
শেষ আপডেট: 18 July 2023 18:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঙ্গলবার বেঙ্গালুরুতে বিরোধী জোটের বৈঠক হয়েছে। যে জোটের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ইন্ডিয়া, তথা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (INDIA- Indian National Developmental Inclusive Alliance)। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় কৌতূহল তৈরি হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গেও কি কংগ্রেস, তৃণমূল, বামেদের জোট হবে (tmc congress left front alliance chances)? অর্থাৎ এই রাজ্যে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অধীর চৌধুরী-মহম্মদ সেলিমরা নিজেদের মধ্যে আসন সমঝোতা করবেন?
আবার এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছেন, “এ ধরনের কোনও কাল্পনিক প্রশ্নের জবাব দেব না। কংগ্রেস হাইকমান্ড আমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি”।
তাহলে বিষয়টি কোথায় দাঁড়াল?
সর্বভারতীয় কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা দ্য ওয়ালকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে আসন সমঝোতা হবে কি হবে না এই প্রশ্নই এখন অবান্তর। যাঁরা এ কথা বলছেন, তাঁদের এই বিরোধী জোটের ব্যাপারে এখনও ধারণা স্পষ্ট হয়নি। প্রথম বিষয় হল, রাজ্যওয়াড়ি আসন সমঝোতা নিয়ে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি। এখনই তা নিয়ে আলোচনার কোনও কথাও ছিল না। কারণ অগ্রাধিকার হল, জাতীয় স্তরে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করা। এবং দেশের মানুষকে একজোট হয়ে লাগাতার ভাবে বোঝানো যে অগণতান্ত্রিক, অকর্মণ্য সরকার দেশকে রসাতলে পাঠাচ্ছে। দুই, সবাই একসঙ্গে লড়াইয়ে নামলে এই জোটের একটা নাম থাকা উচিত। মঙ্গলবার সেই নাম স্থির হয়েছে।
কংগ্রেসের ওই প্রবীণ নেতার কথায়, এই নামকরণের পর এবার জরুরি বিষয় হল আন্দোলনের অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করা। অর্থাৎ মোদী সরকারের বিরুদ্ধে এই বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কী কী বিষয়ে সরব হবে। এবং সেই আন্দোলন কর্মসূচী কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। শুধু তা নয়, ২৬টি দল নিয়ে যখন জোট হয়েছে তখন পারস্পরিক সমন্বয়ের জন্য একটা টিম ও একটা সচিবালয় তৈরিও জরুরি।
কংগ্রেস ও তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, এসবের পর আসন সমঝোতার প্রসঙ্গ উঠবে। সেই আলোচনা নভেম্বর মাসে পাঁচ রাজ্যে ভোটের আগে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আসন সমঝোতার বিষয়টি মোটেও সহজ নয়। ১৯৭৭ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের জন্য একবার বিরোধীদের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়েছিল। ১৯৮৯ রাজীব গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধেও একবার বিরোধীরা আসন সমঝোতা করেছিলেন। কিন্তু সেদিন আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়।
দ্বিতীয় বিষয় হল, এদিনের বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনেই কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, রাজ্যস্তরে এই ২৬টি দলের মধ্যে কোথাও কোথাও পারস্পরিক মতান্তর ও লড়াই থাকবে। কিন্তু তাকে পাশে রেখেই জাতীয় স্তরে একটি অভিন্ন কারণে এখানে সবাই একজোট হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতিতে বোঝাপড়া হয়েছে মানেই রাজ্যে জোট হবে তা নয়।
যেমন কেরলে কংগ্রেস ও সিপিএমের মধ্যে জোটের কোনও সম্ভাবনা নেই। ২০১৬ সালে বাংলা ও কেরলে একই সঙ্গে বিধানসভা ভোট হয়েছিল। তখন বাংলায় কংগ্রেস ও সিপিএমের জোট হলেও কেরলে তা হয়নি। তাই জাতীয় স্তরে কংগ্রেস, তৃণমূল একই সঙ্গে মোদী বিরোধিতা করা মানেই বাংলায় আসন সমঝোতা হবে, এমনটা নাও হতে পারে। এমনিতে পঞ্চায়েত ভোটে হিংসার ঘটনার প্রেক্ষিতে তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি রয়েছে। কংগ্রেসের কর্মীরা অধিকাংশ তৃণমূলের সঙ্গে জোট চান না। তাঁদের ভাবাবেগকে গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া উপায় নেই অধীর চৌধুরীর।
আবার তৃণমূলও যে কংগ্রেসকে বাংলায় আসন ছাড়তে রাজি হবে এমন ভাবনা এখনও নেই। তা করতে হলে প্রথমেই কংগ্রেসকে তাদের বর্তমান দুটি আসন তথা বহরমপুর ও মালদহ দক্ষিণ ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু তৃণমূলের পাল্টা এই যুক্তিও থাকতে পারে যে একুশের বিধানসভা ভোটে এই দুই জেলায় কংগ্রেস একটিও আসন জেতেনি। মুর্শিদাবাদে তৃণমূল একাই ২২টি আসনের মধ্যে ২০টিতে জিতেছে। তা ছাড়া বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসকে দুটি আসন ছাড়লে, কংগ্রেস তৃণমূলকে আসন ছাড়বে কোথায়?
ফলে বাংলার বিষয়টি কোনওভাবেই সহজ নয়। খুবই জটিল। এটা ঠিক যে, কংগ্রেস হাইকমান্ড অধীর চৌধুরীদের নির্দেশ দিয়ে দিলে বাংলার কংগ্রেসকে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করা ছাড়া উপায় থাকবে না। তবে এও ঠিক, রাহুল গান্ধীর জমানায় কংগ্রেস দিল্লি থেকে রাজ্যের উপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বরং রাজ্য সংগঠনের মতকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
এরই মধ্যে কোনও কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবার বলতে শুরু করেছেন যে কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলায় তৃণমূলের জোট হলে জোড়াফুলের উপকারই হবে। কারণ, তাতে সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন হবে না।
কিন্তু এর পাল্টা যুক্তিও রয়েছে কারও কারও। তাঁদের মতে, বাংলার সংখ্যালঘুরাও মঙ্গলবার দেখলেন যে জাতীয় স্তরে মোদী বাহিনীকে রুখে দিতে সনিয়া-মমতা-রাহুল এখন এককাট্টা। বাংলায় মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুর ছাড়া সংখ্যালঘু এলাকায় কংগ্রেসের তেমন কোনও নেতা নেই, শক্তিও নেই। সুতরাং মঙ্গলবার যে ছবি দেখা গেল, সেটাই দক্ষিণবঙ্গের সংখ্যালঘু এলাকায় তৃণমূলের জন্য অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।
চুম্বকে, বাংলায় কংগ্রেস-তৃণমূলের আসন সমঝোতা এখনই কোনও আলোচনা নেই। তা আপাতত দূরতর গ্রহ।
সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বিজেপির মহা মিছিল বুধবার, এখনও মেলেনি পুলিশের অনুমতি