মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের প্রায় তিনটি মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। অর্থাৎ ১৪ বছরের বেশি সময় গেল রাজ্যে তৃণমূল সরকার চলছে। কোনও সরকার একটানা প্রায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকলে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 22 July 2025 11:12
সোমবার একুশের মঞ্চ (21 July) থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) কী বলতে পারেন, তার দেওয়াল লিখন মোটামুটি স্পষ্ট ছিল। হয়েছেও তাই। মূলত দুটি বিষয় মুখ্য হয়ে উঠে এসেছে। এক— ভিন রাজ্যে কিছু বাঙালির আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ও বাঙালি অস্মিতার প্রসঙ্গ এবং দুই— ভোটার তালিকা সংশোধনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের নবতম উদ্যোগ।
প্রথম বিষয় প্রথমে। কৌতূহল হতে পারে, কেন ঘুরে ফিরে বাংলা ও বাঙালির প্রসঙ্গে টেনে আনছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?
মনে রাখতে হবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের প্রায় তিনটি মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। অর্থাৎ ১৪ বছরের বেশি সময় গেল রাজ্যে তৃণমূল সরকার চলছে। কোনও সরকার একটানা প্রায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকলে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়। বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। একে তো কোনও সরকারের পক্ষে সব মানুষকে খুশি করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া রাজনীতি সচেতন এই রাজ্যে একটা বড় অংশ এমনিতেই তৃণমূল বিরোধী।
তার উপর সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার পর্যাপ্ত উপাদানও রয়েছে। যেমন অতীতের চিটফান্ড কেলেঙ্কারির অভিযোগ হোক বা হালফিলে চাকরি দুর্নীতির অভিযোগ ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়া। কিংবা ডিএ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের উষ্মা হোক বা আরজি করের ঘটনা ও কসবা-কাণ্ড নিয়ে গণ অসন্তোষ। তা ছাড়া ভোট এলে বাড়ির সামনে এবরোখেবড়ো রাস্তাও বড় ইস্যু হয়ে ওঠে।
সরকারের সাফল্যের বিষয়আশয় দিয়ে এই সব প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ঢাকা দেওয়া যে একেবারেই সম্ভব হয় না তা নয়। কিছুটা নিশ্চয়ই সম্ভব হয়, তবে পুরোটা নয়। তাই বিতর্কের মুখ ঘোরাতে অনেক সময়েই কোনও আবেগের বিষয় জরুরি হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষার উপর আঘাত বা বাঙালি অস্মিতার ব্যাপারটিকে ভোটের ইস্যু করে তোলার নেপথ্যে হয়তো এটা একটা কারণ।
এভাবে বাংলা ও বাঙালির বিষয়টি যে তৃণমূল (TMC) প্রথমবার তুলে আনল তা নয়। বরং একুশের ভোটের সময় থেকে তা ধারাবাহিক ভাবেই করছে। শুধু মোড়ক বদলে বদলে যাচ্ছে। একুশের ভোটের সময়ে তৃণমূলের পলিটিকাল অ্যাডভাইজার ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। হয়তো বুদ্ধিটা তিনিই দিয়েছিলেন। ওই ভোটে অর্থাৎ গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে বহিরাগত বলে দেগে দিয়েছিল তৃণমূল। সেই সঙ্গে দেওয়াল লিখেছিল, ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। তিন বছর পর ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের সময়ে তৃণমূলের স্লোগান ছিল, ‘জনগণের গর্জন- বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন।’ একশো দিনের কাজ, আবাস যোজনার মতো প্রকল্পে কেন্দ্র টাকা বন্ধ করে দেওয়াকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে বাংলা বিরোধী হিসাবে প্রতিপন্ন করতে নেমেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)।
সব রাজনৈতিক দল অতীত সাফল্য বা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়। আই প্যাক বা কালীঘাট হয়তো মনে করছে, বাংলা ও বাঙালি আবেগের বিষয়টিই বিজেপিকে রুখতে সফল অস্ত্র। তাই এবার তা ভিন্ন মোড়কে আনা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ বা ওড়িশায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা বা ধরপাকড়ের ঘটনায় কিছু বাঙালি হেনস্তা হওয়ার ঘটনা এর জমি তৈরি করে দিয়েছে তৃণমূলকে। তা ছাড়া অসমের মুখ্যমন্ত্রী বাংলা ভাষাভাষীদের বিদেশি বলে চিহ্নিত করতে যে দাওয়াই দিয়েছেন, তাও অস্ত্র তুলে দিয়েছে তৃণমূলের হাতে।
কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের আরও একটা পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাঁদের মতে, বাংলা ও বাঙালি অস্মিতাকে বিজেপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা কৌশলগত। তৃণমূলের জন্মই হয়েছিল সিপিএম বিরোধিতা থেকে। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে সেই সিপিএম এখন একপ্রকার অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ফলে তৃণমূল কর্মীদের পুরনো জেদও লঘুতর হয়ে গেছে।
