দ্য ওয়াল ব্যুরো: তারা নয় যেন আস্ত একটা ডিস্কো বল। আকারে বিরাট। ঔজ্জ্বল্যেও খাসা। টিমটিম করে জ্বলে না এই তারা, ঝিকমিকে আলোর ফোয়ারা ছোটায়। নিজের কক্ষে আপনমনে ঘুরতে ঘুরতেই আলোর তেজ ছিটকে দেয় মহাশূন্যে। একঝলক দেখলে মনে হবে যেন নাচতে নাচতে, গাইতে গাইতে ঘুরছে এই তারা। তা গানই গায় বটে। এই তারার বুকের স্পন্দন শুনতে গিয়ে চমকে উঠেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। এ কী! এ তারার তো সুর আছে! ঠিক যেন কেউ পিয়ানো বাজছে। একটানা একটা অদ্ভুত সুর। কথন হাল্কা আবার কখনও কর্কশ।
ডেল্টা স্কুটি। সূর্যের চেয়ে ভর দেড় থেকে আড়াই গুণ বেশি। ধরা দিয়েছে নাসার ‘ট্রানসিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’ (TESS)-এর লেন্সে। সিডনি ইউনিভার্সিটির মহাকাশবিজ্ঞানের গবেষক টিম বেডিং বলেছেন, “অনেক তারারই স্পন্দন আছে। তাদের হার্ট বিট ধরা হয় বিশেষ যন্ত্রে। কিন্তু ডেল্টা স্কুটি একটু অন্যরকম। এর প্রতি ঘূর্ণনেই একটি মিউজিক্যাল রিদম তৈরি হয়। এমন সুর আগেও শোনা গেছে অনেক তারার স্পন্দনেই, তবে সেই সুর অন্যরকম। ডেল্টা স্কুটির সুর অনেক বেশি জটিল। তার ধরনও স্থির নয়।”

গত বুধবার ‘নেচার’ ডার্নালে ডেল্টা স্কুটির এই নতুন বৈশিষ্ট্যের কথা লিখেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
https://twitter.com/NASA/status/1261795341252341761
ডেল্টা স্কুটির খোঁজ অবশ্য নতুন নয়। সেই ১৯৯০ সালে নাসার ‘প্ল্যানেট-হান্টার’ কেপলার স্পেস টেলিস্কোপে প্রথম ধরা পড়েছিল ডেল্টা স্কুটি। তারপর ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কেপলারের লেন্স এমন অনেক ডেল্টা স্কুটিকে চিহ্নিত করেছিল। তবে তখন তার এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশেষ নাড়াঘাঁটা হয়নি। গবেষক টিম বেডিং বলছেন, নাসা সম্প্রতি ৬০টি ডেল্টা স্কুটি নক্ষত্রকে চিহ্নিত করেছে। দেখা গেছে এদের প্রত্যেকেরই এমনই একটা গান গাইবার শখ আছে।
https://www.youtube.com/watch?v=rsdZmFNj_WA&feature=emb_logo
ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের মহাকাশবিজ্ঞানী বিল চ্যাপলিন বলেছেন, এই তারা থেকে যে আলো ঠিকরে বার হচ্ছে তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যও বদলে যাচ্ছে। কখনও অতি উজ্জ্বল, আবার কখনও আকারের বদল। এই পরিবর্তনটা হচ্ছে তারার মধ্যেকার গ্যাসীয় পদার্থের বদলের কারণে। তারার আলোক তরঙ্গের সঙ্গে শব্দ তরঙ্গের একটা খটামটি বাঁধছে। যেটা হচ্ছে তারার শরীরের হাইড্রজেন ও অন্যান্য গ্যাসের বদলের কারণে। তাই কখনও সে আলো ঝিকমিকিয়ে উঠছে, আবার কখনও নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। এই বদলটা হচ্ছে ঘন ঘন। তাই শব্দেরও বৈচিত্র্য আসছে। তার স্পন্দনের সুর কখনও একটানা, আবার কখনও সুর-তাল-লয় সব ঘেঁটেঘুঁটে কর্কশ শব্দ বাইরে আসছে। তবে এইসবই বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, তারার শরীরে যে এত বদল হচ্ছে তার আসল কারণ এখনও অনেকটাই পর্দার আড়ালে।

“একশ বছর ধরে এই তারা রহস্যের পর রহস্য তৈরি করে যাচ্ছে,” বলেছেন ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক ড্যানিয়েল হাবার। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব কম করেও ১৪০০ আলোকবর্ষ। ড্যানিয়েল বলেছেন, সব ড্যানিয়েল স্কুটির স্পন্দন একসঙ্গে ধরা সম্ভব নয়। তবে এদের সুর ও উজ্জ্বলতার এই ঘনঘন বদলের একটা ডেটা কার্ভ বানানো হয়েছে।
চমকটা এসেছে এর পরেই। সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক টিম বেডিং ও হাওয়াই ইউনিভার্সিটির গবেষক ড্যানিয়েল হাবার বলছেন, প্রথমে মনে হয়েছিল কর্কশ, একটানা ভুলভাল সুর। পরে সঠিক নোডে ফেলে দেখা গেছে এলোমেলো সুর নয়, বরং পিয়ানোয় বাজানো সুন্দর একটা গানের মতোই বেজে উঠছে ডেল্টা স্কুটি।
নাসার টেস বা ‘ট্রানসিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট’-এর প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর জর্জ রিকার বলেছেন, এই খোঁজ এক নতুন চমক। মহাকাশে তারাদের রহস্য জানতে সাহায্য করবে।