এক নার্স কোমায় চলে গিয়েছেন এবং তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আক্রান্ত আরেক পুরুষ নার্সের অবস্থার তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে। তিনি এখনও ভেন্টিলেশনে থাকলেও চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 15 January 2026 08:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোমবার বিকেলে বাংলায় নিপা ভাইরাসে (Nipah Virus) আক্রান্ত দু’জনের খোঁজ মিলতেই (Nipah Affected Two Nurses) স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তৎপরতা শুরু হয়। আক্রান্ত দু’জনই সেদিন থেকেই বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাজ্যে নিপার হদিশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজ্য সরকারকে সহায়তা করতে পাঠানো হয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট আউটব্রেক রেসপন্স টিম’ (NJORT)। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা (JP Nadda) সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সঙ্গে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
এদিকে মঙ্গলবার থেকেই উদ্বেগ বাড়ে। কারণ আক্রান্তদের মধ্যে এক মহিলা নার্সের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। রাতের দিকে চিকিৎসকরা জানান, তিনি অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছেন। বুধবার সকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, ওই নার্স কোমায় চলে গিয়েছেন এবং তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আক্রান্ত আরেক পুরুষ নার্সের অবস্থার তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে। তিনি এখনও ভেন্টিলেশনে থাকলেও চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কীভাবে নিপায় আক্রান্ত তাঁরা?
প্রাথমিক অনুসন্ধানে সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস (Source of Nipah Virus) হিসেবে উঠে এসেছে দু’টি বিষয়। এক, নদিয়া জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে যাতায়াত (Border Village of Nadia) এবং দুই, টানা দু’দিন একসঙ্গে তাঁদের নাইট ডিউটি (Night Duty)। যদিও নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি, তবে এই দু’টি বিষয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় টিমের ১১ পাতার রিপোর্টে।
পরপর সংক্রমণের আশঙ্কা
এর মধ্যেই সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কায় সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়েছে। কাটোয়ার ওই সিস্টার নার্সের সংস্পর্শে আসা বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক হাউসস্টাফ ও এক নার্সের শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ায়, তাঁদের বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। নার্সকে বর্ধমান থেকে মঙ্গলবার গভীর রাতে এবং হাউসস্টাফকে বুধবার সকালে আইডি-তে আনা হয়। ২৪ বছরের ওই হাউসস্টাফ দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের বাসিন্দা এবং এতদিন বাড়িতেই কোয়ারান্টিনে ছিলেন।
দু’জনেরই সামান্য সর্দি-কাশির উপসর্গ রয়েছে। তবে নিপা সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ এই ধরনের হওয়ায় ঝুঁকি না নিয়ে তাঁদের আইডি হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়াও বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অ্যাকিউট এনকেফালোপ্যাথি সিনড্রোমে আক্রান্ত এক তরুণীকেও আইডি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। নিপা সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকায় তাকেও আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। বুধবার তাঁদের প্রত্যেকের নমুনা পাঠানো হয়েছে কল্যাণী এইমসের ল্যাবে।
দু’জন নার্স নিপায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাঁদের সংস্পর্শে আসা মোট ৪৫ জনের নমুনা ইতিমধ্যেই কল্যাণীতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর।
উপসর্গের শুরু কখন?
কেন্দ্রীয় রিপোর্টে আক্রান্তদের গতিবিধির বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। জানা গিয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই মহিলা নার্স নদিয়ার ঘুগরাগাছি গ্রামে একটি পারিবারিক বিয়েতে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। এরপর গত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি ওই নার্সের প্রায় ১০২–১০৩ ডিগ্রি জ্বর, কাশি, তীব্র মাথাব্যথা, বমি ভাব এবং সারা শরীরে অস্বস্তি দেখা দেয়। ৩ জানুয়ারি অচেতন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
কেন্দ্রীয় রিপোর্ট অনুযায়ী, পুরুষ নার্স ২৭ ডিসেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিনই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে তাঁর। পরে ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হয়। ৪ জানুয়ারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি। ৮ ও ৯ জানুয়ারি তাঁর শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক সমস্যার উপসর্গ দেখা দেয়।
সতর্ক প্রশাসন
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, আক্রান্ত মহিলা নার্সের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১৪ জনের রক্তের নমুনা এইমস-এ পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি কাটোয়া হাসপাতাল ও বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।
বারাসতের ওই বেসরকারি হাসপাতালের অন্তত ২২ জন স্টাফকে কোয়ারান্টিনে রাখা হয়েছে বলে খবর। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। জানা যাচ্ছে, আক্রান্ত মহিলা নার্স হৃদয়পুর এলাকার একটি মেসবাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
রাজ্যে নিপা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়তেই নজরদারি, আইসোলেশন এবং পরীক্ষার পরিসর দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতর ও কেন্দ্রীয় টিম পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।