দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলার মাথার উপর কালো মেঘ ঘনিয়ে আসার আগেই, রাজনৈতিক রঙ মুছে, খোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের সুরে সুর মেলালেন টলিউডের অধিকাংশ তারকা। তাঁরা সকলেই মনে-প্রাণে শিল্পী। তাঁদের শিল্পীসত্ত্বার উপর, বাকস্বাধীনতার উপর, আচরণের উপর, খাদ্যাভ্যাসের উপর, পোশাক পরিচ্ছদের উপরে নানা সময় বিধিনিষেধ আরোপ করার প্রতিবাদে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে সোচ্চার হলেন সকলে।
আজ, সোমবার দুপুর তিনটে নাগাদ ধর্মতলায় এক অস্থায়ী মঞ্চে দেখা গেল বাংলার প্রথম সারির শিল্পীদের। উপস্থিত ছিলেন শুভাপ্রসন্ন, কবি জয় গোস্বামী, কৌশিক সেন, রাজ চক্রবর্তী, সুদেষ্ণা রায়, ঋদ্ধি সেন ও আরও অনেকেই।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকেই দাঁড়িয়ে কিছু না কিছু কথা, বক্তব্য সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। প্রতিবাদ জানাতে জানাতেই গানও গেয়েছেন তাঁরা একসঙ্গে। এর মাঝেই অভিনেতা কৌশিক সেন সরাসরি বলেন, "তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু এখন তৃণমূল নয়, বিজেপি!" বাবার মতোই ছেলে ঋদ্ধি সেনের কথাতেই সেই বক্তব্য স্পষ্ট।
অন্যদিকে শুভাপ্রসন্ন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে নন্দীগ্রামের সময়ের তুলনা করে বললেন, "এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে আগেও শিল্পীরা এগিয়ে এসেছিলেন, এবারেও ফের সোচ্চার হতে দেখা গেল।" মুখ খুলেছেন সোহিনী সেনগুপ্ত, সুদেষ্ণা রায়েরাও। অন্যদিকে এই সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। কিন্তু তাঁর কথা পাঠ করেছেন সুদেষ্ণা রায়। আবার কবি শ্রীজাতর বক্তব্য পাঠ করেছেন অভিনেতা কৌশিক সেন। একইসঙ্গে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য পাঠ করে শুনিয়েছেন ঋদ্ধি সেন।
প্রত্যেকের কথার মূল বক্তব্য এক। শিল্পীরা শুধু নন, সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা যাতে কোনও ভাবেই খর্ব করা না হয়, সেই নিয়েই সোচ্চার হয়েছেন তাঁরা। অন্যদিকে যত বেলা গড়িয়েছে, ততটাই উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে এখানে।
বক্তব্য রাখেন নুসরতও। তবে এবারে বসিরহাটের সাংসদ হয়ে নয়, বিগত কয়েকদিনের নানারকম হুমকি, বাংলার মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে অভিনেত্রী হিসেবে খোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানালেন নুসরত জাহান।
কয়েকদিন যাবত অভিনেত্রী সায়নী ঘোষ এবং দেবলীনাকে ঘিরে তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়া। একজন গরুর মাংস খাওয়ার দোষে, আরেকজন 'রামভক্ত'দের বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদ করায়, কখনও খুন করার, এমনকি ঘরে ঢুকে 'রেপ' করার হুমকিও দেন কয়েকজন। তার প্রতিবাদেই টলিউডের অভিনেত্রীদের জোটবদ্ধ হতে দেখা যায়। সেই মঞ্চেই বাংলার সাধারণ মেয়েদের পাশে আছেন বলে, আশ্বস্ত করেন নুসরত।
মঞ্চে দাঁড়িয়েই নুসরত বলেন, "যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন মহিলা, সেখানকার মেয়েরা ধর্ষণের হুমকিকে ভয় পান না।" এখানেই শেষ নয়। তিনি এও বলেন, "ধর্ষণের হুমকি আমিও পাই। কিন্তু আমি বা এই মঞ্চে উপস্থিত কোনও মহিলা এই ধরনের হুমকিকে ভয় পায় না। সাহস থাকলে আমাদের ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করে দেখাক। বাংলার বাড়িতে বাড়িতে ঝাঁটা আছে, বঁটি আছে। কেউ আমাদের ভয় দেখালে, তাঁদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে!"
অন্যায়ের বিরুদ্ধে এর আগেও সরব হয়েছিলেন নুসরত। কিন্তু এবার যেন একটু বেশি ফুঁসতে দেখা গেল তাঁকে। কেউ কেউ বলছেন, "তিনি কি এভাবেই বামঘেঁষা অভিনেত্রীদের দলে টানার চেষ্টা করছেন!" তথাপি নুসরত বাংলার মেয়েদের যাতে আর কোনও অপমান, অবমাননার স্বীকার হতে না হয়, তার অঙ্গীকার নিয়েই মঞ্চ ছাড়লেন।
সেই মঞ্চে দাঁড়িয়েই সায়নী ঘোষ এবং দেবলীনা দু'জনেই গলা খুলে প্রতিবাদ করেছেন। দেবলীনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, "গতকালও খুনের হুমকি পেয়েছি। এমনকি আমার মায়ের জন্মবৃত্তান্ত নিয়েও নানারকম অশ্লীল মন্তব্য শুনতে হচ্ছে। নিজের জন্য নয়। মায়ের জন্য ভয় পাচ্ছি। বাংলার মানুষ এবার দেখে শুনে বুঝতে শিখুক। নয়তো অচিরেই পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের নিরাপত্তা আর কোনও জায়গায় থাকবে না।"