঘ: এক অস্বাভাবিক ছবি (Purulia Tiger)
২০২৫ সালের গোড়ার দিকে পুরুলিয়া জেলার পাহাড়ি জঙ্গলে বসানো একটি মোশন-সেন্সর ক্যামেরায় ধরা পড়ে ঝাপসা এক ছায়া—ঝোপঝাড় পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটি বাঘ। আলাদা করে দেখলে ছবিটি হয়তো বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও বন আধিকারিকদের কাছে তা ছিল অভূতপূর্ব।

কারণ, পুরুলিয়ায় আগে কখনও বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি—না ক্যামেরা ট্র্যাপে, না পাওয়া গেছিল কোনও পায়ের ছাপ। স্থানীয়দেরও এরকম কোনও স্মৃতি নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই ছবিই ছিল এক সংকেত। তা এটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ভারতের বাঘের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে।
ছত্তিসগড়–ঝাড়খণ্ড পেরিয়ে বাংলায়
গবেষকরা ক্যামেরা ট্র্যাপের তথ্য জুড়ে ওই বাঘের গতিপথ চিহ্নিত করেছিলেন—২০২৪ সালের মার্চ মাসে সে ছিল ছত্তিশগড়ের বালরামপুর বনাঞ্চলে। তার পর গরম পড়তেই তাকে দেখা যায় ঝাড়খণ্ডের পালামৌ টাইগার রিজার্ভে। এর পর গত বছর জানুয়ারি মাসে পুরুলিয়ায় দেখা মেলে তার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘ যাত্রা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা হল একটা ট্রেন্ড তথা জাতীয় স্তরের প্রবণতা। শুধু বাংলায় নয়, সব রাজ্যেই দেখা যাচ্ছে, কোর এরিয়ার বাইরে চলে আসছে বহু বাঘ।

ভারতের বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বন কি বেড়েছে? ( India Tiger population)
একসময়ে বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের বাঘের সংখ্যা এখন বেশ বেড়েছে। ২০০৬ সালে দেশে বাঘ ছিল মাত্র ১,৪১১টি। ২০২২ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩,৬৮২। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ বন্য বাঘই এখন ভারতে রয়েছে।
কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন সংকট। রিজার্ভ ফরেস্টের বাইরে ঘুরছে ৩০ শতাংশ বাঘ। ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII)-এর বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, মোট বাঘের প্রায় ৩০ শতাংশ—অর্থাৎ ১,১০০-র বেশি বাঘ—এখন নোটিফায়েড টাইগার রিজার্ভের বাইরে ঘোরাঘুরি করছে।

WII-র ডিরেক্টর জি এস ভরদ্বাজ জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল থেকেই শুরু হয়েছে Tiger Outside Tiger Reserves (TOTR) প্রকল্প। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল—রিজার্ভের বাইরে থাকা বাঘ ও মানুষের সহাবস্থান। মানুষ ও বাঘের সংঘাত কমানো। বনাঞ্চলের বাইরেও সুরক্ষা জোরদার করা।
সুন্দরবন: সবচেয়ে স্পর্শকাতর ( Sundarban Tigers and West Bengal Total Tiger Count)
পশ্চিমবঙ্গে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় ১৩১। এর মধ্যে ৩০–৩৫টি বাঘ মূল কোর এলাকার বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপ ও প্রান্তবর্তী এলাকায় ঘোরাফেরা করছে তারা।
দ্বীপ ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, মানুষের বসতি—সব মিলিয়ে সুন্দরবনের বাঘের জন্য জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে— বাঘেদের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে। আরও বেশি করে বাঘ ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। মানুষের সঙ্গে সংঘাত হচ্ছে। অর্থাৎ সামগ্রিক ভাবেই ঝুঁকি বাড়ছে।
কোন রাজ্যে কত বাঘ, কতটা চাপ? (State wise Tiger Count)
সাম্প্রতিক হিসাব—
২০২৫ সালে বাঘ-মৃত্যু: বিপদের ঘণ্টা
ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র তথ্য অনুযায়ী— ২০২৫ সালে দেশে ১৬৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছর সংখ্যাটা ছিল ১২৬। অর্থাৎ এক বছরে মৃত্যু বেড়েছে ৪০টি। এর মধ্যে ৩১টি ছিল শাবক। সেটাই সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। শাবকের মৃত্যুর বড় কারণ হল, বাঘেদের মধ্যে সংঘাত। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া ও অনিচ্ছাকৃত ফাঁদে পড়া।

ভারত বাঘ বাঁচাতে পেরেছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু পুরুলিয়া থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বাঘের এই লম্বা যাত্রা বলছে, সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জায়গা, করিডর ও সহাবস্থানের ব্যবস্থা না হলে আগামী সংকট আরও গভীর হবে। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই লড়াই শুধু বাঘ বাঁচানোর নয়— এ লড়াই মানুষের ভবিষ্যৎ, বন ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষারও।