এক ঢিলে কয় পাখি? উত্তর সবাই জানেন। তবে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা শিথিল করে রাজ্য হয়তো একসঙ্গে অনেকগুলি লক্ষ্যপূরণ করতে চলেছে, মত সংশ্লিষ্ট মহলের।

কেন্দ্রের মতোই গৃহস্থের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে (আলোশ্রী) ভর্তুকি দেবে রাজ্য।
শেষ আপডেট: 9 January 2026 19:52
এক ঢিলে কয় পাখি? উত্তর সবাই জানেন। তবে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা শিথিল করে রাজ্য হয়তো একসঙ্গে অনেকগুলি লক্ষ্যপূরণ করতে চলেছে, মত সংশ্লিষ্ট মহলের। কারণ কেন্দ্রের মতোই গৃহস্থের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ (Solar System) প্রকল্পে (আলোশ্রী) ভর্তুকি দেবে রাজ্য (West Bengal) (WBSEDCL)। এর ফলে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী (Narendra Modi) সূর্য ঘর যোজনা, যেটি এ রাজ্যে কার্যকর হয়নি, সেটিকেও কার্যত পাশ কাটিয়ে আবাসনের মতো রাজ্যের নিজস্ব সংশোধিত প্রকল্প চালু হল।
আপাতত অবশ্য রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা (WBSEDCL/ ডব্লিউবিএসইডিসিএল) তাদের গ্রাহকদের জন্য এই ভর্তুকি দেবে। এরপর সিইএসসি দেবে কি না, সেটা রাজ্য বিদ্যুৎ দফতর ও তাদের উপরে নির্ভর করবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের খবর, গৃহস্থ বাড়ির সংযোগের ক্ষেত্রে ছাদে উৎপাদন করা ওই বিদ্যুৎ গ্রিডে সরাসরি যুক্ত করার রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাটির ওই প্রকল্প (ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার) কয়েক বছর আগে চালু হলেও তাতে সে ভাবে সাড়া মিলছিল না। কারণ পুরোটাই আর্থিক। একে এই খাতে কেন্দ্রের বিপুল ভর্তুকি। উপরন্তু সংস্থাটি গৃহস্থকে অল্প কিছু পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে (load generation) সায় দিত। যা গৃহস্থের পক্ষেও আর্থিক ভাবে লাভজনক ছিল না। কারণ সেই পরিকাঠামো (installation) গড়তে যা খরচ হত, আর গ্রিডে বিদ্যুতের জোগান দিয়ে যা লাভ হত, গৃহস্থের বিদ্যুৎ ব্যবহারের মোট খরচের তুলনায় তা আর্থিক ভাবে লাভনজক নয়। ফলে বাড়তি আর্থিক বোঝা সে ভাবে কেউ নিতে রাজি হতেন না। বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে বার্তা পেয়ে তাই নিয়ম বদলানোর কথা ভাবে বিদ্যুৎ দফতর।
নয়া নিয়মে সবচেয়ে বড় তিনটি বিষয় হল, প্রথমত, ছাদে ওই পরিকাঠামো গড়তে উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন মাপকাঠিতে কেন্দ্রের সমান ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ঊর্ধ্বসীমা ছিল, সেটি বিপুল বাড়িয়ে দেওয়া। এই ভর্তুকি খাতে আপাতত বিদ্যুৎ বণ্টন কিছু টাকা বরাদ্দ করছে রাজ্য সরকার। তৃতীয়ত, এ বার থেকে বণ্টন সংস্থাটির থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া আর গ্রিডে সৌর বিদ্যুৎ জোগানের হিসাব হবে ইউনিটের ফারাকের হিসাবে (নেট মিটারিং)। আগে যা ছিল ইউনিটের প্রেক্ষিতে দু'টির দামের হিসাবের ফারাকের (গ্রস মিটারিং যা গৃহস্থের ক্ষেত্রে কার্যত আর্থিক জটিতা বাড়াত) ভিত্তিতে।
এক ঝলকে আলোশ্রী
ভর্তুকি
আবেদন প্রক্রিয়া
এই ব্যবস্থায় কোনও গলদ থাকলে বা সমসযা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির কাছে সবটা জানতে চাইবে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা। এতে গ্রাহকেরই সুবিধা হবে বলে দাবি তাদের।

প্রকল্পটি কী, কীভাবে আবেদন করা যাবে, কোন ক্ষেত্রে কত ভর্তুকি মিলবে, সে সব এই খবরের সঙ্গে আলাদা ভাবে বলা হল আগেই। তবুও সার্বিক ভাবে একটু খতিয়ে দেখা যাক।
