ভোটার তালিকায় সংশোধন নিয়ে আপাতদর্শনে কোনও রাজনৈতিক দলেরই আপত্তি থাকার কথা নয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শুধু তৃণমূল নয়, এ যাত্রায় নিবিড় সংশোধন নিয়ে তামাম বিরোধী দল আশঙ্কা প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 15 October 2025 15:23
দুর্গাপুজো (Durga Puja) শেষ। আগামী সপ্তাহে কালীপুজো, ভাইফোঁটাও হয়ে যাবে। তারপর নভেম্বরের গোড়া থেকে ভোটের জন্য তেড়েফুঁড়ে নামতে চলেছে তৃণমূল (TMC)। সেই সভার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে এসআইআর (SIR) তথা ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিরোধিতা।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে আগেই জানা গিয়েছে, বাংলায় ২ নভেম্বর, সোমবার থেকে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন শুরু হয়ে যেতে পারে। হয় সেদিন বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা হবে। বা তার আগে বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা হয়ে যাবে, সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হবে সেদিন থেকে। শেষ পর্যন্ত কৌশলের কোনও বদল না ঘটলে ওই দিনই প্রতিবাদ সভা ডাকতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। তবে দিনক্ষণ এখনও ষোল আনা চূড়ান্ত নয়।
ভোটার তালিকায় সংশোধন নিয়ে আপাতদর্শনে কোনও রাজনৈতিক দলেরই আপত্তি থাকার কথা নয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শুধু তৃণমূল নয়, এ যাত্রায় নিবিড় সংশোধন নিয়ে তামাম বিরোধী দল আশঙ্কা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। তাদের মতে, এই সংশোধনের উদ্দেশ্য ও বিধেয় সন্দেহজনক। কেন্দ্রে শাসক দল বিজেপি যেখানে যেখানে বেকায়দায় রয়েছে, সেখানে এমন ভাবে ভোটার তালিকায় সংশোধন করা হচ্ছে, যা প্রকারন্তরে তাদের সাহায্য করছে। এই সংশোধনের উদ্দেশ্য ভোটার তালিকায় প্রকৃত ও নতুন ভোটার সংযোজন নয়, বরং বাদ দেওয়া। কংগ্রেস, বাম, তৃণমূল সকলেরই মতে এতে বিপদে পড়বে গরিব, দলিত ও প্রান্তিক মানুষ।
কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, ভোটার লিস্টে এই সংশোধনের প্রক্রিয়াকে বাংলায় গরিব ও প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের চক্রান্ত হিসাবে তুলে ধরতে পারে তৃণমূল। সম্ভবত রাজ্যে শাসক দলের বক্তব্য হবে যে, গত চার বছর ধরে বাংলায় একশ দিনের কাজ ও আবাস যোজনার টাকা বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। এবার ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারও ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তাই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
বস্তুত ভোটার তালিকায় সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই বিজেপি নেতাদের আস্ফালনও নজরে পড়ার মতো। কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের দাবি, ১ কোটি ২৫ লক্ষ ভোটারের নাম বর্তমান ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন, অন্তত ১ কোটি ভোটারের নাম বাদ যাবে। কারণ, বাংলার ভোটার তালিকায় অগণিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর নাম ঢুকে আছে।
তৃণমূলের পাল্টা প্রশ্ন? সমীক্ষা বা সংশোধনের আগেই এই সংখ্যাটা বিজেপি বলছে কী করে? তাহলে কি বিজেপিই ঠিক করে দিচ্ছে যে বাংলায় কত ভোটারের নাম বাদ দিতে হবে!
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এর নিরপেক্ষতা সন্দেহের উর্ধ্বে থাকা উচিত। কিন্তু কমিশনের কিছু পদক্ষেপকে সামনে রেখে বিরোধীরা এই ধারণাই গড়ে তুলতে চাইছে যে জাতীয় নির্বাচন সদন বিজেপির কথায় চলছে।
২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চের নির্দেশ ছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বেছে নেওয়ার জন্য যে সিলেকশন কমিটি হবে তাতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও দেশের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের সেই নির্দেশ উল্টে দিতে ২০২৩ সালে আইন পাশ (The Chief Election Commissioner And Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service And Term of Office) Act, 2023) করায় মোদী সরকার। তাতে বলা হয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার আরও একজন মন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা।
সন্দেহের পরত জমতে শুরু করে এখান থেকেই। বিরোধীরা অভিযোগ করেন, কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর এক মন্ত্রী থাকবেন। তিন জনের মধ্যে দুজনের কথাতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাছাই হবে। অর্থাৎ সরকার তথা কেন্দ্রে শাসক দলই ঠিক করে ফেলছেন সিইসি কে হবেন?
গত ফেব্রুয়ারি মাসে জ্ঞানেশ কুমারকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ করার সময়েই বিতর্ক হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বেই এখন শুরু হয়েছে এসআইআর। প্রথমে বিহার তার পর পশ্চিমবঙ্গ।
বিহারে এসআইআর নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। এ ব্যাপারে মামলাও চলছে সুপ্রিম কোর্টে। এখন দেখার পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে জল কতদূর গড়ায়।