বুদ্ধদেব গুহ
সৌমিত্রকে আমি প্রথম দেখি পঞ্চাশের দশকে, কলেজস্ট্রিট পাড়ায়। তখন সে একজন উঠতি কবি। একরঙা খদ্দরের পাঞ্জাবি পরত, আর ধুতি। তার কবিতাও বেরোত এখানে ওখানে। কফিহাউসে যাঁরা যেতেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা হতো ওঁর। তবে আমি ল কলেজে পড়লেও, আমায় তখন অফিসও করতে হত বলে আমার কফিহাউসে যাওয়ার সময় হতো না। তাই সে সময়ে সৌমিত্রর সঙ্গে আলাপ হওয়ার কোনও অবকাশ ছিল না। তখন শঙ্ঘ ঘোষ, সুনীল, শক্তি, তারাপদ, প্রণব, সমীর, উৎপল প্রমুখদের কবিতা পড়ি। সে সময়ে সম্ভবত কৃত্তিবাসের যুগ আরম্ভ হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর কবিতার পত্রিকাও তখন নিয়মিত বেরোচ্ছে। সে সময়ে আমার স্ত্রী ঋতু গুহঠাকুরতাও আকাশবাণীতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া আরম্ভ করেন এবং তখন সৌমিত্র আকাশবাণীর অনুষ্ঠানের ঘোষক ছিল। ঋতুর কাছে পরে শুনেছিলাম, ঋতুর অনুষ্ঠানের আগে রঙিন পাঞ্জাবি পরে তরুণ সৌমিত্র এসে হাতে কাগজ-কলম নিয়ে ওঁকে জিজ্ঞেস করত, সকালে ও রাতে কী কী রবীন্দ্রসঙ্গীত ঋতু গাইবে। সৌমিত্র সম্বন্ধে তখন ঋতুর ধারণা ছিল, বেশ লাজুক, সভ্যভব্য, বিনয়ী, সুদর্শন ভদ্রলোক।
সৌমিত্রর সঙ্গে আমার আলাপ হয় অনেক পরে। তার পরে নানা অনুষ্ঠানে ওর সঙ্গে দেখা হয়, কথাও হয়। তবে সৌমিত্র সম্বন্ধে যে বিশেষণটি আমার সবচেয়ে প্রিয়, তা হল ‘সভ্য, ভদ্র, বিনয়ী বাঙালি’। চার দিকে যখন দুর্বিনয়ের জয়যাত্রা দেখি, তার মধ্যে সৌমিত্রর বিনয়ী সত্তা অন্য স্বল্প ক’জন মানুষের বিনয়ী সত্তার সঙ্গেই জ্বলজ্বল করে।

