টানাপোড়েনের মধ্যেই শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী তাঁর কন্যার বিয়ে দেন সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে। পরে, বিরোধের কারণে কন্যা ও জামাতাকে নিয়ে তিনি চলে আসেন শান্তিপুরে, এবং এখানেই পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করে দেন সাধনার জন্য।

শেষ আপডেট: 14 October 2025 19:09
কাজল বসাক, নদিয়াঃ দীপাবলির (Diwali 2025) রাতে যখন সমগ্র দেশ আলোর উৎসবে মেতে ওঠে, তখন নদিয়ার শান্তিপুরের আগমেশ্বরীতলায় এক ভিন্ন আবহ। তন্ত্রসাধনা ও আধ্যাত্মিকতার চারশো বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে পূজিতা হন আগমেশ্বরী মা। আজও তান্ত্রিক উপাচারে সম্পন্ন হয় আরাধনা, কিন্তু পশুবলি ছাড়াই। দেবী আগমেশ্বরী যেন শান্তিপুরের সংস্কৃতির প্রাণ, যার আরাধনায় মিশে আছে ইতিহাস,ভক্তি আর মাটির গন্ধ।
ইতিহাস বলছে, প্রায় চারশো বছর আগে এই পুজোর সূচনা করেন সার্বভৌম আগমবাগীশ, যিনি ছিলেন তন্ত্রসাধক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের প্রপৌত্র। আগমশাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্যের জন্যই তাঁরা পান “আগমবাগীশ” উপাধি। সেই সময় শাক্ত ও বৈষ্ণবদের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ চলছিল। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী তাঁর কন্যার বিয়ে দেন সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে। পরে, বিরোধের কারণে কন্যা ও জামাতাকে নিয়ে তিনি চলে আসেন শান্তিপুরে, এবং এখানেই পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করে দেন সাধনার জন্য।
সেই আসনেই সিদ্ধিলাভ করেন সার্বভৌম আগমবাগীশ। গঙ্গার পবিত্র মাটি দিয়ে দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে শুরু হয় আগমেশ্বরীর পুজো। সেই জায়গাই এখন আগমেশ্বরীতলা নামে পরিচিত। প্রথা মেনে কালীপুজোর রাতে হয় দেবী আরাধনা। আজও বড় গোস্বামী পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজোর সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন। পুজোর সূচনা হয় বিজয়া দশমীর দিন সিঁদুর দানের মধ্যে দিয়ে। তারপর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজার রাতে পালিত হয় “পাটখিলান”—যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরির কাজ। কালীপুজোর দিন প্রতিমা রঙ করা হয়। রাত ৯টার সময় দেবীকে অলঙ্কারে সাজানো হয়, এবং তারপর শিল্পীর হাতে চক্ষুদান সম্পন্ন হয়। রাত্রি ১১টা নাগাদ তন্ত্রমতে শুরু হয় পুজো, যা চলে ভোর পর্যন্ত।
পুজো কমিটির সদস্য রমাপ্রসাদ ভট্টাচার্য জানান, ভোগ রান্না করেন গোস্বামী পরিবারের দীক্ষিত মহিলারা। ভোগে থাকে ৩৬ রকমের নিরামিষ পদ—শাক, ডাল, তরকারি, চাটনি, পোলাও, মিষ্টি ও ফল। ভক্তদের জন্য ১৪ কুইন্ট্যাল চালের পোলাও রান্না হয়। লুচি হয় দু-কুইন্ট্যাল ময়দার। পুজোর পরদিন শান্তিপুরের মতিগঞ্জ ঘাটে মায়ের বিসর্জন হয়। একসময় কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হতো, এখন আর তা হয় না। বিসর্জনের মুহূর্তে হাজারো ভক্ত “জয় আগমেশ্বরী মা” ধ্বনিতে ভরিয়ে দেন শান্তিপুরের আকাশ।