দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর সবথেকে দামী জিনিস বোধহয় স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতে সেই অর্থে কোনও পার্থিব মূল্য দিতে হয় না বটে, কিন্তু মূল্য দিতে হয় স্বপ্ন পূরণ করতে। আর বাস্তবের কঠিন মাটিতে এই স্বপ্নগুলো যখন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তখন অনেক সময়েই অনেক বড় মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে। তেমনটাই ঘটেছে ফিলাডেলফিয়ার তরুণী শায়েন গিলের সঙ্গে। করোনা আতঙ্কে যখন সারা দুনিয়া কাঁপছে, গোটা বিশ্বের মৃত্যুমিছিল যখন হাজার হাজার পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে, তখন শায়েনের স্বপ্নের মতো জীবনও ভেঙে দিয়েছে কোভিড ১৯ অসুখে নয়, অন্য ভাবে।
দীর্ঘদিন ধরে বহু চেষ্টা করেও মা হতে পারছিলেন না শায়েন। অথচ সারা জীবনে না-পাওয়া বলতে ছিল ওইটুকুই। নিজের শরীরে সন্তান ধারণ করার সাফল্য। শেষমেশ বহু চেষ্টা ও অর্থ খরচ করার পরে ফার্টিলিটি ক্লিনিকের সাহায্যে তিন বছর পরে সেই ইচ্ছে পূরণের সুযোগ এসেছিল শায়েনের। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে করোনার দাপটে লকডাউন সবকিছু। ভেঙে গেল স্বপ্ন। সবরকম প্যারামিটার ঠিক করে মাত্র একদিন বাকি ছিল তাঁর শরীরে স্পার্ম প্রতিস্থাপনের। হল না। এই দীর্ঘ প্রস্তুতি ও টাকা খরচ আবারও নতুন করে কখনও করা সম্ভব হবে কিনা, জানেন না শায়েন ও তাঁর পার্টনার ড্যামিয়েন।

শায়েন ও ড্যামিয়েনের গল্পটা খানিকটা রূপকথার গল্পের মতোই। ড্যামিয়েন যেন শায়েনের গল্পের সেই রাজকুমার। খুবই ছোট বয়স থেকেই তাদের প্রেম। স্কুল থেকে কলেজ পেরিয়ে, একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দু'চোখে। হাজার ঝড়ঝাপটা আসে জীবনে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন ড্যামিয়েন। আট বছর কাটান রিহ্যাবে। ছেড়ে যাননি শায়েন। নিজের আলোকচিত্রের কেরিয়ারেও চরম ধাক্কা খান শায়েন নিজে। ভেঙে পড়েন তুমুল ভাবে।
কিন্তু প্রেমের টান থেকে গেছে সবকিছুর পরেও। তাই সব বাধা কাটিয়ে শেষমেশ তাঁরা ফিরে আসেন এক সুন্দর জীবনে। ঘর বাঁধেন একসঙ্গে, বিয়েও করেন। দাম্পত্য সুখেরও অভাব ছিল না।

কেবল অপেক্ষা ছিল এক সন্তানের। কিন্তু প্রথম দিকে সন্তান ধারণে রীতিমতো ভয় পেতেন পেশায় আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক শায়েন। কিন্তু এক সময় শায়েনেরও সাধ জাগে মাতৃত্বের স্বাদ পেতে। তাই দেরিতে হলেও সমস্ত ভয় কাটিয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন এবার সন্তান নেবেন। কিন্তু তিন বছরের চেষ্টা বিফলে গেল, সন্তান এল না শায়েনের কোলে। চেষ্টার কোওন কমতি ছিল না তাঁদের, কিন্তু স্বাভাবিক উপায়ে মাতৃত্ব লাভ সম্ভব হবে না বলেই জানিয়ে দেন চিকিৎসকরা। কারণ ড্যামিয়েনের স্পার্ম কাউন্ট পর্যাপ্ত নয়। তাই শায়েনের মা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
এর পরেই চিকিৎসকরা ঠিক করেন 'ইন্ট্রাইউটেরাইন ইন্সেমিনেশন' বা আই ইউআই পদ্ধতির শরণাপন্ন হবেন তাঁরা। কৃত্রিম ভাবে ড্যামিয়েনের শরীরের সবথেকে সবল শুক্রাণুটিকে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে শায়েনের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করলে তাঁর সন্তান ধারণের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যাবে। খরচ ও ধৈর্য্যের কথা শুনেও নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন তাঁরা। ঠিক করেন, আইইউ পদ্ধতিতেই সন্তান ধারণ করবেন।
সেই মতোই তিন বছর ধরে ট্রিটমেন্ট ও থেরাপি চলে শায়েন ও ড্যামিয়েনের। জলের মতো টাকাও বেরিয়ে যায়। একবার চেষ্টা করেও সফল হয়নি তা।

এবারে ফের নতুন উদ্যম নিয়েছিলেন তাঁরা। কথা ছিল, জানুয়ারি মাসের মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল শুরু হলেই শায়েনের শরীরে এই শুক্রাণু প্রতিস্থাপন করা হবে। সেইমতোই সব ঠিক ছিল। কিন্তু এবার বাধা হয়ে দাঁড়াল এই মহামারীর প্রকোপ। মাত্র একদিন বাকি ছিল প্রতিস্থাপনের। তার আগেই করোনার দাপটে ফিলাডেলফিয়া জুড়ে লকডাউন জারি হয়। বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের ফার্টিলিটি ক্লিনিকও। তিন বছরের অপেক্ষার পরেও মাতৃত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছনো হল না তরুণীর।
যদিও তার পরেও এখনই হাল ছাড়তে নারাজ শায়েন। বলেন, "আমার সন্তান আছে আমার মনে, সে কোলেও আসবে। হয়তো আমাদেরই মতো লকডাউন উঠে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে সে।"