Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
TB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

মারধর, গালাগালি, হুমকি! পাহাড়ের ঈশ্বর মানতাম শেরপাদের, জানি না কেন এমন হল আমার সঙ্গে

যা-ই হয়ে যাক না কেন, একটা কথা আমি খুব জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার আজ অবধি কখনও হাই অল্টিটিউড সিকনেস হয়নি। আমি কখনওই উচ্চতাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়িনি আজ অবধি। আর যা কিছুই আমার সঙ্গে ঘটে থাকুক না কেন, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় এভারেস্ট শৃঙ্গ ছুঁতে পারলাম না, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে অভিযোগ।

মারধর, গালাগালি, হুমকি! পাহাড়ের ঈশ্বর মানতাম শেরপাদের, জানি না কেন এমন হল আমার সঙ্গে

শেষ আপডেট: 29 May 2019 16:05

১৯৫৩ সালের ২৯ মে, প্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গে পা রেখেছিলেন তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারি। এই তারিখটা সেই থেকে এভারেস্ট ডে হিসেবেই পরিচিত। প্রতি বছর হাজারও অনুষ্ঠানে বিশ্ব জুড়ে এই দিনটি উদযাপন করে পর্বতারোহণ মহল। এই বছর সেই তারিখেই এভারেস্ট অভিযান থেকে বাড়ি ফিরলেন চন্দননগরের তরুণী পিয়ালি বসাক। শৃঙ্গ ছোঁয়া হয়নি তাঁর। কিন্তু কেন হল না, সে কথা বলতে গিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন পিয়ালি। তাঁর সঙ্গী শেরপা পেম্বা থেন্ডুক রীতিমতো শারীরিক নিগ্রহ করেছেন তাঁকে! আট হাজার মিটারের ওপরে মার খেয়েছেন পিয়ালি, ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছেন! পিয়ালির অভিজ্ঞতা রইল তাঁর নিজেরই কলমে। যা-ই হয়ে যাক না কেন, একটা কথা আমি খুব জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার আজ অবধি কখনও হাই অল্টিটিউড সিকনেস হয়নি। আমি কখনওই উচ্চতাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়িনি আজ অবধি। আর যা কিছুই আমার সঙ্গে ঘটে থাকুক না কেন, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় এভারেস্ট শৃঙ্গ ছুঁতে পারলাম না, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে অভিযোগ। আমি জানি, প্রতিটা মানুষের অনেক কমতি থাকে, খামতি থাকে। প্রতিটা মানুষেরই একাধিক রূপ থাকে। কিন্তু এই বার অন্যতম শ্রদ্ধার এক জন মানুষের যে দিকটা আমি দেখলাম, সেটার আতঙ্ক এখনও কাটাতে পারিনি আমি। আমি কখনও ভাবিনি, পাহাড় আমায় এরকম কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি করাবে। আমি জানি না, কী বলব। জানি না, কী ভাবে আমার রিঅ্যাক্ট করা উচিত। শুধু এটা জানি, আমার সঙ্গে যেটা হয়েছে, সেটা আমায় তছনছ করে দিয়েছে। অনেকেই জানেন, ঠিক কতটা কষ্ট করে আমি এভারেস্টে গিয়েছিলাম। কী ভাবে জোগাড় করেছিলাম একটা একটা করে টাকা। কত খামতির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ় করেছিলাম প্রতিটা পদক্ষেপে। যাঁরা আমায় কাছ থেকে চেনেন তাঁরা জানেন, কী পরিমাণ পরিশ্রম আমার হয়েছিল, এই এভারেস্ট অভিযানের আগে। নিজের সবটুকু দিয়ে