পাহাড়ে উল্টো ছবি। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দার্জিলিংয়ে চা উৎপাদন হয়েছিল ৫৭.১ লক্ষ কেজি। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৫৩ লক্ষ কেজিতে। অর্থাৎ উৎপাদনে স্পষ্ট ভাটা।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 7 February 2026 13:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: খামখেয়ালি আবহাওয়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগপোকার দাপট—সব বাধা উপেক্ষা করেই রাজ্যে বেড়েছে চায়ের উৎপাদন (two faces of the tea industry,North Bengal)। পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্স মিলিয়ে ২০২৫ সালে কাঁচা চা পাতার উৎপাদন ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে ২৯ মিলিয়ন কেজি, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ৯০ লক্ষ কেজি। টি বোর্ডের হিসেব বলছে, ২০২৪ সালে যেখানে রাজ্যে চা উৎপাদন হয়েছিল ৩৮.২২ কোটি কেজি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১.১১৮ কোটি কেজিতে। শতাংশের হিসেবে প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে ছবির অন্য দিকটাও কম চিন্তার নয়। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের নিরিখে বিচার করলে উত্তরবঙ্গের চা শিল্প আদৌ স্বস্তিতে নেই। কারণ ২০২৩ সালে রাজ্যে চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪৩.৩৫৪ কোটি কেজি—সেই তুলনায় ২০২৫ সালের উৎপাদন এখনও কম।
আরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দার্জিলিং চায়ের অবস্থা। উত্তরবঙ্গে সামগ্রিকভাবে ‘দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি’র উৎপাদন বাড়লেও, পাহাড়ে উল্টো ছবি। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দার্জিলিংয়ে চা উৎপাদন হয়েছিল ৫৭.১ লক্ষ কেজি। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৫৩ লক্ষ কেজিতে। অর্থাৎ উৎপাদনে ভাটা স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের বহু বাগানেই চা গাছ অত্যন্ত পুরনো। সেগুলি তুলে নতুন করে বাগিচা গড়া জরুরি। আর তার জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রীয় সহায়তা। দার্জিলিং-সহ উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের পুনরুজ্জীবনে কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘স্পেশাল প্যাকেজ’-এর দাবি উঠেছিল। কিন্তু বাজেটে সেই নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না হওয়ায় হতাশ শিল্পমহল।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তীর মতে, কেন্দ্রের এই উদাসীনতা উত্তরবঙ্গের চা শিল্পকে ভবিষ্যতের গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালে উৎপাদন বাড়ার নেপথ্যে একটি বড় কারণ হল ডিসেম্বরে চা পাতা তোলার সুযোগ। ২০২৪ সালে টি বোর্ডের নির্দেশে ৩০ নভেম্বরের পর পাতা তোলা বন্ধ ছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ পাতা নষ্ট হয়। আন্দোলনের চাপে ২০২৫ সালে টি বোর্ড সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। তার ফলেই ডিসেম্বরে ভাল পরিমাণ পাতা মিলেছে এবং সামগ্রিক উৎপাদন বেড়েছে।
টি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে রাজ্যে উৎপাদিত হয়েছে ৩.৬৭৮ কোটি কেজি চা পাতা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে তরাই থেকে—১.৯১৯ কোটি কেজি। একই সময়ে ডুয়ার্সে উৎপাদন হয়েছে ১.৭৪৮ কোটি কেজি।
পুরো ২০২৫ সালে তরাইয়ে চা উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১৮.২৫২ কোটি কেজি, যেখানে আগের বছর ছিল ১৬.৩০৩ কোটি কেজি। ডুয়ার্সে ২০২৫ সালে উৎপাদন হয়েছে ২২.৩৩৬ কোটি কেজি, ২০২৪ সালে যা ছিল ২১.৩৪৬ কোটি কেজি।
তবু আশার আলো ক্ষীণ। ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখ্য উপদেষ্টা অমিতাংশু চক্রবর্তী সাফ জানাচ্ছেন, “কাঁচা পাতা যতই বাড়ুক, উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের হাল ভাল নয়। উৎপাদিত চা নিলামে বিক্রি হচ্ছে না, বিক্রি হলেও মিলছে না ন্যায্য দাম। রোগপোকার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সহায়তা নেই। বাজেটে চা শিল্প নিয়ে কিছু অন্তত ঘোষণা হবে ভেবেছিলাম—হতাশ হয়েছি।”
ফলে পাতার হিসেব বাড়লেও, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গের চা শিল্প কি আদৌ স্বস্তির চায়ে চুমুক দিতে পারবে?