এমনিতে সরকারি ভবন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে এই সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকোঠামো বা সিস্টেম (system) অনেকদিন ধরেই চালু ছিল। জনপ্রতিনিধিদের তহবিল থেকেও তাঁরা আর্থিক সাহায্য পেতেন। তবে গৃহস্থের ছাদে এই ব্যবস্থা বসিয়ে সরাসরি সেই বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার বিষয়টি তত পুরনো নয়।
বিষয়টি এ রকম— ধরা যাক, আপনি ডব্লিউবিএসইডিসিএল-এর গ্রাহক। এই ব্যবস্থা চালুর পরেও আপনি তাদের সেউ বিদ্যুৎ-সংযোগ চালু থাকবে। পাশাপাশি আপনি ছাদে রোজ যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, তা গ্রিডের মাধ্যমে জোগান দেবেন।
এ ভাবে আপনি কতটা বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাটির কাছ থেকে নেবেন, আর কতটা গ্রিডে জেবেন, তারে তুল্যমূল্য হিসাব করে আপনার বিদ্যুতের বিল (যা আপনি ডব্লিউবিএসইডিসিএল-কে দেন) দেবেন। ধরা যাক ডব্লিউবিএসইডিসিএল তাঁদের নিয়ম অনুযায়ী (এখন যা তিন মাস অন্তর) নতুন ও বিশেষ মিটার (ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট)মিটারে দেখল আপনি মোট ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ তাঁদের কাছ থেকে নিয়েছেন। আর ২০০ ইউনিট সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে দিলেন। তাহলে আপনি ৬০০ ইউনিটের দাম ডব্লিউবিএসইডিসিএল-এর স্ল্যাবে’র হিসাবে বিল পাবেন ও তা মেটাবেন।
এখন ধরা যাক ডব্লিউবিএসইডিসিএল- থেকে নিলেন ৪০০ ইউনিট বিদ্যুৎ। কিন্তু গ্রিডে জোগালেন ৫০০ ইউনিট। তাহলে সেই বাড়তি ইউনিট প্রতিমাসে কত হচ্ছে জুড়ে (ক্যারি ফরওয়ার্ড, যেমন মোবাইলের ডেটা পুরো খরচ করতে না পারলে শর্ত সার্পেক্ষে কিছুদিন পর্যন্ত নিখরচাতেই ব্যবহার করতে দেয় আপনার মোবাইল সংস্থা) সংশ্লিষ্ট আর্থিক বছরের মার্চ অবধি ওই তুল্যমূল্য হিসাব কষার জন্য।
বিদ্যুৎ মহলের দাবি, এখন প্রতি কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ছাদে বসানোর খরচ গড় কম-বেশি ৬০ হাজার টাকা। সাধারণ ভাবে বণ্টন সংস্থাগুলি দেখেছে, একজন গৃহস্থ ২-৩ বা সাড়ে ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সিস্টেম ছাদে গড়তে আগ্রহী হন।
এ সপ্তাহ থেকেই পোর্টালে আবেদন করার পরিসেবা চালু হয়েছে। তবে ঊর্ধ্বসীমা সংক্রান্ত সংশোধিত নিয়ম পোর্টালে এ সপ্তাহের মধ্যে না হলে দিন কয়েকের মধ্যেই চলু হবে বলা ইঙ্গিত। এ রাজ্যের কয়েক হাজার আগ্রহী বাসিন্দা কেন্দ্রর ওই পিএম সূর্য ঘর প্রকল্পে আবেদন করলেও তার সুবিধা পাননি। তাঁরাও নতুন করে ডব্লিউবিএসআডিসিএলএর-এর পোর্টালে নতুন করে আবেদন করতে পারবেন।
কেউ কেউ এই পদক্ষেপকে ভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক চাল বা কৌশল হিসাবে দেখতে পারেন। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, এ ভাবে এত দিন কেন্দ্রের প্রকল্প চালু না করেও ‘ঠিক সময়ে’ নিজেদের ভর্তুকি প্রকল্প চালু করে আখেরে রাজ্যবাসীর কাছে পৌঁছতে চাইল। তবে এটিকে ভোটের কৌশল হিসাবে না দেখে রাজ্যের উদ্যোগ হিসাবেই দেখানও সহজ।
তবে সরকার বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাটিকে ভবিষ্যতে ভর্তুকির পুরো অর্থ বরাদ্দ না করলে বণ্টন সংস্থাটির উপরে ফের আর্থিক বোঝা চাপা এবং তার ফলে আগামী দিনে সংস্তাটিক আর্থিক স্বাস্থ্য দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না ওয়াকিবহাল মহল। কারণ দুর্গা পুজোর বিদ্যুৎ সংযোগের অর্থ বণ্টন সংস্থাটি ঠিক মতো পায় কি না, এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনও বণ্টন সংস্থা বা রাজ্য কেউই দেয়নি। ফলে মাশুল না বাড়িয়ে নতুন করে আর্থিক বোঝা বণ্টন সংস্থার উপরে চাপলে অদূর ভবিষ্যতে কোনও এক দিন পরিকাঠামো উন্নয়নে অর্থ জোগাড়ে সমস্যায় পড়তে পারে সংস্থাটি।