লড়েছিলাম আমি, সেরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু ভাবতে পারিনি, মার খেয়ে ফিরে আসব! এভাবে সিঁটিয়ে যাব ভয়ে! গত বছর মানাসলু অভিযানেও আমার গাইড ছিলেন পেম্বা থেন্ডুক শেরপা। সেই বারই আমি লক্ষ্য করেছিলাম, অন্য আর পাঁচ জন শেরপার মতো অতটাও হেল্পফুল নন উনি। মানে যেমন সাধারণত দেখা যায় বা শোনা যায়, ক্লায়েন্টকে শেরপারা জল এগিয়ে দিচ্ছেন, জুতো পরিয়ে দিচ্ছেন, ব্যাগ বয়ে দিচ্ছেন-- পেম্বা স্যার কখনওই তা করতেন না আমার সঙ্গে। হ্যাঁ, এখনও মানুষটাকে 'স্যার' বলেই ডাকছি আমি। ব্যক্তিগত সম্মানের জায়গাটা খোয়াতে চাই না। মানাসলুতে এমনও হয়েছে, আমি বরফের ক্রিভাসে পড়ে গিয়ে দড়িতে ঝুলছি, পেম্বা স্যার আমায় তোলার কোনও চেষ্টাই করছেন না। বরং ওই সময়ে আরও ভয়ের কোনও দুর্ঘটনার গল্প বলছেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এ দিকে আমি হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে কোনও রকমে উঠে দাঁড়ালাম। একটু অদ্ভুত লাগলেও, কোথাও একটা গিয়ে আমার মনে হয়েছিল, আমি যথেষ্ট দক্ষ এবং সক্ষম বলেই হয়তো আমার সঙ্গে এই কঠোর ব্যবহার করছেন উনি। আমার ভালও লেগেছিল। মনে হয়েছিল, 'ক্লায়েন্ট' নয়, 'অভিযাত্রী' হিসেবে আমায় ট্রিট করছেন পেম্বা স্যার। এই বছর যখন আমি এভারেস্টে যাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছি, সেভেন সামিটস এজেন্সির কাছে নাম লিখিয়েছি, টাকাপয়সা জোগাড়ের জন্য উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে বেড়াচ্ছি, তখন একাধিক বার আমায় নিজে থেকে ফোন করেন পেম্বা স্যার। জানান, আমার সঙ্গে এভারেস্ট যেতে চান উনি। ওঁর আগ্রহ দেখে আমারও ভাল লেগেছিল। মনে হয়েছিল, নিশ্চয় আমার অভিযানের ব্যাপারে যথেষ্ট পজ়িটিভ উনি। নিশ্চয় পাশে থাকবেন। ভাবতেও পারিনি, এই পেম্বা স্যারের হাতে চড়-থাপ্পড় খেতে হবে আমায়! শুনতে হবে অশ্রাব্য গালিগালাজ! এমনকী খাড়া বরফের ঢালে আমার নিরাপত্তা নিয়েও ছেলেখেলা করবেন উনি! মরে যেতে পারতাম আমি... এমনও হয়েছিল এক সময়, আট হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায়, খুব সাবধানী একটা অংশে ক্লাইম্ব করতে গিয়ে দড়ির সেফটি বদল করতে সামান্য কয়েক মুবূর্ত বেশ সময় লাগায় আমায় এমন ধাক্কা দেন উনি, যে আমার মাথা নীচের দিকে হয়ে যায়। অন্য দলের এক শেরপা এগিয়ে এসে আমায় না বাঁচালে, বড় দুর্ঘটনা ঘটতেও পারত আমার সঙ্গে। এই বার অন্নপূর্ণা অভিযান থেকে সোজা এভারেস্টের বেসক্যাম্পে এসে আমার সঙ্গে মিট করেন শেরপা পেম্বা থেন্ডুক। ১৮ তারিখ এভারেস্টের বেসক্যাম্প থেকে চড়া শুরু করি আমরা। প্রথম দিনই পেম্বা স্যার আমায় জোর করেন, সোজা ক্যাম্প টু যেতে হবে। ক্যাম্প ওয়ানে থাকা যাবে না। আমি কিঞ্চিৎ আপত্তি করলেও রাজি হয়ে যাই। পাহাড়ে শেরপা স্যাররা আমার কাছে ভগবান। ওঁদের প্রতিটা কথা বেদবাক্য। আমি ভেবে নিই, নিশ্চয় কোনও কারণেই বলছেন উনি। জোরকদমে চলছিলাম। মাঝপথে বিপত্তি হল খিদে পাওয়ার জন্য ব্রেক নিতে চাইলে। জল বা খাবার, কোনও কিছুই খাওয়ার জন্য একটু দাঁড়াতে দেবেন না উনি। তখনই প্রথম থাপ্পড়টা খেয়েছিলাম। সঙ্গে গালাগালি। ছিটকে গেছিলাম। বিশ্বাস করতে পারেনি, যে মানুষটাকে ভগবান-সম শ্রদ্ধা করি, তিনি আমার গায়ে হাত তুললেন! আশপাশের অন্য শেরপারা প্রতিবাদ করেন। আমায় বোঝান অনেক কিছু। কিন্তু সেই আমার ভিতরে ভয় ঢুকে গেল প্রথম দিনেই। [caption id="attachment_109182" align="aligncenter" width="720"] অভিযুক্ত শেরপা পেম্বা থেন্ডুক।