রাজনীতিতে শেষ কথা মানুষই বলে। আর এই ধ্রুব সত্যকে সংগোপনে, ইঙ্গিতে, শুক্তিতে লুকনো মুক্তার মতো ধরে রেখেছে এই সন্ধিবদ্ধ পদ! আর তাই জনমত গঠন আর আমজনতার মন জয়ে রাজনীতিকদের কসরতের শেষ নেই।

ছবি এআই দিয়ে তৈরি
শেষ আপডেট: 22 March 2026 15:01
‘ভোট’ বা ‘নির্বাচনে’র (West Bengal Assembly Election 2026) আরও একটা চালু বাংলা প্রতিশব্দ রয়েছে। মাঝেসাঝে কানে আসে। শব্দটা হচ্ছে, ‘জনাদেশ’। মূলে নিহিত ‘জন’। অর্থাৎ, জনতা (যে কিনা জনার্দনও বটে!), তার আদেশ-ই শিরোধার্য। রাজনীতিতে শেষ কথা মানুষই বলে। আর এই ধ্রুব সত্যকে সংগোপনে, ইঙ্গিতে, শুক্তিতে লুকনো মুক্তার মতো ধরে রেখেছে এই সন্ধিবদ্ধ পদ! আর তাই জনমত গঠন আর আমজনতার মন জয়ে রাজনীতিকদের কসরতের শেষ নেই।
এক সময় সভা-সমাবেশ, দেওয়াল লিখন বা মিছিলেই সীমাবদ্ধ ছিল প্রচারের পরিধি। পরে এল বৈদ্যুতিন মাধ্যম, ইদানীং দাপট দেখাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media)। মাধ্যম বদলেছে। লক্ষ্য কিন্তু সেই একই—ভোটারের ড্রয়িংরুম বা হেঁশেলে সেঁধিয়ে যাওয়া। কখনও সেই প্রচেষ্টায় থাকে সহমর্মিতার ছোঁয়া, আবার কখনও তা হয়ে ওঠে চূড়ান্ত হাস্যরসের খোরাক।
সম্প্রতি বাংলার নির্বাচনী (West Bengal Election) আবহে এমন কিছু খণ্ডচিত্র ধরা পড়েছে, যা নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। পুরশুড়ার তৃণমূল প্রার্থী (TMC Candidate) পার্থ হাজারি ভোটারদের বাড়ি গিয়ে দেখলেন রান্নার গ্যাস নেই, গৃহবধূ কাঠের উনুনে রুটি বেলছেন। ওমনি প্রার্থী নিজেই হাতে তুলে নিলেন বেলন-চাকি। কর্মীরা স্লোগান হাঁকলেন হেঁশেলের ভেতর।
দুবরাজপুরের বিজেপি প্রার্থী (BJP Candidate) অনুপ কুমার সাহার ‘সংযোগ’ আরও ‘অন্তরঙ্গ’! এক বৃদ্ধের দাড়ি কামিয়ে জনসংযোগ সারলেন তিনি। যা দেখে অনেকের মনে পড়ছে পুরনো সেই দিনের কথা! খড়্গপুরে বিজেপি প্রার্থী হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে দেখা গিয়েছিল এক ভোটারকে সাবান মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিতে। প্রার্থীরা একে ‘জনসেবা’ বললেও সমালোচকদের চোখে স্রেফ ‘ভোট বাগানোর কৌশল’!
তবে বাংলার এই ভোটরঙ্গের খণ্ডচিত্র বিশ্বরাজনীতির নিরিখে নেহাতই নস্যি। বিদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে তাকালে এমন কিছু প্রার্থীর দেখা মেলে, যাঁদের কাণ্ডকারখানা চোখ কপালে তুলতে বাধ্য।
ব্রিটেনের কথাই ধরা যাক। সেখানকার রাজনীতিতে যেমন আবির্ভাব ঘটেছিল ‘লর্ড বাকেটহেডে’র। মাথায় ডাস্টবিনের মতো হেলমেট পরে নিজেকে ‘মহাজাগতিক লর্ড’ বলে দাবি করা এই ‘প্রাজ্ঞ’ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, জিতলে বার্মিংহাম শহর গুঁড়িয়ে সেখানে ভিনগ্রহের যান ওঠানামার ‘স্পেস-পোর্ট’ বানাবেন! শুনতে অবাক লাগলেও, পপ গায়িকা অ্যাডেলকে জাতীয়করণ করার অদ্ভুত প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন বাকেটহেড!