মুশকিল হল, তৃণমূল কর্মীরা সিপিএমকে যেরকম জাত শত্রু বলে মনে করে, বিজেপিকে (BJP) ততটা করে না। কারণ, বিজেপির হাতে তৃণমূল কখনও মার খায়নি। বরং একটা সময়ে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে সিপিএমের সঙ্গে লড়েছে। সিঙ্গুর পর্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন ভাঙাতে দিল্লি থেকে একের পর এক বিজেপি নেতা এসেছেন। তাই বিজেপিকে প্রতিপক্ষ হিসাবে ভাবতে বা তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জেদ তৈরি করতে একটা আবেগের বিষয় কর্মীদের মনে গেঁথে দেওয়া জরুরি। ভিন রাজ্যে বাঙালিদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থেকে বাংলা ও বাঙালি অস্মিতার বিষয় তুলে ধরা সেই কারণেই হয়তো দরকারি বলে মনে হয়েছে মমতা-অভিষেকের।
এবার দ্বিতীয় বিষয়। তা হলে ভোটার লিস্টে নির্বাচন কমিশনের সংশোধনের উদ্যোগ। কমিশন জানিয়েছে, শেষবার ভোটার লিস্টে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন তথা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) হয়েছিল ২০০৩ সালে। তার পর গত ২২ বছরে তা হয়নি। বিহার ভোটের আগে সেখানে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিশন এও ইঙ্গিত দিয়েছে, বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ু, অসমেও সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে। কারণ, ২০২৬ সালে এই সব রাজ্যে ভোট রয়েছে।
বিহারে যেমন বিরোধীরা আশঙ্কা করছেন, সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে। তাতে বিরোধী জোটের সম্ভাবনা বিপন্ন হবে। সেই কারণে রাহুল গান্ধী খোলাখুলিই বলেছেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপির হয়ে ভোট চুরি করতে নেমেছে। বাংলাতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশঙ্কা সংশোধনের নামে বাংলার ভোটার তালিকা থেকে অনেকের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এবং তা তৃণমূলের ভোট সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বস্তুত সেই কারণেই তাঁরা এখন থেকেই তার প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন এবং অভিষেক এও জানিয়েছেন, তিনি প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য দিল্লি অভিযানের ডাক দিতে পারেন।
বাংলার বিরুদ্ধে বঞ্চনার বিষয় নিয়ে অতীতেও দিল্লিতে গিয়ে ধর্না দিয়েছেন অভিষেক। চব্বিশের ভোটে তার ফল পাওয়া গিয়েছে বলেই মনে করে তৃণমূল। তবে সে ছিল কেন্দ্রের সরকার ও শাসকদলের বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু ভোটার লিস্টে নিবিড় সংশোধনের বিরোধিতা করে আন্দোলন করতে গেলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে করতে হবে। অনেকের মতে, এবার চ্যালেঞ্জ তাই হয়তো কঠিন। বাংলার সমস্ত মানুষকে বোঝাতে হবে, কমিশন বিজেপির হয়ে কাজ করছে।
বিজেপিও এর পাল্টা প্রচার করবে। তারা বলবে, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কারণেই কমিশন এই উদ্যোগ নিয়েছে। তৃণমূল তাদের তালিকায় রাখতে চাইছে। কারণ, বাম জমানার শেষ দিকে ও তৃণমূলের মেয়াদে বাংলাদেশ সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিতে দেদার সংখ্যালঘু অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাদের ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড ও আধার কার্ড পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ জন্মসূত্রে তাঁরা ভারতীয় নন। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে নির্বাচন কমিশনকে ছাড়পত্র দিয়েছে তাতে তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ তৈরি করা কম জটিল কাজ নয় বলেই মত অনেকের।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই অবস্খায় দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো তাই এদিন কোনও খুঁটিনাটি বোঝানোর চেষ্টাই করেননি। বরং বাংলার গরিব ও প্রান্তিক মানুষদের ভয় দেখাতে চেয়েছেন যে নির্বাচন কমিশন তথা প্রকারান্তরে বিজেপি ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম কাটার খেলায় নেমেছে।
তবে মনে করার কারণ নেই যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্রেফ এই দুটি বিষয় নিয়েই ভোটে যাবেন। গত ১৪ বছরের বেশি সময় বাংলায় ক্ষমতায় থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার একটা বিপুল আয়তনের উপভোক্তা শ্রেণি সফল ভাবে তৈরি করেছে। তারা কোনও না কোনও ভাবে সরকার থেকে আর্থিক সাহায্য বা ভাতা পায়। যেমন শুধু লক্ষ্ণীর ভাণ্ডারের ভাতা পান ২ কোটির বেশি মহিলা। গত আর্থিক বছরে ১২ লক্ষ পরিবারকে বাড়ি বানানোর টাকা দিয়েছে তাঁর সরকার। বিধানসভা ভোটের আগে আরও ১৬ লক্ষ পরিবার বাড়ি বানানোর জন্য প্রথম কিস্তির টাকা পাবেন। পরিবার পিছু চার জন সদস্য হলে এ ক্ষেত্রেও উপভোক্তার সংখ্যা ১ কোটির বেশি।
একুশ বা চব্বিশের ভোটের ফলাফল দেখে বলা যায়, এই বিষয়টা ভোটে সন্দেহাতীত ভাবেই তৃণমূলকে অনেকটা সুবিধা দেবে। আইসিং অন দ্য কেকের মতো এর উপর থাকবে বাংলার আবেগ ও বাঙালি অস্মিতার বিষয়। মমতা-অভিষেকের লক্ষ্য সেটাও যেন অতীতের মতই লক্ষ্যভেদ করতে পারে। বাকিটা ২৬ সালের মে মাসে বোঝা যাবে।