[/caption] আমি কখনওই খুব বেশি চেঁচামেচি করা বা প্রতিবাদী চরিত্র নই। বরাবরই চুপ করে থাকি। বিশেষ করে পাহাড়ে আমি কখনওই নিজে থেকে কিছু করতে চাই না, এক পা এগোতে চাই না শেরপা স্যারদের গাইডেন্স ছাড়া। কিন্তু এই বার আমি বুঝতেই পারছিলাম না কী করব। অসহায় লাগছিল। খুব কষ্টে, প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে ক্যাম্প টু পৌঁছেছিলাম। ওষুধ খেয়ে, ভাল করে খাবার খেয়ে, জল খেয়ে সুস্থ হলাম একটু। শক্তি ফিরে পেলাম, শরীরে আর মনে। নিজের ফোকাস ফের ঠিক করলাম, এভারেস্ট। ওই শৃঙ্গের মাথা স্পর্শ করা ছাড়া আর অন্য কোনও চিন্তাকে মাথায় জায়গা দেব না ঠিক করলাম। কিন্তু তখনও জানতাম না... ২০ তারিখে ক্যাম্প টু থেকে ক্যাম্প থ্রি পৌঁছলাম। ওই দিনও রাস্তায় আমায় জল বা খাবার খেতে দেননি পেম্বা স্যার। কিন্তু আগের দিনের মতো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়নি। ফের চাঙ্গা হচ্ছিলাম আমি। ভাবছিলাম, কোনও কারণে হয়তো ওই দিন অমন করে ফেলেছেন পেম্বা স্যার, আর কিছু হবে না। যদিও আমার জন্য জল, খাবার এই সব তৈরি করে দিতেও অনীহা ছিল ওঁর। তবে অন্য শেরপাদের ও অভিযাত্রীদের সাহায্যে সে সব ম্যানেজ করছিলাম আমি। প্রতি দিন সকালে শেরপার সাহায্যে অভিযাত্রীরা তৈরি হন, একসঙ্গে বেরোন। একমাত্র আমি নিজে রেডি হয়ে সকালে হাঁটতে শুরু করতাম। অনেক দেরি করে বেরোতেন পেম্বা স্যার। ২১ তারিখ ক্যাম্প থ্রি থেকে ও রকমই একা রওনা দিয়েছিলাম। পেম্বা স্যার পেছনে ছিলেন। শেষমেশ পৌঁছলাম ক্যাম্প ফোর। ওখানে দেখা হল লাকপা স্যারের সঙ্গে। ২০১৫ সালে ওঁর সঙ্গেই তিনচেনকাং অভিযান করেছিলাম আমি। আমায় অনেক সাহায্যও করেন লাকপা স্যার। জল তৈরি করে দেন। উনি পরিচিত বলে এটা আমার জন্য করেছিলেন। করার কথা ছিল পেম্বা স্যারেরই। কিন্তু অজানা কোনও কারণে উনি কখনওই আমায় কোনও সাহায্য করতেন না। ওই দিনই সন্ধে ছ'টায় সামিট পুশ শুরু করলাম আমরা। আমার সঙ্গে সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছিল। কিন্তু তা ছিল এমার্জেন্সি পারপাসে। ঠিক ছিল, আমি অক্সিজেন ছাড়াই চেষ্টা করব সামিট করার, কিন্তু অসুবিধা হলে সিলিন্ডার নেব। সেই দিনই সামিট থেকে খবর এসেছিল, ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়ে ছ'জন অভিযাত্রী মারা গিয়েছেন এভারেস্টের নীচে। আমার শেরপা এবং অন্যান্যরা বললেন, অক্সিজেন ছাড়া যেন আমি না যাই। ঝুঁকি হয়ে যাবে। ওপরে অনেক ক্ষণ সময় লাগছে, অসুবিধায় পড়তে পারি। আমি ওঁদের কথা শুনি। অক্সিজেন নিই তখনই। এবং তখন আমি আবিষ্কার করলাম, আমার অক্সিজেন সিলিন্ডারের মাস্কটি ড্যামেজড। আমি ঠিক মতো ব্যবহার করতে পারছিলাম