সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের SIR প্রক্রিয়াকে ঘিরে মালদহের ঘটনা সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিছক একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর একযোগে আঘাত।

শেষ আপডেট: 2 April 2026 14:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গে তালিকা সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত বিচারকেদের উপর হামলা ও ঘেরাওয়ের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court on West Bengal)। শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা সরাসরি পর্যবেক্ষণে জানান, পশ্চিমবঙ্গের মতো এতটা ‘রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণ’ আগে কখনও দেখেনি।
সুপ্রিম কোর্টের এও পর্যবেক্ষণ, এ রাজ্যে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে প্রায় সব কিছুই রাজনৈতিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, এমনকি আদালতের নির্দেশ পালন নিয়েও রাজনীতির ছাপ স্পষ্ট।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল পঞ্চোলির বেঞ্চ এই ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে শুনানি শুরু করে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পাঠানো চিঠির ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি হাতে নেয়। ওই চিঠিতে জানানো হয়, মালদহের একটি গ্রামে SIR সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের সময় ৭ জন বিচারক—যাঁদের মধ্যে তিনজন মহিলা—গ্রামবাসীদের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কার্যত আটকে থাকেন।
পরে গভীর রাতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে তাঁদের সেখান থেকে সরানো হয়। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি বিপদ। ফেরার পথে বিচারকদের গাড়িতে পাথর ছোড়া হয় এবং বাঁশ দিয়ে হামলা চালানো হয় বলেও আদালতে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষোভ এদিন আছড়ে পড়েছে রাজ্য প্রশাসনের উপর। আদালতের মতে, এমন এক সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রশাসনের তৎপরতা অত্যন্ত শ্লথ ছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাতে পরিস্থিতি তিনি নিজে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর থেকে দীর্ঘ সময় কোনও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এমনকি রাত ১১টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের উপস্থিতি ছিল না বলে প্রধান বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, যদি প্রতিবাদ সত্যিই ‘অরাজনৈতিক’ হত, তবে রাজনৈতিক নেতারা সেখানে কী করছিলেন? আর যদি তাঁরা উপস্থিত থাকেন, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে তা থামানোর দায়িত্বও তাঁদের ছিল।
শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বলেন, ঘটনাটি ছিল একটি “অরাজনৈতিক প্রতিবাদ”। কিন্তু সেই যুক্তি মানতে নারাজ ছিল বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, যদি প্রতিবাদ অরাজনৈতিকই হয়, তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোথায় ছিল? কেন তাঁরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দিলেন না? তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, আদালত এই ঘটনাকে নিছক স্থানীয় উত্তেজনা বলে দেখতে রাজি নয়। বরং বিচারকেদের মতো নিরপেক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও যখন হামলার শিকার হন, তখন তা আরও গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।
এদিন পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত আদালতে বলেন, নির্বাচন কমিশন যেন প্রতিপক্ষের মতো আচরণ না করে। সেই মন্তব্যের জবাবে প্রধান বিচারপতির প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রত্যেকেই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন। আদালত যখন ভেবেছিল, SIR প্রক্রিয়ায় বিচারকেদের যুক্ত করলে একটি নিরপেক্ষ কাঠামো তৈরি হবে এবং তাতে সব পক্ষই সন্তুষ্ট থাকবে, তখনও এই ধরনের হামলা ঘটেছে। প্রধান বিচারপতির কথায়, “আমরা এমন মেরুকৃত রাজ্য দেখিনি।” আদালত আরও ইঙ্গিত দেয়, দুষ্কৃতীরা কারা, তা নিয়ে তারা অন্ধকারে নেই। প্রধান বিচারপতি জানান, রাত ২টো পর্যন্ত তিনি নিজে বিষয়টি মনিটর করেছেন।
এই মন্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টিতে বিচারকরা এখানে কোনও দলের প্রতিনিধি নন, তাঁরা আদালতের এক্সটেন্ডেড হ্যান্ড বা ‘সম্প্রসারিত হাত’ হিসেবে কাজ করছিলেন। SIR প্রক্রিয়ার মতো সংবেদনশীল নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজে তাঁদের নিয়োগের মূল উদ্দেশ্যই ছিল নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। অথচ সেই বিচারকেরাই যখন ঘেরাও হন, আটকে থাকেন, এবং মুক্তির পর হামলার মুখে পড়েন, তখন আদালত সেটিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে না; বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচনা করছে।
শুনানিতে আদালত শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে থাকেনি। বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্রীয় বাহিনী চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে রাজ্যের একাধিক শীর্ষ আধিকারিক— মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, এসএসপি এবং জেলাশাসকের ভূমিকা নিয়েও বেঞ্চ কড়া অসন্তোষ প্রকাশ করে। শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা বা দেরি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পুরো ঘটনার মধ্যে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান বিচারপতি আগেই মন্তব্য করেছিলেন, অন্যান্য রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে এগোলেও পশ্চিমবঙ্গে সমস্যা প্রকট। সেই পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় এদিনের মন্তব্য আরও কড়া সুরে শোনা গেল। অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্টের চোখে এটি আর শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।
মালদহের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার কাজকে ঘিরে এমন শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশ কেন তৈরি হল? দ্বিতীয়ত, বিচারকেদের নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল কি? তৃতীয়ত, রাজ্যের প্রশাসন কি শুরুতেই আরও দ্রুত নড়েচড়ে বসলে এত বড় সঙ্কট এড়ানো যেত? সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, এই প্রশ্নগুলির উত্তর তারা খুঁজতে চাইছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের SIR প্রক্রিয়াকে ঘিরে মালদহের ঘটনা সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিছক একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর একযোগে আঘাত। আর সেই কারণেই আদালতের ভাষাও ছিল অস্বাভাবিক রকমের কড়া। “এতটা রাজনৈতিক মেরুকরণ আগে দেখিনি”—সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এ রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও এক তীব্র সতর্কবার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।