ও কত বড় মাপের অভিনেতা, সে সম্বন্ধে আমার সার্টিফিকেটের কোনও প্রয়োজন ওর কোনও দিনই ছিল না। অনেকে বলেন, সত্যজিৎ রায়ের জন্যই সৌমিত্রর এত নামডাক। আমার মনে হয়, এই সিনেমা জগতে সত্যজিৎ রায়ের নামডাকের পেছনে সৌমিত্রর অবদানও খুব কম নয়। দুজনে দুজনের পরিপূরক ছিলেন। সঙ্গীত নাট্য অ্যাকাডেমির ললিতকলা অ্যাওয়ার্ড, পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে এবং ফরাসি সরকারের ‘লেজ্যিন দ্য অনার’ ইত্যাদি নানা পুরস্কার পেয়েও কিন্তু সৌমিত্র একটুও স্ফীত হননি। সেসব পুরস্কার পেয়ে সৌমিত্র যত না ধন্য হয়েছেন, পুরস্কারদাতারাও সমান ধন্য হয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। সৌমিত্র চিরদিন বলে গেছেন, ওকে সবচেয়ে বড় পুরস্কার দিয়েছেন বাঙালিরা। সে পুরস্কারের সমতুল আর অন্য কোনও পুরস্কার ও পেয়েছে বলে মনে করে না।
সৌমিত্র মানুষ হিসেবেও অত্যন্ত প্লেজেন্ট মানুষ ছিল। আমি ওকে কখনও কারও নিন্দা করতে শুনিনি। সবরকম বাকবিতণ্ডা এড়িয়ে যাওয়ার এক আশ্চর্য প্রশংসার্হ ক্ষমতা ওর ছিল। সৌমিত্রর কাছ থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু ছিল। সবসময় হাসি মুখ, অনুযোগ-অভিযোগহীন, অপরিসীম জীবনীশক্তি সম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে সে চিরদিন আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রির পটভূমি ছিল পালামৌয়ের জঙ্গল। যদিও সুনীলের উপন্যাসে ধলভূমগড়ের জঙ্গল স্থান পেয়েছিল। সেই ছবির শ্যুটিংয়ের পুরো দায়দায়িত্ব ছিল আমাদের ফার্মের মক্কেল ডালটনগঞ্জের এমএল বিশ্বাস অ্যান্ড কোম্পানির কর্ণধার শ্রী মোহন বিশ্বাসের উপর। শর্মিলা ঠাকুর, সিমি, সৌমিত্র, শুভেন্দু, রবি ঘোষ এবং আরও অনেকে জঙ্গলের বিভিন্ন বাংলোয় তখন থেকেছিলেন। স্বয়ং মানিকদা এবং ওঁর স্ত্রী মঙ্কুমাসিও জঙ্গলেই ছিলেন। পাহাড়ি সান্যাল মশাইও গেছিলেন। যাঁরা ছবিটি দেখেছেন, তাঁদের মনে থাকবে।
সৌমিত্র সব খবরই রাখত। এমএল বিশ্বাস কোম্পানি ও আমার মধ্যে সম্পর্কের কথা ও জানত। কিন্তু কখনও এই নিয়ে আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি। এটাও এক ধরনের সুশিক্ষা।
আমি ঠাট্টা করে সৌমিত্রকে প্রায় বলতাম, “যাত্রা করে এত টাকা রোজগার করো! আমাকেও একবার কোনও যাত্রা কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দাও না! এক সিজন যাত্রা করে কিছু রোজগার করে নিই!” ও বলতো, “ভাবছো খুব মজা তাই না? রাত জেগে বাস করে গন্ডগ্রামে গিয়ে যাত্রা করা যে কী সুখের জিনিস, তা আমরা যারা করি তারাই জানি। তুমি কি জানো, আমায় একটা বেল্ট পরতে হয় মেরুদণ্ডে চোটের জন্য? ওই বেল্ট পরে বাসে করে বসে যাওয়া, সে যে কী অব্যক্ত যন্ত্রণা, তা তুমি ধারণাও করতে পারবে না!”

একবার টালিগঞ্জের একটি সিনেমাহলে এক বড় অনুষ্ঠানে আমি গান গাইতে গেছি। আমি গিয়ে পৌঁছোনোর পরেই শুনলাম, আমার গানের পরে সৌমিত্রর নাটক আছে। ও নাকি যাত্রা করে, রাত জেগে, বাসে করে সোজা হলে এসে পৌঁছেছে একটু আগে। আমি উদ্যোক্তাদের বললাম, একটু দেখা করে আসি। ওঁরা আমায় নিয়ে গেলেন। কিন্তু গিয়ে বড় লজ্জিত হলাম। দেখলাম সৌমিত্র একটা সরু বেঞ্চের ওপরে শুয়ে আছে, ওর চোখদুটো নিজের ডানহাত দিয়ে ঢাকা। যাতে আলো না পড়ে। বুঝলাম, ও একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করছে। আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম, কিন্তু আমার গলার স্বর শুনেই ও হাতটা নামিয়ে উঠে বলল, “আরে বুদ্ধদেব! তুমি এসেছো?” আমি বললাম, “আই অ্যাম সরি সৌমিত্র, আমি জানতাম না তুমি রেস্ট নিচ্ছো।” ও বলল, “রেস্ট আর কতক্ষণ নেব, ভালই হল। বহুদিন তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি।” আমি ওইটুকু কথা বলে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম, সত্যি কী পরিশ্রম করতে হয় ওকে!
সৌমিত্রর ডাক নাম ছিল পুলু। ওর দাদা সম্বিতকে এবং স্ত্রীকেও আমি ভাল করে চিনতাম। কারণ ওঁরা ছিলেন আমার বড় শালা অরূপ গুহঠাকুরতার খুব বন্ধু। সেই সূত্রেই আমার সঙ্গে সম্বিতের আলাপ। সম্বিত থাকত আমার ফ্ল্যাটের কাছেই। কিন্তু ওর অ্যালঝাইমার্স হয়েছিল। আমি ওকে দেখতে যেতে চাওয়ায় পুলুই একদিন বলল আমায়, “তুমি যেও না। কারণ তোমায় চিনতেই পারবে না।” তাই আমি আর গেলাম না।