না। কিন্তু সে কথা বলতে গিয়েই ফের আঘাত। মাস্কের ওপর দিয়ে ঘুষি চালিয়ে দিলেন পেম্বা স্যার। এর পরে একাধিক বার হয়েছে এমন। এক সময়ে যেন মার খাওয়াটাই অভ্যেস হয়ে গেছিল আমার। রাত ১০টাতেই পৌঁছে গেলাম ব্যালকনি। বেশ লম্বা ট্র্যাফিক জ্যাম। শৃঙ্গ ছুঁতে বাকি আর মাত্র ৫০০ মিটার। তখনও সব কিছু মাথা থেকে বার করে আমি স্থির করছি ফোকাস। আর কেউ আটকাতে পারবে না আমায়। কিন্তু পেম্বা শেরপা বললেন, ফিরে যেতে হবে। আমি কেবল বলেছিলাম, খানিক ক্ষণ চেষ্টা তো করি, এখনও তো সবে রাত। অক্সিজেনও পর্যাপ্ত আছে সঙ্গে। না পারলে নিশ্চয় ফিরে যাব। [caption id="attachment_109184" align="aligncenter" width="1280"] অক্সিজেন মাস্ক।[/caption] ব্যস, এটুকুতেই গালাগালি ছুটল। সেই সঙ্গে আচমকা খুব খারাপ ভাবেই বলে উঠলেন পেম্বা স্যার, তোমার কি মা-বাবা নেই? কিছু হয়ে গেলে কী হবে! এটা আমার জন্য রীতিমতো ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল ছিল। ওই উচ্চতায়, ওরকম মানসিক অবস্থায় মা-বাবাকে নিয়ে বলা ওই একটি বাক্য আমার মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সেই সঙ্গে প্রতিটা মুহূর্তে আমি সিঁটিয়ে ছিলাম, কখন আবার মার খাব। এই ভয়টা আমায় এমন ভাবে আঁকড়ে ধরল, আমি বুঝে গেছিলাম, আমার স্বপ্ন ওখানেই ভেঙে গেল। আমি হয়তো আর পারব না... হ্যাঁ, এই প্রথম আমার মনে হল, আমি পারব না। আমি হেরে যাচ্ছিলাম। নেমে এলাম চুপচাপ। মাঝরাতে সামিট ক্যাম্প অর্থাৎ ক্যাম্প ফোরে পৌঁছে গেলাম। ক্ষীণ আশা ছিল, পেম্বা শেরপার মধ্যে যদি কোনও রকম পরিবর্তন আসে, আর একটা বার যদি সামিট করা সুযোগ দেন আমায়। না। কোনও সুযোগই নেই। পেম্বা স্যার চোখের সামনেই নষ্ট করে দিলেন অক্সিজেনগুলো। আমার কত কষ্ট করে একটা একটা করে টাকা জমিয়ে কেনা অক্সিজেন। পরের দিন সকাল সাতটা নাগাদ নামতে শুরু করলাম নীচে। সে দিনও আচরণে কোনও পরিবর্তন নেই ওঁর। কোনও রকমে ক্যাম্প টু পর্যন্ত নামার পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, হেলিকপ্টারে করে চলে যাব কাঠমাণ্ডু। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় এই মানসিক চাপটা নেওয়া। রীতিমতো ভয় লাগছিল আমার। প্রাণের ভয়। লোৎসে শৃঙ্গেও যে আর যাওয়া হবে না, তা আগেই বুঝে গেছিলাম। যোগাযোগ করলাম রেসকিউ এজেন্সি 'গ্লোবাল রেসকিউ'-এর সঙ্গে। জানালাম, হেলিকপ্টারে ফিরতে চাই। তবে সুস্থ অবস্থায় সহজে আসে না রেসকিউ হেলিকপ্টার। তাই একটু মিথ্যেও বলতে হল, আমার হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। সবাই ধরেই নিয়েছিল, আমি খুবই অসুস্থ। তার পরের গল্প সবাই জানে। পিয়ালি এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। পিয়ালি লোৎসে যেতে পারেনি। পিয়ালিকে ক্যাম্প টু থেকে 'উদ্ধার' করতে হয়েছে।