রাজ্য সরকারের অনুরোধ শুনে সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী রায়ে জানিয়ে দেয়, অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ তিন মাসের মধ্যে দিতে হবে।

শেষ আপডেট: 16 May 2025 16:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (DA) নিয়ে এক দীর্ঘদিনের আর্থিক ও আইনি টানাপোড়েন এবার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট (DA Case Supreme Court) একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করে জানিয়েছে, আগামী ৩ মাসের মধ্যে রাজ্য সরকারকে কর্মীদের বকেয়া ডিএ-র ২৫% দিতে হবে। মামলার শুনানির সময়ে বিচারপতিরা বলেছিলেন, চার সপ্তাহের মধ্যে ৫০ শতাংশ বকেয়া মিটিয়ে দিন। পরে রাজ্য সরকারের অনুরোধ শুনে সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী রায়ে জানিয়ে দেয়, অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ তিন মাসের মধ্যে দিতে হবে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী আগস্ট মাসে।
শুরুর গল্প: বৈষম্যের শিকড়
ডিএ হল সরকারি কর্মীদের দেওয়া একটি বেতনভুক্ত ভাতা, যা মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে আংশিক সুরক্ষা দেয়। কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিবছর দু’বার ডিএ দেয়, যা উপভোক্তা মূল্যসূচকের (Consumer Price Index) সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু রাজ্য সরকারগুলি নিজেদের মতো করে ডিএ (DA) নির্ধারণ করে।
পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় হারের তুলনায় ডিএ বরাবরই অনেক কম। বামফ্রন্ট সরকারের আমল থেকে তা চলছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা ৫৫% ডিএ পাচ্ছেন, সেখানে রাজ্য সরকারি কর্মীরা পাচ্ছেন মাত্র ১৮%।
রাজ্যের কর্মচারীদের দাবি, ডিএ কোনও দান বা এককালীন অনুগ্রহ নয়—এটি বেতনের একটি আইনসিদ্ধ অংশ। তাই কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের কর্মীদের জন্য এটি সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
আইনি লড়াইয়ের সূচনা: WBAT-এর রায়
বহু বছর আন্দোলনের ২০১৯ সালে, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের এক যৌথ সংগঠন কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে (WBAT) একটি মামলা দায়ের করে। তাদের দাবি ছিল—কেন্দ্রের সঙ্গে সমতা রেখে রাজ্য সরকারকে ডিএ দিতে হবে এবং সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে দিতে হবে।
WBAT তাদের পক্ষে রায় দিয়ে জানায়: “ডিএ কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি বেতনের একটি বৈধ উপাদান। মূল্যবৃদ্ধি ও সমতুল্য মানদণ্ড অনুযায়ী ডিএ সামঞ্জস্য না করা অনায্য ও বৈষম্যমূলক আচরণ।”
ট্রাইব্যুনাল স্পষ্ট করে দেয় যে, একই নিয়মে ও সমতুল্য দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মীদের আর্থিকভাবে বৈষম্যের শিকার করা চলবে না।
হাই কোর্টের হস্তক্ষেপ: সরকারের প্রতি কড়া বার্তা
WBAT-এর রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাজ্য সরকার কলকাতা হাই কোর্টে যায়। কিন্তু মে ২০২২-এ হাই কোর্টও রাজ্যের আবেদন খারিজ করে দেয়।
বিচারপতি হরিশ টন্ডন ও রবীন্দ্রনাথ সমন্তের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়:
“ডিএ কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরির অধিকার। রাজ্য সরকার ইচ্ছামতো তাদের তা থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। সরকারকে সমতুল্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতেই হবে।”
আদেশে বলা হয়, কেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যকে ডিএ দিতে হবে এবং যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বকেয়া মেটাতে হবে।
রাজ্যের যুক্তি
রাজ্য সরকার ২০২২ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টে একটি স্পেশাল লিভ পিটিশন (SLP) দাখিল করে। সেখানে তারা যুক্তি দেয়:
• ডিএ নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সমতা রাখা বাধ্যতামূলক নয়।
• রাজ্যগুলোর নিজস্ব আর্থিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব আছে।
• কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ডিএ-র একই হার থাকলে ‘ফেডারেল ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা সংবিধানসম্মত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে।
এদিকে, রাজ্য সরকার ২০২৪ সালের শুরুতে ৩% ও ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ৪% হারে ডিএ বাড়ালেও, কর্মচারীরা তা যথেষ্ট মনে করেননি। আন্দোলন চলতেই থাকে, এবং কর্মচারী সংগঠনগুলি পূর্ণ রূপে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার দাবিতে রাস্তায় নামে।
সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ: আংশিক স্বস্তি
২০২৫ সালের ১৬ মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় করোল ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ জানায়:
“পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আগামী তিন মাসের মধ্যে সমস্ত উপযুক্ত কর্মীদের ২৫% ডিএ দিতে হবে। মামলাটি ফের আগস্ট ২০২৫-এ শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হবে।”
কর্মচারী ফেডারেশনের মতে, এই নির্দেশে যদিও পূর্ণ সমতা মেলেনি, তবে লক্ষাধিক কর্মীর কাছে এটি একটি আংশিক স্বস্তির বার্তা। একইসঙ্গে মামলার মূল বিষয়ের এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন কর্মচারীরা।