দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রায় ৫০০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে আটকে আছে দু'টি বড় ট্রলার! এমনই তথ্য জানা গেছে রাষ্ট্রসংঘের তরফ থেকে। কিন্তু এই শরণার্থীদের বাংলাদেশ উপকূলে আসার অনুমতি দিতে নারাজ সে দেশের সরকার। মানবাধিকার সংগঠন গুলির হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও এই করোনা পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিতে অনড় তারা।
উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের সমস্যা বাংলাদেশ ও মায়ানমার এই দুই দেশের সরকারের কাছেই বহু পুরনো। দুই দেশের কাছেই এই জাতি ব্রাত্য। আন্তর্জাতিক মহলে হাজার শোরগোল সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত কোন সমাধানের দিকে এগোয়নি দুই দেশের কেউই। বছর কয়েক আগে অবশ্য বাংলাদেশ সরকার একটা বড় রিফিউজি ক্যাম্প করে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে থাকতে দিয়েছে। কিন্তু তার পর থেকে আর কোনও ব্যবস্থা হয়নি তাদের।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জ জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরের মাঝে দু'টি মাছ ধরার ট্রলারে আটকে আছে নারী, পুরুষ ও শিশু সমেত প্রায় ৫০০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। মনে করা হচ্ছে এদেরকে মালয়েশিয়া থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে করোনা সংক্রমণের কারণে। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাশা, বাংলাদেশেই জায়গা হবে তাঁদের। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কোনও উচ্চবাচ্য করেনি।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আটকে থাকার কথা শোনা যাচ্ছে, তাদের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের নয়। তিনি আরও বলেন, "শরণার্থীরা কেউ বাংলাদেশ উপকূলে নেই, তারা মাঝসমুদ্রে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আরও অনেক দেশ আছে। ফলে এই শরণার্থীদের দায় একমাত্র বাংলাদেশ সরকারের কোনও ভাবেই নয়।"
আবদুল মোমেন মায়ানমার সরকারকে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে জানিয়ে মনে করিয়ে দেন, কিছুদিন আগেই তাদের সরকার ৩৯৬ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে। বাংলাদেশ সরকার বারবার এদের দায়িত্ব কেন নেবে, প্রশ্ন তাঁর।

রাষ্ট্রপুঞ্জের রিফিউজি অর্গানাইজেশনের তরফে জানানো হয়েছে, এই দু'টি ট্রলার মাঝসমুদ্রে প্রায় কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকে আছে। মনে করা হচ্ছে, সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানীয় কিছুই নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামে একটি মানবাধিকার সংগঠনও বাংলাদেশকে বারবার অনুরোধ জানিয়ে চলেছে এই মানুষগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের উপকূল রক্ষীবাহিনী এ বিষয়ে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ করতে রাজি নয়।
টেকনাফ স্টেশনের লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার সোহেল রানা জানান, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের কাছাকাছি যেসব অঞ্চলে তাদের নজরদারি চলে সেখানে কোন ট্রলার তাঁরা দেখতেই পাননি। ফলে এমনও নয় যে ট্রলার দু'টি বাংলাদেশের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, এপ্রিলের মাঝামাঝি তারা এই ট্রলার দু'টির খবর পান। অনুমান, এই সমস্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশ ক্যাম্প থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার পরে আর পেরে ওঠেনি। করোনা আতঙ্কে ঢুকতে পারেনি মালয়েশিয়াতেও। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ-ও জানিয়েছে, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে কথা বলে তাঁরা জেনেছেন, কিছু দিন আগেই বেশ কিছু পরিবার সেই ক্যাম্প থেকে পালিয়ে সমুদ্রে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু পরে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায় নি।

এই পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, এরাই মালয়েশিয়াতে ঠাঁই না পেয়ে ফেরার চেষ্টা করছে। এখন রাষ্ট্রপুঞ্জ বলছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ-সহ একাধিক দেশের এই শরণার্থীদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কিন্তু এই মহামারীর সময়ে তা সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও দাবি করেছে, দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি থেকে যেন এই শরণার্থীদের ফিরিয়ে না দেওয়া হয়। মহামারীকে যেন 'অজুহাত' হিসেবে দেখানো না হয়।
কিন্তু কোনও দেশই এগিয়ে আসেনি। বাংলাদেশ সরকারও জানিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের সিদ্ধান্তে অনড়। বিদেশ মন্ত্রী মোমেন বলেছেন, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপুঞ্জ অন্যান্য দেশগুলিকে এদের দায়িত্ব নিতে বলুক। কোনও দেশ রাজি হলে, বাংলাদে সে সব দেশে এই শরণার্থীদের পাঠিয়ে দেবে।