দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুই শহর। একটি আমাদের রাজ্য়ের রাজধানী, একটি দেশের। দুই রাজধানী শহর মিলে গেল একটি ঘটনায়। মঙ্গলবার ভোররাতে দু'টি শহরই সাক্ষী থাকল গ্রিন করিডর তৈরি করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অঙ্গ নিয়ে গিয়ে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করার।
বস্তুত, কিছু দিন আগে পর্যন্তও অঙ্গ প্রতিস্থাপন যেন বিরল বিষয় ছিল চিকিৎসা মহলে। অনেক সময়েই মৃত রোগীর পরিবার মত দিতেন না। কখনও আবার মত মিললেও, গোটা বিষয়টার আয়োজন করার মতো পরিকাঠামো মিলত না। কখনও আবার বাধা হতো দূরত্ব। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই সব বাধাই যেন দ্রুত গতিতে জয় করে ফেলেছে এদেশের চিকিৎসা মহল। মাঝেমধ্যেই অঙ্গ প্রতিস্থাপনের খবর আসে দেশের নানা প্রান্ত থেকে। পিছিয়ে নেই কলকাতাও।
তাই তো মঙ্গলবার ভোররাতে মালদহের তরুণীর ব্রেনডেথ হওয়া শরীরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপিত হল তিনটি মানুষের দেহে। তৈরি হল গ্রিন করিডরও। কলকাতায় যখন এই কর্মযজ্ঞ চলছে, তখন দিল্লিতে এক মৃত রোগীর অঙ্গ এসে পৌঁছেছে সুদূর বিজয়ওয়াড়া থেকে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সে অঙ্গ গ্রিন করিডরে করে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে য়াওয়া হল ওখলার হাসপাতালে। সব মিলিয়ে একাধিক অঙ্গ প্রতিস্থাপনের নয়া নজির গড়ে উঠল দেশে।
ছুটির দিনে, যখন যানবাহনের ভিড় খুব বেশি থাকে না দিল্লির রাস্তায়, তখনও সাড়ে ২২ কিলোমিটারের পথ পেরোতে সময় লাগে কম করে পৌনে এক ঘণ্টা। ব্যস্ত সময়ে তো কথাই নেই, দেড় থেকে দু'ঘণ্টাও লেগে যায়। সেই পথই পেরোনো গেল ১৯ মিনিটে। সৌজন্যে, পুলিশের তৈরি করা গ্রিন করিডর। প্রয়োজনে, দিল্লির ফর্টিস হাসপাতালের একটি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অস্ত্রপোচার।
বিজয়ওয়াড়া থেকে বিমানে করে উড়িয়ে আনা হয়েছিল এক রোগীর একাধিক অঙ্গ। দিল্লির ওখলা এলাকার ফর্টিস হাসপাতালে একাধিক রোগীর শরীরে বসার কথা ছিল হৃদপিণ্ড-সহ সেই অঙ্গগুলি। কিন্তু দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্ট থেকে ওখলার হাসপাতাল পর্যন্ত ওই অঙ্গগুলি তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। তখনই গড়ে তোলা হল গ্রিন করিডর, যা দিল্লির মতো ব্যস্ত শহরে খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। সেই কারণেই অঙ্গ আনার সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল ভোররাত। সে সময়েই সবচেয়ে ফাঁকা থাকে শহর।
বিমানবন্দর থেকে ওখলা পর্যন্ত রাস্তার সব ক'টি সিগনাল সবুজ করে দেওয়া হয় ম্যানুয়ালি। রাস্তার প্রতিটি মোড়ে ট্র্যাফিক পুলিশ মোতায়েন করে পথ খালি করার ব্যবস্থা করা হয়। সাড়ে ২২ কিলোমিটারের ওই রাস্তা পার করে অঙ্গবাহী অ্যাম্বুল্যান্স। মঙ্গলবার ভোরে সময় লাগে ১৯ মিনিট ৫ সেকেন্ড। শুরু হয়ে যায় প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার।
https://twitter.com/ANI/status/1194026262022381570
একই দিনে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সাক্ষী হল শহর কলকাতাও। মালদহের তরুণীর অঙ্গে প্রাণ ফিরে পেলেন তিন জন দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
গত শুক্রবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাইপাসের আরএন টেগোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মালদহের ওই ২৬ বছরের তরুণী। মস্তিষ্কে সংক্রমণ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় ছিলই না। সোমবার হাসপাতালের তরফে তাঁর ব্রেন ডেথের কথা ঘোষণা করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই তাঁর পরিবারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অঙ্গদানের। এর পরেই আপৎকালীন তৎপরতায় শুরু হয় অঙ্গ সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপনের পদ্ধতিগত কাজ।
মঙ্গলবার সকালে ওই তরুণীর লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় আরএন টেগোর হাসপাতালেই ভর্তি থাকা ৩৭ বছরের এক ব্যক্তির শরীরে। তিনি সিরোসিস অফ লিভারে ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। মৃত তরুণীর একটি কিডনিও প্রতিস্থাপিত হয়েছে সেখানেই। আর একটি কিডনি গ্রিন করিডরে করে নিয়ে যাওয়া হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। যেখানে কিডনির দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি ছিলেন ১৮ বছরের এক তরুণ। তাঁর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয় তরুণীর কিডনি।
ওই তরুণীর পরিবার জানিয়েছে, তাঁদের বাড়ির মেয়ের অঙ্গে যে তিনটি মানুষ বেঁচে থাকবেন, এতেই তাঁরা খুশি। অস্ত্রোপচার হওয়ার পরে কড়া পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে গ্রহীতাদের।