কথিত, ফেরার পথে গঙ্গার ঘাটে দুর্গা বিসর্জনের দৃশ্য দেখে ব্যথিত হন রাজা। সেদিনই তিনি স্বপ্নে দর্শন পান দেবীর। দেবী তাঁকে আদেশ দেন, কার্ত্তিকী শুক্লা নবমীতে দুর্গামন্ত্রে জগদ্ধাত্রী রূপে তাঁকে পুজো করতে।

শেষ আপডেট: 25 October 2025 19:37
সময়টা ১৭৬০ সাল। বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতার সেই সময় রবার্ট ক্লাইভ মীরজাফরকে সরিয়ে মীরকাশিমকে বাংলার নবাবের আসনে বসান। কর প্রদানে রাজি না হওয়ায় নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে মীরকাশিম বন্দি করে পাঠান মুঙ্গেরে। ১৭৬৩ সালে মীরকাশিম ও ইংরেজদের যুদ্ধে সুযোগ নিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বন্দিদশা থেকে পালিয়ে আসেন।
কথিত, ফেরার পথে গঙ্গার ঘাটে দুর্গা বিসর্জনের দৃশ্য দেখে ব্যথিত হন রাজা। সেদিনই তিনি স্বপ্নে দর্শন পান দেবীর। দেবী তাঁকে আদেশ দেন, কার্ত্তিকী শুক্লা নবমীতে দুর্গামন্ত্রে জগদ্ধাত্রী রূপে তাঁকে পুজো করতে। কিন্তু কোনরূপে পুজো হবে দেবীর? তাঁর কোনও রূপকল্পতো নেই। তাই প্রথমে রাজা ঘটপুজোর মাধ্যমে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করেন। সেই সূত্র ধরেই নদিয়ার মাটিতে কামরাঙা গাছের তলায় দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা শুরু হয়, যা আজ সারা বাংলায় এক বিশিষ্ট উৎসব।
শান্তিপুরের কাছে ব্রহ্মশাসন গ্রামে বাস করতেন এক সিদ্ধ সাধক। চন্দ্রচূড় তর্কচূড়ামণী পঞ্চানন। তিনি ধ্যানযোগে সূর্যোদয়ের সময় দেবীকে দর্শন করেন—সিংহবাহিনী, চতুর্ভুজা ও রক্তিমবর্ণা জগদ্ধাত্রীরূপে। তিনিই প্রথম দেবীমূর্তি গড়ে পুজো শুরু করেন।
পরে ভয়ঙ্কর মহামারীতে ব্রহ্মশাসন গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ব্রাহ্মণরা তখন দেবীর চরণপীঠ ও পুজোর সামগ্রী স্থানান্তর করেন সূত্রাগড় বিশ্বাসপাড়ায়। সেই সময় থেকেই সূত্রাগড়ে নিষ্ঠার সঙ্গে মা জগদ্ধাত্রীর পুজো চলে আসছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, একসময় এখানে ছিল ১০৮ ঘর ব্রাহ্মণ পরিবার, আজ অবশিষ্ট আছে মাত্র একটি ব্রাহ্মণ পরিবার। সেই পরিবারের বংশধর রমাপ্রসাদ মুখার্জী জানিয়েছেন, “আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে প্রথম এখানে ঘটপুজোর মাধ্যমে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে রাজ পরিবারের উদ্যোগে মূর্তি পুজোর প্রচলন হয়।”
বর্তমান পুজো উদ্যোক্তা সুমন্ত ব্যানার্জিও জানিয়েছেন, তাঁদের পুজোর সূচনা হয় ঘটপুজোর মাধ্যমেই। পরে রাজ পরিবারের পরামর্শে দেবীর মূর্তি ও মন্ত্র প্রবর্তিত হয়।” আজও সেই ঐতিহ্য টিকে আছে নদিয়ার বুকে—ব্রহ্মশাসনের দেবীমন্দিরে ভোরের আলো ফোটে দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনায়, যেখানে ইতিহাস, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে শুরু হয়েছিল বাংলার অন্যতম শ্রদ্ধার এই পুজো।