
শেষ আপডেট: 13 April 2023 11:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের একটা বড় অংশে যুগ যুহ ধরে ঘটে চলছে সম্মানরক্ষার্থে হত্যা (Honour Killing)। কার্যত, ভয়াবহ সামাজিক কুপ্রথায় পরিণত হয়েছে এই অভ্যাস। সাধারণত সমাজের মাতব্বরদের আপত্তি সত্ত্বেও ভিনধর্ম বা জাতির কোনও পুরুষ ও মহিলা পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইলে পরিবারের ‘সম্মান রক্ষা'র অজুহাতে তাঁদের উপর নেমে আসে নানা ধরনের নিপীড়ন এমনকি হত্যাও। একেই 'অনার কিলিং' বলা হয়। অবাক করা বিষয় হল, অনার কিলিং নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই তোলপাড় পড়ে গেলেও, আসলে বহু ঘটনাই থেকে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে।
১৯৩৬ সালে এক বক্তৃতায় দলিত আন্দোলনের পুরোধা ভীমরাও রামজি আম্বেদকর বিভিন্ন জাতপাতের ব্যক্তিদের মধ্যে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার উপর আরও জোর দিতে বলেছিলেন। সামগ্রিকভাবে জাতিব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন করার শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এই পদ্ধতিকেই। পরবর্তীকালে তিনিই ভারতের সংবিধান রচনা করেন। অথচ ভারতীয় সংবিধানের রূপকারের সেই আশা ও বাস্তবের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।
সম্প্রতি, দলিত হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স নেটওয়ার্ক ও ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর উইমেন লিডার্সের যৌথ সমীক্ষায় জানা গেছে দেশের সাতটি রাজ্য-- হরিয়ানা, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, বিহার, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশে অনার কিলিং-এর হার সবচেয়ে বেশি।
সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২১ পর্যন্ত দায়ের হওয়া ২৪টি মামলার প্রায় প্রত্যেকটিতেই মৃত বা নিপীড়িতের পরিবারকে চূড়ান্তভাবে হেনস্থা হতে হয়েছে খাপ পঞ্চায়েতের কর্তাদের হাতে। আরও জানা গেছে, দেশে এই সম্পর্কিত কড়া আইন বা উপযুক্ত সামাজিক সচেতনতার অভাবে উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে এই অন্যায়।
অনার কিলিং-এর শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সিংহভাগই তফসিলি জাতিভুক্ত (SC)। এ পর্যন্ত তথাকথিত দলিত সম্প্রদায়ের ২০ জন তাঁদের উচ্চবর্ণের সঙ্গীর পরিজনদের হাতে নিগৃহীত বা খুন হয়েছেন। শুধু তাই নয়, রিপোর্টে বলা হয়েছে, বহুক্ষেত্রে নিগৃহীত বা নিগৃহীতার পরিবারের লোকেদেরও হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটেছে। যেমন হরিয়ানায় তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত গোটা একটা পরিবারকেই 'সম্মানরক্ষার্থে' একেবারে নিকেশ করে দেওয়া হয়। আবার তামিলনাডুতে তথাকথিত দলিত এক তরুণ উচ্চবর্ণীয় থেভার জাতিভুক্ত এক তরুণীর সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। তাঁদের খুঁজে না পাওয়ায়, বদলা নিতে মেয়ের পরিবার ছেলের বোনকে অপহরণ করে হত্যা করে।
দুর্ভাগ্যবশত, ভারতে এই 'সম্মানরক্ষার্থে হত্যা' সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে কোনও সুস্পষ্ট আইন নেই। এই ধরনের মামলার তদন্ত করা হয় সাধারণ ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ীই। তবে নির্যাতিত বা নির্যাতিতা তফশিলি জাতি অথবা উপজাতি সম্প্রদায়ের হলে যুক্ত হয় এসসি/এসটি আইনের (১৯৮৯) বিভিন্ন ধারা। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ওবিসি বা যাযাবর সম্প্রদায়ভুক্ত। সেক্ষেত্রে তদন্তকারীরা ভারতীয় দণ্ডবিধিকেই মান্যতা দেন।
২০১২ সালে দ্বিতীয় ইউপিএ জমানায় দেশের আইন কমিশন শুধুমাত্র অনার কিলিং সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করার জন্য আলাদাভাবে একটি আইন তৈরির সুপারিশ করে। কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রোহিবিশন অফ ইন্টারফেয়ারেন্স উইথ দ্য ফ্রিডম অফ ম্যাট্রিমনিয়াল অ্যালায়েন্সেস বিলের (Prohibition of Interference with the Freedom of Matrimonial Alliances Bill) খসড়াও প্রস্তুত করা হয়। এই বিলে স্বেচ্ছায় বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চাওয়া যুগল কোনওরকম সামাজিক বাধা, ভীতি প্রদর্শন বা হেনস্থার শিকার হলে তাদের বিশেষ আইনি নিরাপত্তা ও ভীতি প্রদর্শক, হেনস্থাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা ছিল। কিন্তু খসড়া বিলটি সেসময়ে কোনও সাংসদই পেশ করেননি সংসদে। ফলে অচিরেই তা হিমঘরে চলে যায়।
তবে আশার কথা, ২০১৮ সালে শক্তি বাহিনী বনাম ভারত সরকার মামলায় (Shakti Vahini vs Union of India) সুপ্রিম কোর্ট অনার কিলিং-কে গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ কড়া ব্যবস্থা নিতে প্রত্যেক রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। শীর্ষ আদালত খাপ পঞ্চায়েতকেও বেআইনি ঘোষণা করে কারণ অনেক সময়ই ভিন্ জাতে বিবাহ প্রসঙ্গে খাপ পঞ্চায়েতের বিধান আইনত বৈধ হয় না। কোর্টের এই রায়ের পরেই রাজস্থান সরকার সে রাজ্যে ক্রমবর্ধমান অনার কিলিং-এর ঘটনা ঠেকাতে ২০১৯ সালে বিধানসভায় অনার কিলিং বিরোধী বিল পাস করে। কিন্তু রাজ্যপালের স্বাক্ষর না থাকায় এখনও সে বিল আইনে পরিণত হয়নি।
সমীক্ষকদের আরও অভিযোগ, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবি শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই অনার কিলিং সম্পর্কিত সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। আর সেই পরিসংখ্যানেও স্বচ্ছতার যথেষ্ট অভাব। তাঁরা অনার কিলিং-এর জন্য বিশেষ আইন এবং অনার কিলিং সংক্রান্ত স্পষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়াও স্পেশাল ম্যারেজ আইনে দ্রুততার সঙ্গে বিয়ে নথিভুক্ত করার কথা দাবি জানিয়েছেন। এর ফলে বিয়ের গতি এবং সংখ্যা বাড়লে সমাজের এইধরনের সমস্যাও দ্রুত মিটবে বলে তাঁদের বিশ্বাস।
চরম রোদ মাথায় নিয়ে কাজ করে চলেছেন ট্র্যাফিক পুলিশরা, জল-সানগ্লাস বিলি করলেন নগরপাল