সিঙ্গল বেঞ্চের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এখন আর বিচারবিভাগে নেই। তিনি এখন পুরোদস্তর রাজনীতিক। তমলুকের বিজেপির সাংসদ।

অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 3 December 2025 16:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রাথমিকের নিয়োগ (Primary TET) প্রক্রিয়া নিয়ে বুধবার মাইলফলক রায় ঘোষণা করেছে কলকাতা হাই কোর্টের (Kolkata High court) ডিভিশন বেঞ্চ। প্রাথমিকের ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল (32000 primary teacher case) করার যে নির্দেশ সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Abhijit Ganguly) দিয়েছিলেন, ডিভিশন বেঞ্চ তা খারিজ করে দিয়েছে। যার অর্থ ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল রইল (32000 primary teacher case update today)।
সিঙ্গল বেঞ্চের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এখন আর বিচারবিভাগে নেই। তিনি এখন পুরোদস্তর রাজনীতিক। তমলুকের বিজেপির সাংসদ।
এদিন হাইকোর্টের রায় (primary case) ঘোষণার পরই তাই অভিজিতের খোঁজ পড়ে। তিনি কলকাতায় নেই। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের কারণে দিল্লিতে রয়েছেন। দ্য ওয়ালের তরফে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে একটি ইউটিউব চ্যানেলে অভিজিৎ বলেছেন, ডিভিশন বেঞ্চ বিবেচনা করে যে রায় (primary teacher case update) দিয়েছে, সে ব্যাপারে তাঁর কিছু বলার নেই। তাঁর কথায়, “আমার কোনও মতামত দেওয়ার অধিকার নেই।”
ডিভিশন বেঞ্চ এদিনের রায়ে জানিয়েছে, প্রাথমিকে নিয়োগের ব্যাপারে দুর্নীতি মামলার তদন্ত যে রকম চলছিল তা চলবে। তবে এভাবে ৯ বছর পর একসঙ্গে এতজনের চাকরি কেড়ে নেওয়া হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাঁদের পরিবার বড় সমস্যার মুখে পড়বে।
এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “ডিভিশন বেঞ্চ যদি মনে করে, হ্যাঁ এভাবেই মানুষকে রক্ষা করতে হবে, তাহলে ডিভিশন ঠিকই করেছে বলব।” কিন্তু তার পরই বলেন, “আমি ভেবেছিলাম যে দুর্নীতি যারা করেছে, চাকরি যেভাবে বিক্রি হয়েছিল, সেই পুরো সিস্টেমটাকেই আমি বিসর্জন দিতে চেয়েছিলাম। তবে ডিভিশন বেঞ্চ যেটা ভাল বুঝেছে তা করেছে।”
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, অভিজিতের এই বিসর্জন তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমন নয় যে ৩২ হাজার শিক্ষকের সবাই দুর্নীতি করে চাকরি পেয়েছেন। তা প্রমাণিতও হয়নি। তাহলে সিস্টেমের সঙ্গে এই ৩২ হাজারের জীবিকাকে বিসর্জন দেওয়া কতটা সঙ্গত ছিল?
এদিন হাইকোর্টের রায় ঘোষণা হতেই অভিজিতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষের মতো নেতারা। তাঁদের সাফ কথা, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এই রায় দিয়েছিলেন। বিচারকের চেয়ারে তিনি বসেছিলেন, কিন্তু তাঁর মনে ছিল বিজেপি!
অভিজিৎকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি এই রায়ের পর হতাশ? জবাবে অভিজিৎ বলেন, “না না না, আমার ইনফ্যাক্ট কোনও রিঅ্যাকশনই নেই, ডিভিশন বেঞ্চ তো তার নিজের রায় দেবেই, তাই না!”
অভিজিৎকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এবার তো শাসক দল আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র পেয়ে গেল! এই প্রশ্নের উত্তরে অভিজিতের বক্তব্য অবশ্য পরিষ্কার। তাঁর কথায়, শাসক যদি মনে এটা তাদের কাছে অস্ত্র, তা হলে যা বলার বলবে।
বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তথা সিঙ্গল বেঞ্চের রায় কেন খারিজ করে দেওয়া হল এদিন তা জানিয়েছে হাই কোর্ট। তা হল: নিয়োগের পর প্রায় এক দশক হয়ে গেছে। এত শিক্ষকের চাকরি একসঙ্গে বাতিল করলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। শুধু তা-ই নয়, যাঁরা এতদিন কোনও অভিযোগ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করে এসেছেন, তাঁদের জীবিকাও সংকটের মুখে পড়বে।
ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য, দুর্নীতি সংক্রান্ত তদন্ত অবশ্যই চলবে, এবং যাঁদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণ মিলবে, তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করলে সৎ প্রার্থীরাও অন্যায়ের শিকার হবেন—তাঁদের গায়ে ‘দুর্নীতির দাগ’ লাগবে অকারণে।
উচ্চ আদালত আরও জানিয়েছে, শিক্ষক হিসাবে কাজ করার সময়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠেনি; তাঁদের কর্মদক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়নি।
আদালতের মতে, পরীক্ষক বা নিয়োগদাতাকে বাড়তি নম্বর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এমন কোনও প্রমাণও নেই। তাই কয়েকজন অসন্তুষ্ট বা অসফল প্রার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ নিয়োগ ব্যবস্থাকে অবৈধ বলে দাগিয়ে দেওয়া যাবে না।
২০১৪ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে দু’দফায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল—প্রথম দফায় ৪২,৯৪৯ জন, পরে আরও ১৬,৫০০ জন প্রার্থী চাকরি পান। মামলাকারীদের অভিযোগ ছিল, এই দুই পর্যায়ের নিয়োগেই ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে—ইন্টারভিউ নম্বর, মেধাতালিকা তৈরি, প্যানেলের সিদ্ধান্ত—সব জায়গাতেই নাকি হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি চলেছে। অন্যদিকে পর্ষদের দাবি, কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম ধরা পড়লেও সেগুলি সময়মতো সংশোধন করা হয়েছে; তাই পুরো প্রক্রিয়াকে বাতিল করার কোনও প্রয়োজন নেই।
সব পক্ষের যুক্তি-বিতর্ক শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়—সমস্ত নিয়োগ বাতিল করার মতো যুক্তি বা প্রমাণ নেই। বরং সেটি করলে রাজ্যের স্কুল কাঠামো, শিক্ষক সংকট এবং বহু পরিবারের জীবিকা সরাসরি বিপন্ন হবে। তাই সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ বহাল রাখার কোনও ভিত্তি নেই।