-- এই সব খবরই ছড়িয়ে গিয়েছে চার দিকে। গুজব ছড়িয়েছে, পিয়ালির ফ্রস্ট বাইট হয়েছে। কিচ্ছু হয়নি আমার শরীরের কোথাও। যেটা হয়েছে, সেটা দুঃস্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে এখন। এখনও নিজেকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করছি, এই খারাপতম ঘটনাটা আমার সঙ্গে ঘটেছে! পাহাড়ের ঈশ্বরসম একটি মানুষের দুর্ব্যবহারের জন্য সব আশা-ভরসা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে আমার। কখনও ভাবতে পারিনি, এমন কিছুও ঘটে থাকে পাহাড়ে! নীচে এসে কাঠমাণ্ডুর হাসপাতালে গেলাম। কোনও অসুস্থতা নেই, তাই ওরা প্রাথমিক চেক আপ করে ছেড়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে। না, কারও প্রতি কোনও অভিযোগ নেই আমার। পুলিশে অভিযোগও দায়ের করিনি আমি। কিন্তু নেপালের পর্যটন মন্ত্রকের ডিরেক্টর মীরা আচার্যের সঙ্গে দেখা করে গোটা ঘটনাটি জানিয়ে এসেছি। উনি আশ্বাস দিয়েছেন, পদক্ষেপ করবেন। আমার এজেন্সি সেভেন সামিটস আমায় প্রতিটা পদক্ষেপে যে ভাবে সাহায্য করেছে, সেভেন সামিটসের মালিক মিংমা শেরপা স্যার যে ভাবে গোটা অভিযানের শুরু থেকে শেষ অবধি আমার পাশে থেকেছেন, তাতে কৃতজ্ঞতার ভাষা নেই আমার। আমি মিংমা স্যারকেও সবটা বলেছি। উনিও আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়টি খতিয়ে দেখার। এমনকী পেম্বা থেনডুক স্যারের বাড়িতেও আমি গিয়েছিলাম। ওঁর পরিবারের মানুষগুলো যে কী ভাবে আমায় যত্ন করেছেন, তা মুখে বলতে পারব না আমি। কিন্তু ওঁরাও বারবার বলছিলেন, একটানা অভিযান করে চলেছেন পেম্বা। অন্নপূর্ণা থেকে সোজা এভারেস্টে এসেছেন। হয়তো পেম্বা স্যারের শরীর অতটাও ফিট ছিল না একটানা খাটনির জেরে। এমনকী উনি যে অসুস্থ ছিলেন, সে কথা ওঁর বাড়ির লোকই আমায় বললেন। আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম ওঁর দিকটাও। সত্যি তো, হাজারে হাজারে অভিযাত্রী জড়ো হয়েছেন নেপালের শৃঙ্গগুলিতে। শুধু এভারেস্টেই ৩৮১ জন। শেরপাদের কার্যত বিশ্রামের সময়টুকু নেই। শেরপা হলেও ওঁরা মানুষ। যন্ত্র নন। অসংখ্য অভিযান, তার ওপর একটার পর একটা রেসকিউ অপারেশন, কী ভাবেই বা পেরে উঠবেন! কিন্তু আমি? আমি তো অনেকের মতো তো হুজুগে পড়ে বা বিনা প্রশিক্ষণে বা অদক্ষ শরীরে এভারেস্টে চলে যাইনি! আমার তো দীর্ঘ দিনের লালন করা স্বপ্ন, জমানো অর্থ, কঠিন পরিশ্রমের পরে এসেছিল এই অভিযানের সুযোগ। আমি তো একটা সত্যিকারের অভিযান চেয়েছিলাম, নিজেকে তৈরিও করেছিলাম সাধ্যমতো। আমার সঙ্গেই কেন এমন হল! [caption id="attachment_109198" align="aligncenter" width="544"] কলকাতা বিমানবন্দরে পিয়ালি।[/caption] আজই বাড়িতে ফিরেছি। একটু হলেও রিল্যাক্সড এবং নিরাপদ বোধ করছি। পেছন ফিরে যখনই দেখছি, আমার কোনও অভিযোগই নেই কারও ওপর। না আমার এজেন্সির উপর, না অভিযানের পথে সঙ্গে পাওয়া বাকি শেরপাদের উপর। কিন্তু ওই একটি মানুষের অস্বাভাবিক আচরণ আমায় তছনছ করে দিল ভেতর থেকে। পেম্বা স্যার, শত সম্মানের পরেও আপনাকে হয়তো কোনও দিন ক্ষমা করতে পারব না। অনুলিখন: তিয়াষ মুখোপাধ্যায় (এই প্রতিবেদনের প্রতিটি বক্তব্য পিয়ালির নিজস্ব। প্রতিক্রিয়া জানার জন্য  সেভেন সামিটসের কর্ণধার মিংমা শেরপা ও অভিযুক্ত পেম্বা শেরপার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। ওঁদের প্রতিক্রিয়া পেলেই সেটি এই প্রতিবেদনে আপডেট করা হবে।)

```