এই নাটকে আমেরিকার পয়লা নম্বর কুশীলব ভারমিন সুপ্রিম। মাথায় বুট জুতো পরে প্রচার চালানো এই প্রার্থী প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে ছোট ঘোড়া উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যাতে দূষণ কমে। তাঁর আরও আজব দাবি ছিল—‘জঙ্গি’ নয়… ‘জম্বি-হানা’ থেকে পৃথিবীকে বাঁচাবেন এবং গবেষণা চালাবেন সময় পরিভ্রমণ বা ‘টাইম ট্রাভেল’ নিয়ে।
অদ্ভুত যুক্তির লিস্টিতে পিছিয়ে নেই কানাডাও। সে দেশের ‘রাইনোসরাস পার্টি’ বা গণ্ডার দলের ইস্তেহার যার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। তারা ঘোষণা করেছিল, ক্ষমতায় এলে আইনের মাধ্যমে ‘মহাকর্ষের নিয়ম’বাতিল করে দেওয়া হবে! শুধু তাই নয়, রকি মাউন্টেন পর্বতমালা নিচু করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল তারা, যাতে দেশের এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তকে সহজে দেখতে পায়!
তবে এই সব ‘পাগলামি’ যে সবসময় বিফলে গিয়েছে, তেমনটা নয়। আইসল্যান্ডের কমেডিয়ান জন নার তো রীতিমতো স্লোগান দিয়েছিলেন, তিনি মসনদ পেলে ‘প্রকাশ্যে দুর্নীতি’ করবেন, কলার উঁচিয়ে। কিন্তু কেন এই আজব ঘোষণা? নারের যুক্তি ছিল, ‘সবাই তো লুকিয়ে-ছুপিয়ে করে, আমি আর যাই হোক… অন্তত সত্যিটা বলছি!’ আশ্চর্যের বিষয় হল, জনতা-জনার্দন এই সততা পছন্দ করে সত্যি সত্যি তাঁকে মেয়রের আসনে বসিয়ে দিয়েছিল। ঠিক একইভাবে পোল্যান্ডে ‘বিয়ার লাভার্স পার্টি’ও সংসদে ১৬টি আসন জিতে সবাইকে চমকে দেয়। তাদের তত্ত্ব ছিল, ‘কড়া মদ’ ছেড়ে বিয়ার খেলে মানুষ কম মাতাল হবে এবং তাতে রাজনৈতিক তরজা, আলাপ-আলোচনা চলবে অনেক বেশি যুক্তির পথ মেনে!
অনেকের মনে পড়বে জোনাথন শার্কির কথা। ২০০৬ সালে আমেরিকার মিনেসোটায় গভর্নর পদের লড়াইয়ে নেমেছিলেন তিনি। নিজেকে প্রজেক্ট করেছিলেন ‘ভ্যাম্পায়ার’ বা রক্তচোষা বাদুড় হিসেবে। তাঁর হুমকি ছিল, একবার সিংহাসন পেলে অপরাধীদের তিনি ভ্যাম্পায়ারদের স্টাইলে সাজা দেবেন!
প্রচারের কী মহিমা, কী শতবিচিত্র তার রূপ! যা হাসি-মজার ঊর্ধ্বে গিয়ে দিনের শেষে মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের উৎসবে রাজনীতিকরা কতটা সৃজনশীল (কিংবা অদ্ভুত) হতে পারেন শেষ পর্যন্ত মানুষ কাকে বেছে নেবে, সেটা সময়ের অপেক্ষা; তবে এই রঙ্গমঞ্চে বিনোদনের যে কমতি নেই, সেটা বলাই বাহুল্য।