সাম্প্রতিক অতীতে আমার সঙ্গে পুলুর যে কোনও অনুষ্ঠানেই দেখা হোক না কেন, আমি ওকে দিয়ে গান গাওয়াতাম। ও প্রথমে ‘না না’ করত, বলত, “আমি কি গায়ক নাকি?” কিন্তু কোনও বারই আমার অনুরোধ ও ফেলতে পারত না। শেষে গান গাইতই। ওকে দিয়ে যে গান গাওয়াতে পারতাম, এটাই আমার জীবনে ক্কচিৎ গর্ব করার ঘটনার মধ্যে একটা।
আমাদের দুজনেরই অসীম ব্যস্ততার কারণে আড্ডা মারা যাকে বলে, তা বিশেষ হয়নি। আমাদের শেষবার দেখা হয়েছিল বিড়লা সভাঘরে, কয়েক মাস আগে একটি পুরস্কার প্রাপ্তির অনুষ্ঠানে। ১০ জন সেরা বাঙালিকে পুরস্কার দিয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁদের মধ্যে আমি, সৌমিত্র, রুদ্রপ্রসাদ প্রমুখ ছিলাম।
যে কোনও অনুষ্ঠানে ওর নিয়মানুবর্তিতা দেখতাম। খাবার দিতে কোথাও দেরি করলে ও নিজেই নিজের খাবার বেড়ে নিত। তার মধ্যে স্যালাড বেশি নিত, মাছ-মাংসের পরিমাণ খুব কম। নিজের খাবার নিজে বেড়ে খেয়ে একেবারে সময়ে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যেত। এর কোনও ব্যত্যয় হত না। এটাই স্বাভাবিক ছিল। একজন এমন কর্মব্যস্ত মানুষের জীবনে অনিয়ম থাকলে তো চলে না! অনুষ্ঠানে আসার সময় এবং যাওয়ার সময় সম্বন্ধে ওর দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ হতে হতো।

কিছুদিন আগে একবার রবীন্দ্রসদনে রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারার শ্রুতিনাটক মঞ্চস্থ করা হল। নাটকটি অনেক বছর আগে রবীন্দ্রসদনে নাটক হিসেবেই মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে সাহিত্যজগতের সকল রথী-মহারথী অংশ নিয়েছিলেন। সাগরময় ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার, দিব্যেন্দু পালিত এবং আরও অনেকে ছিলেন। আমিও ছিলাম। অনেকগুলি গান ছিল বলে আমায় ধনঞ্জয় বৈরাগীর চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল। তার প্রায় এক যুগ পরে সেটি শ্রুতিনাটক হিসেবে মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্রসদনে। যদিও সৌমিত্র মূল নাটকের সময়ে অংশগ্রহণ করেনি। পরে সম্ভবত সুনীলের অনুরোধে ও সম্ভবত টিকিট বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য সৌমিত্র একটি প্রধান চরিত্রে অংশগ্রহণ করে। শ্রুতিনাটক শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমায় আলাদা করে ডেকে সৌমিত্র খুব প্রশংসা করেছিল। আমি চিরদিনই জানতাম, এখনও জানি, আমি আদৌ ভাল অভিনেতা বা গায়ক দুটোর কোনওটাই নই। তাই এত বড় মানুষের প্রশংসায় সাধারণ আমি কিছুক্ষণের জন্য অত্যন্ত স্ফীত বোধ করেছিলাম।
সৌমিত্র সম্বন্ধে আরও অনেক কথা বলা যেত, তবে তার পরিসর এখানে নেই। সৌমিত্রর সঙ্গে আমি আমেরিকা ও কানাডাতেও গেছি কিছু অনুষ্ঠানে। কানাডা যাওয়ার সময়ে ঋতু আমার সঙ্গে ছিল। আমার মনে আছে, টরন্টোতেও আমি সৌমিত্রকে গান গাইতে বাধ্য করেছিলাম। সৌমিত্রর স্ত্রী দীপা কৈশোরকালে ঋতুর বান্ধবী ছিল। দীপা খুব ভাল ব্যাডমিন্টন খেলত। নামী খেলোয়াড় ছিল ও। সেই সূত্রে দীপার সঙ্গেও ঋতুর যোগাযোগ ছিল, তবে খুব একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নয়।

সৌমিত্র বাঙালিদের হৃদয়ে চিরদিন থাকার জন্য এসেছিল এবং তা সে থাকবেও তার বহুমুখী প্রতিভার কারণে। সে যেখানেই থাকুক না কেন, আমি প্রার্থনা করি, সে যেন সুখে এবং শান্তিতে থাকে। ঈশ্বর তাঁর আত্মার মঙ্গল করুন।