প্রশাসনের দাবি, এবছর নিরাপত্তা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত। পুণ্যার্থীরা যাতে নিশ্চিন্তে গঙ্গাসাগরে এসে পুণ্যস্নান করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই বাড়তি প্রস্তুতি।

গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 6 January 2026 18:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগমে সাগর মেলা (Gangasagar Mela) মানেই প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ - বিশেষ করে সমুদ্র ও নদী এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (Gangasagar Public Safety)। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবার সাগর মেলায় মোতায়েন করা হল অত্যাধুনিক রিমোট কন্ট্রোল লাইফবয় ওয়াটার ড্রোন (remote controlled lifebuoy drone)। জলে ডুবে গেলে দ্রুত উদ্ধারকাজের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি (Gangasagar Mela Rescue Technology) এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল বলেই মনে করছেন আধিকারিকরা।
এই বিশেষ ওয়াটার ড্রোনটি সম্পূর্ণ রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালানো যায় এবং বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যেতে সক্ষম। সেই ব্যক্তি শুধু ড্রোনটা ধরে থাকলেই ড্রোন তাকে টেনে পাড়ে নিয়ে আসবে (water rescue drone)।
এই ড্রোনের বিশেষত্ব কী?
এই লাইফবয় ওয়াটার ড্রোনটির কার্যক্ষমতার অন্যতম বড় দিক হল এর ১ কিলোমিটার পর্যন্ত কার্যকর রেঞ্জ। অর্থাৎ তীর থেকে অনেক দূরে কেউ বিপদে পড়লেও ড্রোনটি সহজেই সেখানে পৌঁছতে পারবে, যেখানে মানুষের পক্ষে পৌঁছনো সময়সাপেক্ষ বা ঝুঁকিপূর্ণ।
ড্রোনটির সর্বোচ্চ গতি সেকেন্ডে ৭ মিটার, যা একজন প্রশিক্ষিত সাঁতারুর তুলনায় অনেকটাই বেশি। ফলে বিপদের মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এটি ডুবন্ত মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। প্রশাসনের মতে, এই দ্রুতগতিই অনেক ক্ষেত্রে জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
এই ড্রোনের সবচেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে অন্যতম হল এর অটো-রাইটিং ক্যাপাবিলিটি। ‘প্লাস’ ফিচার হিসেবে থাকা এই প্রযুক্তির সাহায্যে ড্রোনটি যদি ঢেউয়ের চাপে উল্টে যায়, তাহলে মাত্র ২ সেকেন্ডের মধ্যেই নিজে থেকেই সোজা হয়ে যেতে পারে। ফলে উত্তাল জলেও উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।
ড্রোনটির সঙ্গে থাকা উন্নতমানের রিমোট কন্ট্রোলারে একটি স্ক্রিন রয়েছে, যেখানে অনবোর্ড ক্যামেরা থেকে সরাসরি ১০৮০পি এইচডি ভিডিও ফিড দেখা যায়। এর ফলে উদ্ধারকারীরা ড্রোনটিকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পারেন এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

এই লাইফবয় ওয়াটার ড্রোনের আরেকটি বড় শক্তি হল এর উচ্চ টোয়িং ক্যাপাসিটি। এটি সর্বোচ্চ ১০০০ কেজি বা ১ টন পর্যন্ত ওজন টানতে সক্ষম। ফলে একসঙ্গে একাধিক বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি বা লাইফ র্যাফটকেও নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা সম্ভব।
নিরাপত্তার দিক থেকে ড্রোনটিতে রয়েছে GPS-ভিত্তিক অটো-রিটার্ন সিস্টেম। যদি কোনও কারণে রিমোট সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা ব্যাটারি চার্জ ১৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে, তাহলে ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেখান থেকে ছাড়া হয়েছিল, সেখানেই ফিরে আসবে।
ড্রোনটি তৈরি করা হয়েছে উচ্চ ঘনত্বের, আঘাত-প্রতিরোধী LLDPE পলিমার দিয়ে, যা একে অত্যন্ত টেকসই করে তোলে। পাশাপাশি এর প্রপেলারগুলি সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ অবস্থায় থাকায় বিপদগ্রস্ত কেউ ড্রোনটি ধরে থাকলেও দ্বিতীয় কোনও আঘাতের আশঙ্কা থাকে না।
সাগর মেলায় নিরাপত্তায় নতুন অধ্যায়
প্রশাসনের মতে, এই রিমোট কন্ট্রোল লাইফবয় ওয়াটার ড্রোন মোতায়েনের ফলে সাগর মেলায় জলপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই শক্তিশালী হল। জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমিয়ে দ্রুত ও কার্যকর উদ্ধারকাজ সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, প্রশাসনের তরফ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, দুর্যোগ মোকাবিলায় এবছর বাহিনীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। প্রায় ২,৫০০ সিভিল ডিফেন্স স্বেচ্ছাসেবক, এসডিআরএফ, এনডিআরএফ, কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী প্রস্তুত থাকবে। নদীপথে নিরাপত্তার জন্য বসানো হচ্ছে বিশেষ আলো ও টাওয়ার, যাতে কুয়াশার মধ্যেও গাড়ি চলাচল নিরাপদ থাকে। পাশাপাশি, কৌশলগত জায়গায় রাখা হচ্ছে ১৮টি অস্থায়ী ফায়ার স্টেশন।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গঙ্গাসাগর ও আশপাশে তৈরি হচ্ছে ৫টি অস্থায়ী হাসপাতাল। মোট ৫৪০টি বেডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতির জন্য থাকবে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স, জল অ্যাম্বুল্যান্স ও প্রায় ১০০টি সাধারণ অ্যাম্বুল্যান্স।
প্রশাসনের দাবি, এবছর নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা আগের যে কোনও বছরের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত। পুণ্যার্থীরা যাতে নিশ্চিন্তে গঙ্গাসাগরে এসে পুণ্যস্নান করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই বাড়তি প্রস্তুতি।